kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

[ উদ্যমী বাংলাদেশ ]

সাদা সাদা বক চকচক গেল উড়িয়া

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের স্বর্ণদ্বীপে অনেক বক দেখা যায়। কিন্তু কিছু মানুষের লোভের কারণে সেগুলো বিপন্ন হতে বসেছে। তারা ফাঁদ পেতে বকের বাচ্চাগুলো ধরে এনে বাজারে বিক্রি করে দেয়। স্থানীয় কয়েকজন যুবক এ রকম প্রায় ৭৫টি বকের ছানা উদ্ধার করে ১০ দিন শুশ্রূষার পর সেগুলোকে আবার ছেড়ে দিয়েছে স্বর্ণদ্বীপের জঙ্গলে। মো. শাখাওয়াত উল্লাহও সাক্ষী ছিলেন পুরো ঘটনার।

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাদা সাদা বক চকচক গেল উড়িয়া

৩ জুলাই ভোরবেলা। সুবর্ণচরের মেঘনা মার্কেটে তখন মানুষজন আসতে শুরু করেছে। একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুটি বিশাল খাঁচা নিয়ে যাচ্ছে স্বর্ণদ্বীপের ঘাটের দিকে। খাঁচার মধ্যে অনেকগুলো বকের ছানা। অনেকের চোখে বিস্ময়। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে উল্টো দিক থেকে অর্থাৎ স্বর্ণদ্বীপ থেকে অহরহ এ রকম বকের ছানাভর্তি খাঁচা আসতে থাকে। কিছুক্ষণ পরই মোটরবাইকে করে এলেন সুবর্ণচর উপজেলা বন কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। তাঁর কাছেই জানা গেল, কিছু অসাধু লোক গত ২৪ জুন ৪০টি বকের বাচ্চা ধরে বাংলাবাজারে বিক্রি করতে এনেছিল। তাঁরা খবর পেয়ে উদ্ধার করেন। ৯ দিন সেবাযত্নের পর এগুলোকে আজ স্বর্ণদ্বীপে নিয়ে যাচ্ছেন মুক্ত বাতাসে ছেড়ে দিতে।

 

যেভাবে উদ্ধার হলো

স্বর্ণদ্বীপের বনে জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বক বাচ্চা দিয়ে থাকে। কিন্তু এখানেই কিছু মানুষের লোভের শিকার হয় বাচ্চাগুলো। তারা বন থেকে বকের বাচ্চাগুলো ধরে এনে সুবর্ণচরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে। স্থানীয় মোহন মাঝি বলেন, ‘হবে তো শুরু অইল, হুরা বর্ষা ধরি হোলা বুয়া মেলা মাইনষে বগার ছা ধরি আনি বেইচব, খাইব। হাজারে হাজারে বগার ছা আইব। বিশ-তিরিশ টেঁয়া করি জোয়া বেচা যা।’ (মাত্র তো শুরু হলো। পুরো বর্ষা ধরে ছেলে-বুড়ো অনেক মানুষ বকের বাচ্চা শিকার করে বিক্রি করবে, খাবে। হাজার হাজার বকের বাচ্চা আসবে। বিশ-ত্রিশ টাকা করে জোড়া বিক্রি হয়।) সেদিন মেঘনা মার্কেটের অন্য সবার মতো মোহন মাঝির চোখেও বিস্ময়! জীবনে এই প্রথম দেখলেন বকের বাচ্চা বনে ফেরত নেওয়া হচ্ছে।

 

সেদিন ছিল ২৪ জুন

স্বর্ণদ্বীপ থেকে নদী ও সড়কপথ মিলে বাংলাবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ২৪ জুন সকালে দুজন পাখি শিকারি একটি অটোরিকশায় বকের ছানাগুলো বিক্রি করতে করতে যাচ্ছিলেন বাংলাবাজারের দিকে। তা স্থানীয় স্কুল শিক্ষক শামসুদ্দিনের চোখে পড়ে। বললেন, ‘আমি সিদ্দিক মার্কেটের কাছে দেখলাম তারা ছানা বিক্রি করছে। দেড় শর কম হবে না। ছানাগুলোর তখনো ঠিকমতো পালক গজায়নি। ভাবলাম এত ছোট ছোট পাখি মারবে কেন? তাদের দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু তারা না দাঁড়িয়ে দ্রুত বাংলাবাজারের দিকে চলে গেল। থানা ও উপজেলা পরিষদে তখন অনেকেই করোনায় আক্রান্ত। উপজেলা পরিষদ লকডাউন। তাই ওখানে ফোন না দিয়ে উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও স্থানীয় সাংবাদিক আবদুল বারীকে ফোন দিয়ে জানাই। ফোন পাওয়া মাত্রই আবদুল বারী সহকর্মী জহির উদ্দিন তুহিনকে নিয়ে ছুটে এলেন। ইউএনও এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। বাংলাবাজারে বকের ছানাসহ অটোরিকশা জব্দ করলেন। গুনে দেখলেন বকের ছানা আছে ৭৫টি। এর মধ্যে ২০-২৫টির যায় যায় অবস্থা। ছানাগুলোর শরীরের ওপর অনেক ধকল গেছে। কমপক্ষে ২০ ঘণ্টা হবে কিছুই খাওয়ানো হয়নি পাখিগুলোকে। আবদুল বারী বাজার থেকে ছোট মাছ কিনে খাওয়ালেন। ইউএনও ইবনুল হাসানের পরামর্শে কৃষক নুর নবীর বাড়িতে আপাতত পাখিগুলোকে রাখার সিদ্ধান্ত হলো। সেখানে পাখির খাদ্যের জোগানও দিলেন সুবর্ণচরের ইউএনও।’

 

অবশেষে আপন নীড়

৯ দিন যত্ন-আত্তির পর ৪০টি বকের ছানা জীবিত ছিল। তত দিনে সাদা বকের ছানাগুলো নরম নরম পাখা মেলতে শুরু করেছে। দশম দিনে এগুলো নিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা রওনা দিলেন স্বর্ণদ্বীপের উদ্দেশে। ট্রলারে করে ঘণ্টা দেড়েক চলার পর স্বর্ণদ্বীপের জঙ্গলে এনে শেষ দফায় ছোট মাছ খাওয়ানো হলো। এর মধ্যে দু-একটি উড়াল দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে দিল। তারপর কিছু দূর এসে ঘণ্টাখানেক ধরে নীরবে পর্যবেক্ষণ করা হলো পাখিগুলোর অবস্থান। ততক্ষণে বকের ছানাগুলো বনের মধ্যে ছোটাছুটি করতে লাগল। চর আলাউদ্দিন রেঞ্জের বন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ‘ওরা এখন নিরাপদ।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা