kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

[ করোনাকাল ]

মেয়েটা বড় কাঁদে

চার সন্তানের জননী ফাতেমা আক্তার। মেজো মেয়ে রুমী অটিজমে আক্তান্ত আবার বাক্প্রতিবন্ধীও। ঘরবন্দি সময়ে রুমীকে সামলাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফাতেমা সে কথাই শোনালেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেয়েটা বড় কাঁদে

আমার তিন মেয়ে এক ছেলে। ওদের মধ্যে রুমী মেজো। পুরো নাম রুমী আক্তার। ২১ বছর বয়স। অটিজমের পাশাপাশি মেয়েটা বাক্প্রতিবন্ধী। মিরপুর ১৪ নম্বরের একটি ভাড়া বাসায় থাকি।

তখনো করোনা আসেনি

মহাখালী ডিওএইচএসে পিএফডিএ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার (ভিটিসি)। সেখানে ওকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম। স্বাভাবিক সময়ে পৌনে ৯টায় হাজির হওয়া লাগত। সকালে গোসল সেরে, খাওয়াদাওয়া করে আমরা বাসা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে রওনা দিতাম। সাড়ে ৮টার দিকে পৌঁছে যেতাম। আর আসতে আসতে রাত ৭টা-সাড়ে ৭টা বাজত। ওখানে সেলাইসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করত রুমী। গোটা দিন সেখানেই কেটে যেত বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে। তখন একটা রুটিন ছিল। এখন সেটা এলোমেলো হয়ে গেছে।

 

খুব কষ্টে আছি

মার্চের ১৬ তারিখে সর্বশেষ ভিটিসিতে গিয়েছিল। লকডাউন শুরুর পর থেকে তো বেরোতেই পারছি না। খুব কষ্টে আছি। আমি নিজেও ক্যান্সারের রোগী। বাইরে যেতে পারে না বলে মেয়েটা কান্নাকাটি করে। ভিটিসিতে প্রতিদিন ৯টার আগে যেতে হতো। ওই সময়টা রুমীর মেমোরিতে আছে। প্রতিদিন ওই সময়টা এলে আর আমাকে স্বস্তি দেয় না। কখনো হাত ধরে, কখনো আঁচল ধরে টানাটানি করে। বাইরে না নিলে কান্নাজুড়ে দেয়। এমনভাবে কাঁদে যে সওয়া যায় না। এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ছোটাছুটি করে। খাওয়াদাওয়া করতে চায় না। লকডাউন চলছে, বাইরে করোনার ভয়—এসব অনেক বুঝাই। বাসার ছাদে নিয়ে রাস্তা দেখিয়ে বলি, ‘দেখছ মা, গাড়ি চলে না। স্কুল বন্ধ। ক্যামনে নিয়া যামু।’ কিন্তু রুমী কিছুতেই বুঝতে রাজি না। মার্চের শেষ দিকে খুব উতলা হয়ে গিয়েছিল, যা বলার মতো না। ঘুমায় না, খায় না। সব সময় অস্থির। বিরক্ত করে। মেজাজ বিগড়ে যায়। অটিজমের বাচ্চারা তো এমনিতেই অস্থির আচরণ করে, তার ওপর আবার বন্দিজীবন কার ভালো লাগে? অবস্থা এমন হয়েছিল যে ডাক্তারের পরামর্শে মাঝে মাঝে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো লাগত।

 

সেদিন বেরোতেই হয়েছিল

মার্চের শেষের ঘটনা। একদিন সকালে দেখি ব্যাগ গুছিয়ে আমার সামনে এলো। ইশারায় বলল, বাইরে নিয়ে যেতে। বোঝালাম। কিন্তু মেয়েটা তো অবুঝ। আমার শাড়ির আঁচল ধরে টানাটানি শুরু করল। অবস্থা এমন যে, না গেলে এখনই বড় কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবে। তা-ও ওর কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে টেবিলে রেখে এলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। দেখলাম, ওর চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। কিছুতেই কান্না থামানো যাচ্ছিল না। বাইরে সে যাবেই। বাসার কাছেই জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের স্কুল। রুমী আগে সেখানে পড়ত। প্রথমে সেখানে নিয়ে গেলাম। গেটে তালা ঝোলানো। দেখি রুমী সেই তালা ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখছে। সেদিন আশপাশের এ রকম তিনটি স্কুলে নিয়ে গেছি। রাস্তার পাশে পার্কিং করা গাড়ি দেখিয়ে বললাম, ‘দেখো, গাড়িও চলে না। তোমার আপুও স্কুলে যায় না।’ তারপর বিশ্বাস করেছে। আরেক দিনের ঘটনা। বিকেলে পাশের বালুর মাঠে নিয়ে যেতে হয়েছিল। ফোনে কথা বলছি। হঠাৎ দেখি রুমী নেই। দেখলাম, কাছের একটি দোকানে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দোকানদারকে বললাম, ‘স্যরি ভাই। আমার মেয়েটা তো অটিজমে ভুগছে। কিছু মনে কইরেন না। ও যদি কিছু নিয়ে থাকে আমি টাকা দিয়ে দেব।’ ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিছু নেবে মা?’ ডাল ভাজার প্যাকেট দেখাল। দুই প্যাকেট ডাল ভাজা কিনে দিতেই খুশিতে নেচে উঠল। তবে খাবার কিংবা জামাকাপড় যাই বলেন না কেন, ওর নিজের কোনো চাহিদা নেই। ওকে টাকা দিয়ে দোকানে যেতে বললে যায়। কিন্তু গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো কিছু যে পছন্দ করে কিনবে সেই বোধটুকুও নেই।

 

কাজ করে মন দিয়ে

ভিটিসিতে সেলাই, ক্যাটারিং ইত্যাদি করে দিন কেটে যেত ওর। সুই-সুতায় হাতে সেলাই করে। শিশুদের কাঁথা সেলাই ছাড়াও কামিজের নিচের অংশে লেইস লাগানো, বুকে, হাতায় নিপুণভাবে বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তুলতে পারে রুমী। ওকে যেটাই দেবেন, কাজটা করবে মনপ্রাণ দিয়ে। লকডাউনের পর থেকে আমি বাসায় টুকটাক ক্যাটারিংয়ের কাজ দিই। শসা, পেঁপে, আলু, লেবু ইত্যাদি কেটে দিতে বলি। খুব দ্রুত তা করে দেয়। পরে ইশারায় বলে—আরো দাও। কিন্তু বাসায় তো অত কাজ নেই। ফলে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে পড়ে। তাই ভিটিসিতে ফোন করে বলছি, ‘আপা, রুমীরে কিছু সেলাইয়ের কাজ দেন।’ বলছে, ‘দেব।’ এখন অস্থিরতা কিছুটা কমেছে। সকালে আমার সঙ্গে তরকারি কেটে দেয়। থালাবাটি পরিষ্কার করে। টেবিল গোছায়। বিকেলে ছাদ থেকে কাপড় নিয়ে আসে। টিভিতে খুব মনোযোগ দিয়ে খবর দেখত রুমী। প্রধানমন্ত্রীকে দেখলে লাফিয়ে উঠত। এখন ঘরের টিভিটাও নষ্ট হয়ে গেছে। ওর বিভিন্ন সময়ের কিছু ছবি লেমিনেটিং করে অ্যালবামে রেখেছি। বিকেলে সেগুলো দেখে দেখে সময় কাটায়। মাঝে মাঝে হাতের কাছে যেসব ম্যাগাজিন পায় সেগুলোও উল্টেপাল্টে দেখে। হানিফ সংকেত একবার ভিটিসিতে এসেছিল। ইত্যাদির সে অংশটা মোবাইলে ভিডিও করে রেখেছি। ওটা ও বারবার দেখে।

 

সামনে কী হবে জানি না

আগে খাইয়ে দেওয়া লাগত। এখন নিজে নিজে পারে। শুধু ইশারা দিলেই হলো। খাবার খুব কম চাবায়। গিলে ফেলে। কমলা, আঙুর এগুলো খুব পছন্দ। ডিম, গোশত, পোলাও, বিরিয়ানিসহ ভালো খাবারের প্রতি লোভ আছে। কিন্তু সব সময় তো সেগুলো দিতে পারি না। আজ যেমন মেন্যুতে শুধু ডাল আর ঢেঁড়স ভাজি। এসব খেতে চায় না। আমি একটা ছোটখাটো চাকরি করি। দুই মাস ধরে বেতন হচ্ছে না। রুমীর বাবা কুমিল্লায় থাকে। আমাদের খবর নেয় না। খুব কষ্টে দিন পার করছি। ওকে কিছুদিন পরপর ডাক্তার দেখানো লাগে। এসব নিয়ে খুব অনিশ্চয়তায় আছি। জানি না সামনে কী হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা