kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

পিটার পায়টের ছাত্র

তাসদীক হাসান চেয়েছিলেন এমন চিকিৎসক হতে, যিনি ভিন্নভাবে রোগীকে সুস্থ হতে সাহায্য করবেন। সে মতোই বেছে নিয়েছিলেন মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক হতে। একপর্যায়ে পিটার পায়টের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনেও পড়াশোনা করেছেন

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পিটার পায়টের ছাত্র

তাসদীক ও পিটার পায়ট

শৈশব কেটেছে যশোর শহরে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থাপনা, কবিতা আবৃত্তি বা গল্প-উপন্যাস পড়া কোনোটিই বাদ যায়নি। তবে সবকিছুই করেছি পড়াশোনা ঠিক  রেখেই। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য স্কুল পর্যায়ে পেয়েছিলাম জাতীয় পুরস্কারও। তবে মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে (শেরেবাংলানগর, ঢাকা) ভর্তির সুযোগও পেয়ে যাই ২০০৬ সালে। কলেজটির আমরাই প্রথম ব্যাচ।

 

অন্য রকম স্বপ্ন

দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকি। ২০১০ সালে সুযোগ পাই মেডিক্যাল স্টুডেন্ট কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার। আমাকে তখন সহযোগিতা করেছিলেন হৃদিয়া নূরী নদী। তিনি আমার জুনিয়র ছিলেন। এখন আমার সহধর্মিণী। ওই সম্মেলন আমার সামনে অনেকগুলো দরজা খুলে দেয়। পরে আমি নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম, ভারতসহ আরো কিছু দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছি। ওই সব দেশের গবেষকদের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছি। এখনো ভাবলে অবাক লাগে সেসব দিনগুলোতে আমি এমনকি নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীদের সামনে নিজের দেশকে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলাম।

 

গবেষণা শুরু

ইন্টার্নশিপ চলার সময়েই আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে গণস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথ বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। স্নাতকোত্তর শেষে মনে হলো আমার গবেষণা করার ইচ্ছাপূরণ হতে চলেছে। ইন্টার্নশিপ  শেষ হওয়ার ঠিক পরদিনই আমি আইসিডিডিআরবিতে (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ)  যোগ দিই। সেখানে কলেরা বিষয়ে কয়েকটি গবেষণাপত্র তৈরির কাজ করেছি। পরে ২০১৭ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য  গ্লোবাল মেন্টাল হেলথ) বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাই পিটার পায়টের প্রতিষ্ঠা করা লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল  মেডিসিনে (এলএসএইচটিএম)। ভাইরাস হান্টার নামে খ্যাত পিটার পায়ট।

 

পিটারের সঙ্গে দেখা

 ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস। বার্লিনে হয়েছিল ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট । পিটার সেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওখানেই গণস্বাস্থ্যের মানসিক দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়। ওই সম্মেলনে আমি নিউ ভয়েসেস ইন গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। একটি গবেষণা পোস্টার উপস্থাপন করে আমি এই পুরস্কারটি পাই। পিটার ও তাঁর স্ত্রী ডা. হেইডি লারসন পোস্টারটির খুব প্রশংসা করেছিলেন। পিটার তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে কিছু প্রশ্নও করেছিলেন।

পিটারকে এলএসএইচটিএমের অরিয়েন্টেশনের দিনও দেখেছিলাম। তাঁর পনেরো মিনিটের সেশনটি আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। তবে সেদিন আমার জানা ছিল না তিনিই ভাইরাস শিকারি। ওই পনেরো মিনিটেই তিনি গবেষণার পরিধি, গবেষণা গতিশীল করার উপায়, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের গুরুত্বসহ নানা দিক তুলে ধরেন। পরে একবার গেটস ফাউন্ডেশনের একটি প্রকল্প মারফত পাঁচজনের একটি দল তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়। আমিও ওই দলে ছিলাম। ওই দিন পিটারের সঙ্গে  স্কুল অব লাইব্রেরিতে আমরা সবাই যাই। পিটার তাঁর পুরনো গবেষণার নথি, গাণিতিক পরিসংখ্যান, হাতে আঁকা মানচিত্র এবং ইবোলাবিষয়ক কাগজপত্র দেখালেন। আর সেই সঙ্গে বলে চলেছিলেন তাঁর পেছনের গল্পগুলো। মাঝেমধ্যে তিনি আবেগাপ্লুতও হয়ে পড়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য।

 

স্নাতকোত্তর শেষ

২০১৮ সালে স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার পর গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করি ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলে। একই সঙ্গে রুয়ান্ডা ও উগান্ডায় কঙ্গো থেকে আসা শরণার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি প্রকল্পেও কাজ করছিলাম। তখন আমি ওই দেশগুলোর বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছি। তারপর ২০১৯ সালে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রকল্পের কাজে আমাকে লুসাকা ও জাম্বিয়াতে যেতে হয়েছে। আফ্রিকার মানুষদের বিষণ্নতা নিয়ে ছিল আমার কাজ। তখন ভাষার, খাবারের আর থাকারও সমস্যা পোহাতে হয়েছে আমাকে। তবে সব সময় মনে হতো এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল, আমি আমার স্বপ্নের পথেই হাঁটছি।

 

এখন দেশে

বাংলাদেশে এসেছি গেল ফেব্রুয়ারিতে। করোনার কারণে এখন কিছুদিন দেশেই থাকছি। পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ইয়ুথ পলিসি ফোরামসহ বেশ কিছু সংগঠনের সঙ্গে আছি।

করোনাকালের মানসিক চাপ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু জরিপ পরিচালনা করেছি।

 

করোনা বিষয়ে বলি

তিনটি মহাদেশে প্রত্যক্ষ কাজের অভিজ্ঞতা  থেকে বলতে পারি,  দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো করোনা-পরবর্তী সময়ে বেশ ভুগবে বিশেষ করে তরুণরা। ইউরোপ আর আফ্রিকার দেশগুলো খণিজ সম্পদে ভরপুর। কিন্তু আমাদের সে রকম নয়। আমরা বেশ উন্নতি করছিলাম বিগত বছরগুলোয়, এখন  সেটার গতিও কমে যেতে পারে। ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তরুণরাই। তবে তরুণরা যেন এসব কারণে বিপথগামী না হয় সে ব্যাপারে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।              

                       অনুলিখন: আল সানি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা