kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

[ উদ্যমী বাংলাদেশ ]

মফিদুল একদিন কণ্ঠশিল্পী হবেন

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মফিদুল একদিন কণ্ঠশিল্পী হবেন

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, গ্রামের নাম হাতিলেইট। সেই গাঁয়ে আদিবাসী মানুষ বেশি। প্রায় সবাই কৃষিকাজ করে। ওই গ্রামের মফিদুল কণ্ঠশিল্পী হতে চেয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু সব টাকা খুইয়ে ফিরে যান হাতিলেইটে। কোয়েল পাখি পালতে শুরু করেন। তার পরের গল্প শোনাচ্ছেন মো. আব্দুল হালিম

স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার মফিদুলের। এর মধ্যে জান্নাতুল ও লুভনা মাদরাসায় পড়ে, জুনাইদ ও জোবায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চার বছর আগেও অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন মফিদুল। তাঁর দেখাদেখি অন্য গ্রামের মানুষও কোয়েল পাখির খামার করছে এখন।

 

যেভাবে শুরু

২০১৬ সালের শেষ দিক। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সিদ্দিকালি বাজারে মফিদুলের সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বন্ধু কাউসার মির্জার দেখা হয়। উভয়ে দীর্ঘ সময় চায়ের আড্ডায় বসে ছিলেন। সংসারে অভাবের কথা শুনে তাঁকে কোয়েল পাখির খামার করতে পরামর্শ দেন কাউসার। সেই সঙ্গে বলেন, ‘টাকা বেশি লাগবে না, আর সব রকমের সহযোগিতা আমার কাছ থেকে পাবে।’ বন্ধুর কথামতো ২০১৭ সালে বাড়িতে খুপরি তৈরি করেন মফিদুল। বন্ধুর দেওয়া ঠিকানামতো বগুড়ায় গিয়ে এক দিনের বয়সের এক হাজার কোয়েল পাখির বাচ্চাও কিনে আনেন। খরচ হয় সাত হাজার টাকা। বাড়ির কাছের বাজার থেকে বাকিতে মুরগির খাবার কিনে কোয়েল পাখির বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে থাকেন। পাখিগুলোর বয়স যখন ৩৫-৪০ দিন তখন ডিম দিতে শুরু করে। পাখির বয়স যখন ৬০-৭০ দিন হয়, প্রতিদিন ৪৫০-৫০০ ডিম পেতে থাকেন মফিদুল। তবে বাজারে বিক্রি সেভাবে হচ্ছিল না। নষ্ট হয়েছে অনেক ডিম। তবে হাল ছাড়েননি তিনি।

 

খামার তৈরি ও পাখি পালন

পাঁচ হাজার পাখির জন্য ৪ শতাংশ জমির ওপর ঘর করলেই যথেষ্ট। টিন, কাঠ দিয়ে ঘর করার পর চারদিকে প্লাস্টিক বা তারের জাল দিয়ে বেড়া দিতে হয়, যেন আলো-বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখতে হয়। চারদিকে কাপড়ের পর্দার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়, যেন বৃষ্টি এলে ঢেকে দেওয়া যায়। ৩৫-৪০ দিন বয়সের কোয়েল পাখি ডিম দিতে শুরু করে। একটি কোয়েল পাখি মাসে দু-তিন দিন বাদ দিয়ে ১৮ মাস পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। সকাল-বিকাল দুবেলা খাবার দিতে হয়। মুরগির যে খাবার, কোয়েল পাখিরও একই খাবার। তেমন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। অন্য সব কাজ করেও কোয়েল পাখির খামার দেখাশোনা করার জন্য একজন মানুষই যথেষ্ট।

 

স্বপ্নপূরণ

প্রথম বছর ডিম বিক্রি করতে মফিদুলকে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। ২০১৮ সালে ঢাকায় এক আড়ত মালিকের সন্ধান পান। ওই বছর চেনা একজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে পাঁচ হাজার পাখি পালন শুরু করেন। এক বছরেই ছয় লাখ টাকা লাভ হয়। ২০১৯ সালের শুরুতে খামার আরো বড় করে ১০ হাজার পাখি পালতে থাকেন। এখন প্রতিদিন সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার ডিম পান তিনি। পাঁচ দিন পর পর বাড়ি থেকে মিনি ট্রাকে করে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার ডিম ঢাকার কাপ্তানবাজারে পাঠিয়ে দেন। প্রতিটি ডিম দেড় থেকে দুই টাকায় বিক্রি হয়। টাকা পেয়ে যান নগদ। খরচ বাদে প্রতি মাসে তাঁর লাভ হয় এক লাখ টাকারও বেশি। এক বছর পর পর পাখি বদল করেন, মানে আগের পাখি বিক্রি করে দেন। খরগোশ ও গাড়লের (একরকম ভেড়া) খামার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মফিদুল। দুই একর জমিতে পেঁপে আর কলার বাগান করেছেন। জমিতে সার হিসেবে পাখির লিটার (মল) ব্যবহার করেন।

 

সামনের দিন

মফিদুল ইসলাম বলছিলেন, অভাব-অনটনের সংসার ছিল। একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালিয়েছি। আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গান নিজেই লিখতাম। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতাম। ‘আঁধারের আলো’সহ তিনটি মঞ্চনাটকও লিখেছি। স্বপ্ন দেখতাম, নামকরা কণ্ঠশিল্পী হব। সারা দেশের মানুষ আমার গান শুনবে। দীর্ঘদিন অন্যের কাজ করে টাকা জুগিয়েছিলাম ক্যাসেট বের করব বলে। ঢাকায় গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে সব শেষ হয়ে যায়। মনে দুঃখ নিয়ে গ্রামে চলে আসি।

আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গান ফুফুকে দিয়ে ডায়েরিতে লিখিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। নিজের কণ্ঠে গানের ক্যাসেট বের করার স্বপ্ন শিগগিরই বাস্তবায়নের ইচ্ছা তাঁর। এখন অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ চাইতে আসে। তিনি বলেন, ‘কোয়েল পাখিতে খরচ কম, লাভ বেশি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা