kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

[ বিদেশি গল্প ]

‘সিসা বিদিম্বু’ হতে চেয়ে

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘সিসা বিদিম্বু’ হতে চেয়ে

কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসার রাজ্যের ময়লার স্তূপ হাতড়ে বেড়ান তিনি। মানুষের ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে বানান মানবিক বার্তায় ভাস্বর সব শিল্পকর্ম। ‘ময়লার মন্ত্রী’ হিসেবে পরিচিত শিল্পী ইমানুয়েল বোতালাতালাকে নিয়ে লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

ইমানুয়েলের বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই।  হাঁটেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। টাকা-পয়সা তেমন নেই। আছে ইচ্ছাশক্তি। তাই নিয়ে মানুষকে সচেতন করে তুলতে কাজ করে চলছেন। মাধ্যম শিল্পকর্ম। উপকরণ ময়লা-আবর্জনা। আফ্রিকা মহাদেশে কঙ্গো নামের দেশ আছে দুটি। বড়টির পুরো নাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। ইমানুয়েল সেই দেশের মানুষ। থাকেন রাজধানী কিনসাসায়। সেখানকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘ময়লার মন্ত্রী’ হিসেবে।

নামটি ইমানুয়েলেরও বেশ পছন্দ। কারণ ময়লা নিয়েই তাঁর কারবার। সেই ১৯৭৯-৮০ সাল থেকে ময়লা দিয়ে শিল্পকর্ম বানাচ্ছেন। আধুনিক মানুষ ময়লা ফেলার ওস্তাদ। সেগুলোর অনেক কিছুই প্রকৃতিতে বিলীন হয় না। এগুলোর পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকল জরুরি। ইমানুয়েল তাঁর ছবিতে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন সেই সব আবর্জনা। ঘটা করে ছবিগুলোর প্রদর্শনীর আয়োজনও করেন তিনি। ইমানুয়েলের শিল্পকর্মে বারবার করে আসে আফ্রিকার বাস্তবতা, আফ্রিকানদের দুর্ভাগ্যের কারণ এবং সেগুলো দূর করার উপায়। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকায় যুদ্ধ লেগেই আছে। কোনো দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে, আবার কোনো দেশ যুদ্ধে লিপ্ত প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে। ব্যতিক্রম নয় ইমানুয়েলের দেশও। এখন প্রশ্ন হলো, এই সব যুদ্ধে অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে কারা? কঙ্গোতে যুদ্ধ করার অস্ত্র তো কঙ্গোতে বানানো হচ্ছে না। আফ্রিকার কোনো দেশেই অস্ত্র তৈরি হয় না। ইমানুয়েলের মতে, এসবের জোগানদাতারাই আফ্রিকায় যুদ্ধ জিইয়ে রাখছে।

 

নারী স্বাধীনতার কথাও বলেন

ইমানুয়েল অকপটে স্বীকার করেন, তিনি একজন ‘ন্যাশনালিস্ট’ শিল্পী।  কঙ্গোর বেনি শহরে দীর্ঘদিন ধরেই গোলযোগ চলছে। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় মারা গেছে সাত শরও বেশি মানুষ। সেখানে বেশ কিছুদিন থেকেছেন ইমানুয়েল। প্রত্যক্ষ করেছেন অবস্থার ভয়াবহতা।  বেনির বাস্তবতা তুলে ধরেছেন তাঁর অনেক কাজে।

তাঁর শিল্পকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নারী স্বাধীনতা, বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নারী অধিকার হরণের প্রতিবাদ। ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ও সম-অধিকারের কথাও বলেন।

আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মতো কঙ্গোতেও পেশা হিসেবে শিল্পীর জীবন বেছে নেওয়া বেশ কঠিন। এদিক দিয়ে অবশ্য ইমানুয়েলের খানিকটা সুবিধা হয়েছে। সংগ্রামটা তাঁকে একা করতে হয়নি। সব সময়ই পাশে পেয়েছেন মার্গারেটকে। বিয়ের আগে দীর্ঘদিন প্রেম করেছেন তাঁরা। ইমানুয়েল একসময় একটু ভয়ই পেয়েছিলেন। সহায়-সম্বলহীন এক শিল্পীর সঙ্গে কি আর মার্গারেট সম্পর্কে জড়াতে রাজি হবেন! অথচ সেই মার্গারেটই জমি না কিনে নিজের জমানো টাকা তুলে দিয়েছিলেন ইমানুয়েলের হাতে। মাঝে ইমানুয়েল ১০ বছরের জন্য কিসাঙ্গানিতে গিয়ে থেকেছিলেন। মার্গারেট অপেক্ষা করেছেন। এখনো তাঁরা একসঙ্গেই আছেন। মার্গারেট জাতিতে বাকোঙ্গো। ওঁদের ভাষায় একটা কথা আছে, ‘সিসা বিদিম্বু’, মানে যে লোক দুনিয়ার বুকে নিজের ছাপ রাখতে পেরেছে। ইমানুয়েল ও মার্গারেটের লক্ষ্যও এখন সেটাই। শিল্পকর্মের মাধ্যমে ইমানুয়েল যেন নিজের স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই দুজনে জীবনভর ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এখনো করে যাচ্ছেন, যেন তাঁর কাজের কারণে ‘ময়লার মন্ত্রী’র কথা মানুষ মনে রাখে মৃত্যুর পরও, বছরের পর বছর।

 

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা