kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

[ অদম্য মানুষ ]

সুমাইয়াকে যোদ্ধা বলাই ভালো

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুমাইয়াকে যোদ্ধা বলাই ভালো

চাইতেন আর দশজনের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি তাঁর হারিয়ে গিয়েছিল। তবে অবশেষে তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর যুদ্ধকথা লিখেছেন বিনয় দত্ত

সুমাইয়ার জন্ম ১৯৮৮ সালে। বড় হয়েছেন বুয়েটের টিচার্স কোয়ার্টারে। ড. আলমগীর মুজিবুল হক ও মিসেস জাহানারা হকের একমাত্র মেয়ে সুমাইয়া। আলমগীর মুজিবুল হক বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আর জাহানারা হক নগর পরিকল্পনাবিদ।

ছোটবেলাটা

ছোটবেলায় তাঁর তেমন বন্ধু ছিল না। তাঁর চোখের অসুবিধা ছোটবেলায়ই ধরা পড়েছিল। বুয়েটের বিশাল মাঠে একা একাই ঘুরে বেড়াতেন তিনি। কয়েকবার ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ককটা দেখতে পেতেন না। আবার ক্রিকেট বা বাস্কেটবল খেলতে গিয়েও একই রকম হলো। বলটা দেখতে পেলেন না। তাই একা একাই ঘুরতেন। ফুলগুলো ধরে ধরে তার গঠন, আকৃতি বোঝার চেষ্টা করতেন। কেউ যদি একটা ফড়িং ধরে দিত, তাহলে ধরে ধরে তিনি বোঝার চেষ্টা করতেন পাখা কী ধরনের বা মাথাটা। অনেক সময় বুয়েটের আবাসিক ভবনের পেছনের বড় গাছগুলোর সঙ্গে সুমাইয়া গল্প করতেন। মানুষের চেয়ে ফুল, পাখি, গাছই তাঁর বেশি আপন হয়ে উঠেছিল।

 

তখন তিন বছর

চোখের এক ভয়ানক রোগ। নাম রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা অ্যান্ড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন। সুমাইয়ার তিন বছর বয়সেই রোগটি ধরা পড়ে। এতে আক্রান্ত রোগী আলো-আঁধারের ফারাক বুঝতে পারে না। এই রোগে আক্রান্তরা একসময় পুরো দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। ডা. মোদাসসের আলী দু-তিন ঘণ্টা পরীক্ষা করে রোগটি ধরতে পেরেছিলেন। আরো জানিয়েছিলেন, এর চিকিৎসা কোথাও নেই।

 

স্কুলবেলা

সুমাইয়া স্কলাসটিকা স্কুলে পড়েছেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। সেই সময়টা তাঁর আতঙ্কে কেটেছে। শিক্ষকরা বোর্ডে লিখতেন, সুমাইয়া সামনের সিটেও বসে দেখতে পেতেন না, লিখতে পারতেন না। শিক্ষকরা খুব বিরক্ত হতেন। বারবার বলতেন, সুমাইয়াকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্কুলে পড়তে পাঠান।

মা-বাবা একবার মিরপুরের একটা স্কুলে খোঁজও নিয়েছিলেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সেই স্কুলের কারিকুলাম তাঁদের পছন্দ হয়নি, তাই তাঁরা বাধ্য হয়ে স্কলাসটিকায়ই তাঁদের মেয়েকে পড়াশোনা করান। পরে অবশ্য সুমাইয়া ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল শেষ করেন।

 

এবার কী হবে

‘ও’ লেভেল শেষে সুমাইয়া দৃষ্টিশক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেলেন। তাই ‘এ’ লেভেলের প্রথম বষের্র পর সুমাইয়া আর বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারেননি। বিষয় পরিবর্তন করে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ‘এ’ লেভেলের দ্বিতীয় বর্ষ সম্পন্ন করেন। পরের সময়টা আরো হতাশার। সহপাঠীরা বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু সুমাইয়া কী করবেন, কোথায় পড়বেন—কিছুই ঠিক হচ্ছিল না। সবার সঙ্গে দেখা করাও বন্ধ করে দেন। খাওয়াদাওয়া, ঘুম—সবই কমে যায়। তখন তাঁর মা মনসুর আহমেদ চৌধুরীর সন্ধান পান। মনসুর নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিবন্ধী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি সুমাইয়াকে প্রথমে পার্কিংস ব্রেইলার শিখতে বলেন। এরপর জব অ্যাকসেস উইথ স্পিচ শিখতে বলেন। বাকি পড়াশোনা সুমাইয়া জব অ্যাকসেস উইথ স্পিচের মাধ্যমেই করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে থাকেন। প্রতি ক্লাসেই ভয়েস রেকর্ডার নিয়ে যেতেন। রেকর্ডারে সেই লেকচার শুনতেন আর বাসায় তাঁর মা বই পড়ে শোনাতেন। এই সময়ে সুমাইয়া কিছু ভালো বন্ধুও পান।

 

অনেক দূরে যাওয়ার

স্নাতক হওয়ার পর সুমাইয়া নিজের মধ্যে শক্তি খুঁজে পান। মনে হয়, তিনি আরো অনেক দূরে ছুটে যেতে পারবেন। একসময় স্নাতকোত্তরও শেষ হয়। ড. আবু সাঈদ নোমান, ড. ক্রিস্ট পেলেগ তাঁকে খুব সাহায্য করেছেন। পরে সুমাইয়া ইউনিভার্সিটি অব লিডসে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিষয় ওই ইংরেজি সাহিত্য। সেখানে সুমাইয়া অনেক সহযোগিতা পেয়েছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার বিষয়টা সেখানে কেউ দুর্বলতা হিসেবে দেখেনি। লিডস থেকে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়েই যুক্ত হন খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। পরে ২০১৭ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে। সুমাইয়া ভালো উচ্চাঙ্গ, নজরুল, রবীন্দ্র ও আধুনিক গান করেন। দূর্বা রায়চৌধুরী, লীনা তাপসী প্রমুখের কাছে তালিম নিয়েছেন।

 

একটি প্রকল্প

যে যন্ত্রণা সুমাইয়া সহ্য করেছেন, অন্যদের যেন তা সহ্য করতে না হয়, তাইতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ১০ জন নারী মিলে একটা প্রজেক্ট দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। এই প্রজেক্টে সব নারীই উদ্যমী ও প্রতিষ্ঠিত। কেউ এনজিওতে কর্মরত, কেউ সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত, কেউ শিক্ষকতায়, কেউ আবার গৃহিণী। ১০ জন নারী একটা তহবিলের ব্যবস্থা করেছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নের জন্য তাঁরা কাজ করবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা