kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

আমাদের সবার একটি হাসপাতাল

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমাদের সবার একটি হাসপাতাল

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহায়তায় একটি কমিউনিটি সেন্টারকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর করেছেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা। এটি তৈরির পেছনের গল্প বলছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

অ্যাম্বুল্যান্সের পাশে এক লোক হুইলচেয়ারে শুয়ে আছেন। নিথর দেহ। পাশে কপালে হাত দিয়ে অঝোরে চোখের জল ফেলছেন লোকটার স্ত্রী। ছবিটার ক্যাপশনে লেখা, ‘দুটি বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে পারেননি তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাঙ্গুনিয়া থেকে আসা আইয়ুব আলীকে। অসহায় স্ত্রী তাঁকে নিয়ে চমেক হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষা করেন ভর্তি করানোর জন্য। ভর্তির পর কর্তব্যরত চিকিত্সক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।’ আলোকচিত্রী রাজেশ চক্রবর্তীর তোলা ছবিটি কাঁদিয়েছে অনেককে। বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাসও তাঁদের একজন।

 

তাঁর ডাক এলো

১১ জুন বিকেলে কিশোর কুমার নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, ‘হয়তো বাঁচাতে পারব না এই রোগীদের, তবু সুন্দর মৃত্যুর জন্য একটা খাটের ব্যবস্থা করতে চাই।’ বিদ্যানন্দের সাধারণ সম্পাদক শিপ্রা দাস বললেন, ‘আরেকটা ঘটনা পড়লাম পত্রিকায়। করোনা টেস্টের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন একজন। কিন্তু সময় লাগছিল অনেক। যতক্ষণে তাঁর ডাক এলো ততক্ষণে তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন।’

পরে নিজেদের ফেসবুক পেজে বিদ্যানন্দ মানুষের কাছে জানতে চেয়েছিল, দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে সেবা দেওয়ার জন্য একটা হাসপাতাল বানানোর কাজে হাত দিলে আপনারা কি সাহায্য করবেন? সেখানে বিপুল সাড়া মিলেছে। মানুষের আশ্বাস পেয়ে কাজে নেমে পড়লেন বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবকরা।

 

পরিকল্পনা ছিল ৫০ বেডের

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের নতুন ব্রিজ এলাকা। করোনা শুরুর পর থেকে সেখানকার একটা কমিউনিটি সেন্টারে বসে ত্রাণ বিতরণের কাজ করতেন বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবকরা। কক্সবাজারের রামু, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানে বিতরণের জন্য সেনাবাহিনী কিংবা বিজিবির সদস্যরা এখান থেকে গাড়িতে ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে যেতেন। শহরে দৈনিক পাঁচ হাজার অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য সিএমপির মানবিক পুলিশ ইউনিটের সদস্যরাও এখান থেকে খাবার নিয়ে যেতেন। শিপ্রা দাস বললেন, ‘শুরুতে  ভাবলাম, ওই সেন্টারেরই একটা অংশ ৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর করব। সেই সঙ্গে চট্টগ্রামে আরো কয়েকটা জায়গায় খোঁজ নিতে শুরু করলাম। একপর্যায়ে পতেঙ্গার বিকে কনভেনশন হলের খোঁজ পেলাম। মালিকও আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। পরে সবার সঙ্গে কথা বলে ঠিক হলো, আমরা ১০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল বানাব। আলোচনার পর নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে সিএমপি (চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ)।’

 

কাজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং

জুনের ১৮ তারিখ থেকে কাজ শুরু হলো। কমিউনিটি সেন্টারকে হাসপাতালে রূপ দেওয়া সহজ কাজ নয়। বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবকরা রাত-দিন কাজ করতে থাকলেন। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার বিষয়টি দেখছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। সিএমপির বিশেষজ্ঞদলের সঙ্গে সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের চিকিত্সকরাও অংশ নিচ্ছেন। বিদ্যানন্দের চট্টগ্রাম শাখার সমন্বয়ক জামাল উদ্দিন বললেন, ‘এ রকম কাজের অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। এর আগে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা ত্রাণ নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ছুটেছেন। রাস্তাঘাট কিংবা হাসপাতালে জীবাণুনাশক ছিটিয়েছেন। কিন্তু একটা কমিউনিটি সেন্টারকে হাসপাতাল বানানো তো বিরাট চ্যালেঞ্জ।’

যা যা আছে

তিনতলা হাসপাতাল। নিচতলায় জরুরি বিভাগ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় করোনা আক্রান্ত নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড। ভবনের ছাদে ক্যান্টিন। মোট ৮০টি শয্যা প্রস্তুত হয়ে গেছে। আরো ২০টি প্রস্তুত হয়ে যাবে। ৮০টি শয্যার মধ্যে পুরুষ রোগীদের জন্য ৫০টি, নারীদের জন্য ৩০টি। পুরো হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা আছে। তবে আইসিইউ নেই।

পাশের অন্য একটা ভবনে বহির্বিভাগ। সেখানে কভিড, নন-কভিড সব ধরনের রোগী দেখবেন ডাক্তাররা। পরবর্তী সময়ে তাঁদের পরামর্শ মোতাবেক রোগীদের ভর্তি করানো হবে হাসপাতালে।’ জামাল উদ্দিন আরো বললেন, ‘মেডিসিন, নাক, কান, গলা, গাইনি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের মোট ১২ জন চিকিত্সক নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেবেন। আরো অন্তত ২০ জন চিকিত্সক নানা সময়ে এসে চিকিৎসাসেবা দেবেন বলে কথা দিয়েছেন। নার্স থাকছে ১৬ জন, আয়া ও ওয়ার্ড বয় ৩০ জন। এঁদের সহায়তা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবক থাকছেন ৫০ জন। হাসপাতালে ভর্তি থাকা  ১০ জন (দৈনিক) রোগীর স্যাম্পল সংগ্রহ করে পাঠানো হবে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। রোগীরা থাকা-খাওয়া, ওষুধ—সবই পাবেন বিনা মূল্যে। হাসপাতালের কাছাকাছি একটা হোটেলে ডাক্তার ও নার্সদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর স্বেচ্ছাসেবকরা থাকবেন পাশের একটা সরকারি স্কুল ভবনে।’

 

ওষুধও পৌঁছে গেছে

হাসপাতালে আগত রোগীদের জন্য সম্ভাব্য ওষুধের একটা তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন চিকিত্সকরা। ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ, স্যালাইন ও ইঞ্জেকশন মিলিয়ে মোট ৭৯ রকমের ওষুধের সেই তালিকা দিয়ে ২২ জুন বিদ্যানন্দ নিজেদের ফেসবুক পেজে লিখেছে, ‘আপনিও এই হাসপাতালের মালিক, সাধারণ বাংলাদেশিদের সরাসরি অনুদানে রূপান্তরিত হচ্ছে মডেল চিকিৎসাকেন্দ্র। সেরা মানের চিকিৎসা দিতে পারব কি না জানি না, তবে সেবার সঙ্গে ভালোবাসাটুকু দিতে পারব বলে বিশ্বাস করি।’

 

অ্যাম্বুল্যান্স এসেছে

হাসপাতালের কাজ শুরুর পর বিদ্যানন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এক শুভানুধ্যায়ী। একটা অ্যাম্বুল্যান্স কিনে দিতে চান, জানালেন তিনি। এমন আশ্বাসে বিশ্বাস না হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আবেগে কেউ ১৮ লাখ টাকা খরচ করে নতুন অ্যাম্বুল্যান্স কিনে দেবেন? বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবকরাও দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু সবার ধারণা মিথ্যা করে নতুন গাড়ি কেনার জন্য ১৮ লাখ টাকা দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই ভদ্রলোক। এরই মধ্যে অ্যাম্বুল্যান্স কেনা হয়ে গেছে। রোগী নিয়ে চলাচলও শুরু করেছে।

 

জনগণের হাসপাতাল

প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠা এই হাসপাতালের নাম ‘সিএমপি-বিদ্যানন্দ ফিল্ড হাসপাতাল’। দেশ-বিদেশের সাধারণ মানুষের অর্থায়নে তৈরি হয়েছে এই হাসপাতাল। সে জন্য ব্যানারে লেখা, ‘অর্থায়নে বাংলাদেশের জনগণ’। যাঁদের হাসপাতালে ভর্তির টাকা নেই, নেই হাজার টাকা বিল দেওয়ার সামর্থ্য, সে রকম দরিদ্র রোগীরা এখানে অগ্রাধিকার পাবেন। হাসপাতালের সমন্বয়ক জামাল উদ্দিন বললেন, ‘সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল (১ জুলাই) থেকে সেবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে জনগণের এই হাসপাতাল। দেশে করোনা মহামারি যত দিন থাকবে, তত দিন অসহায় মানুষকে সেবা দিতে চেষ্টা করব আমরা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা