kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

[ বন্ধু হয়ে পাশে আছি ]

করোনা যাদের সুযোগ করে দিয়েছে

এই মহামারিতে রাজধানীর ঘরবন্দি মানুষের জরুরি প্রয়োজনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরা। ‘বৃহন্নলা’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে কাজ করছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, মানুষকে সেবাদানের সুযোগ করে দিয়েছে করোনা। খোঁজ নিয়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা যাদের সুযোগ করে দিয়েছে

সাহায্য তুলে দিচ্ছেন মুনমুন হিজড়া

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা ফারজানা জাহান। লকডাউন শুরুর পর থেকেই মোটামুটি ঘরবন্দি। মা ডায়াবেটিসের রোগী। সেদিন মায়ের ওষুধ শেষ হয়ে গেল। ফারজানা ফেসবুকে দেখেছেন, একদল স্বেচ্ছাসেবী জরুরি প্রয়োজনে সাড়া দিচ্ছে মানুষের ডাকে। ফেসবুক পেজ থেকে তাদের নম্বর নিয়ে ফোন করলেন। মুঠোফোনের ও প্রান্ত থেকে বলা হলো, ‘প্রেসক্রিপশনের ছবি আর আপনার বাসার ঠিকানাটা মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিন।’ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে বাসার সামনে হাজির তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন মানুষ। ফারজানা বলছিলেন, ‘আমি নিজেও ডায়াবেটিসের রোগী। এ সময় আমার মতো মানুষদের বাইরে বের হওয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। ওরা যে উপকারটা করল তা আজীবন মনে থাকবে।’

করোনাকালে ফারজানার মতো ঘরবন্দি মানুষের জরুরি প্রয়োজনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরা। ‘বৃহন্নলা’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে ১০ জন হিজড়াসহ ১৪ সদস্যের একটি দল রাজধানীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের প্রয়োজনে সাড়া দিচ্ছে। সংগঠনটির সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম জানালেন, ‘চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার, জরুরি ওষুধ, গর্ভবতী নারীসহ অসুস্থদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, বিপন্ন মানুষের মাঝে খাবার বিতরণসহ জরুরি সেবা দিচ্ছি। সেবা পেতে ০১৯৮০৭০৪৩৯৬, ০১৭৩৫৮৯৩১০২, ০১৭৮১৫৫৩৫২৮ নম্বরে কল করতে হবে। ফোন করলেই দরকারি পণ্যের তালিকা এবং ঠিকানা টুকে নিই। সংশ্লিষ্ট এলাকায় আমাদের যে স্বেচ্ছাসেবী আছেন তাঁকে বলে দেওয়া হয়। তিনি পণ্য কিনে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যান।’

এই সেবা একেবারেই বিনে পয়সায়। বৃহন্নলার পৃষ্ঠপোষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এসব কাজে অর্থ জোগান দিচ্ছেন বলেও জানান সাদিক।

 

শুরুটা করেছিলেন সাদিকুল

সাদিকুল ইসলাম নিজ উদ্যোগেই মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে জরুরি সেবা প্রদান শুরু করেন। নিজের বাইসাইকেলে চেপে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতেন। কিন্তু রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে এত বেশি মানুষের কল আসে যে একসময় একা সামলাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। পরে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সম্পৃক্ত করেন তিনি। এঁদেরই একজন মুনমুন হিজড়া। থাকেন নাজমউদ্দিন রোডে। বলছিলেন, “সাদিক ভাই বাড্ডায় থাকেন। সেখান থেকে ক্যাম্পাসে আসতেন। বলতেন, ‘আসেন, বাজারগুলো একসঙ্গে করি।’ যেটা সাইকেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটা তিনি পৌঁছে দিতেন। বাজার বেশি হলে আমি রিকশায় করে গিয়ে মানুষের বাসায় পৌঁছে দিতাম। দিন দশেকের মাথায় স্থানীয় এক ব্যক্তি আমাদের একটা প্রাইভেট কার ঠিক করে দেন। লোকটি বলেছিলেন, ‘হেঁটে, সাইকেলে বা রিকশায় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এভাবে তো বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারবে না। গাড়িটা ব্যবহার করো।’”

শুরুর দিকে খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, শাহবাগ, বংশাল, চকবাজার, আজিমপুর, লালবাগের মতো জায়গাগুলোতে সেবা দিতেন তাঁরা। গাড়ি পাওয়ার পর এখন ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সেবা পৌঁছে দিতে পারছেন।

 

শুধু জরুরি পণ্য নয়

শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়, রোগী, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কেউ যদি অ্যাম্বুল্যান্স না পায়, তাহলে প্রাইভেট কারে করে তাদের কাছাকাছি হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করে থাকে বৃহন্নলা। এরই মধ্যে চারজন গর্ভবতীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানালেন মুনমুন হিজড়া। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং গ্রিন লাইফ হাসপাতালে বেশ কয়েকজন করোনা রোগীর কাছে নিয়মিত ওষুধসহ সুরক্ষা সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে দুজন রোগীর জন্য নিয়মিত দুই বেলার খাবারও পৌঁছে দিয়েছেন। সাদিকুল বলেন, ইনবক্সে আসা মেসেজ এবং ফোনকলের অভিজ্ঞতাগুলো বলে বোঝানো অসম্ভব। কল পাওয়া মাত্রই বাজার নিয়ে সাহায্যপ্রার্থীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছেন আমাদের সদস্যরা। সেই সঙ্গে গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে বিনা খরচে পৌঁছে দিচ্ছি।’

এ পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিয়েছে বৃহন্নলা। ঈদের দিন ছিন্নমূল ও দুস্থ মানুষের হাতে সেমাই ও বিরিয়ানি তুলে দিয়েছেন। সাদিকুল বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্য সীমিত। এ ছাড়া হিজড়া জনগোষ্ঠীর আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরও ত্রাণসামগ্রী দিতে হচ্ছে। এখন ঘরবন্দি মানুষের বিভিন্ন চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছি।’ সাগরিকা হিজড়া বলেন, ‘আমি যেমন নাজিমউদ্দিন রোডে থাকি, তেমনি ফার্মগেটে নিশি, বংশালে প্রিয়া, নাজিমউদ্দিন রোডে মুনমুন, মোহাম্মদপুরে অনামিকা, খিলগাঁওয়ে শান্তা কাজ করে। শুরুর দিকে আমরা যে যে এলাকায় থাকতাম, সেই এলাকার এই সেবাটা দিতাম। গাড়ি পাওয়ার পর এখন পালা করে সেবা দিচ্ছি। সাদিক ভাই আর রাজন ভাই সব সময় সঙ্গে থাকেন। আমরা তাঁদের সাহায্য করি।’

 

‘আমিই যেন কভিড-১৯’

শুরু থেকেই এ কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন মুনমুন। তিনি বলেন, ‘করোনা একদিকে যেমন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষকে সেবাদানের সুযোগ করে দিয়ে আমাদের আনন্দও বাড়িয়েছে। সেই ছোটবেলায় সমাজের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েছি। কিশোর বয়সে বুঝতে পারলাম, সমাজ আস্তে আস্তে আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। মানুষগুলোও কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। সমাজের কাছে তখন আমিই যেন ‘কভিড-১৯’। দেখলেই দূরে সরে যেত। করোনা এখন আবার সবার সঙ্গে মেশার সুযোগ করে দিয়েছে। সেদিন খিলগাঁওয়ের তালতলায় গিয়েছিলাম এক নারীকে ওষুধ আর বাজার করে দিতে। বাসার নিচে গিয়ে ফোন করলাম। তিনি বাচ্চাসহ নিচে নেমে এলেন। বাচ্চাটা দেখতে খুবই সুন্দর! সাধারণত আমাদের দেখলে শিশুরা দূরে চলে যায়। কিন্তু সে গেল না। অনুমতি নিয়ে শিশুকে কোলে নিলাম। আমাকে ‘আন্টি’ বলে ডাকল। চুমুও খেল। এই আনন্দ বলে বোঝানো অসম্ভব।’

অনামিকা নামের আরেকজন হিজড়া বললেন, ‘জরুরি পণ্য কারো কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর মানুষটি যখন আমার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে, চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। যে-ই আমাকে দেখে, নিজ গ্রামের লোক ভয়ে দূরে চলে যেত, এখন সেই আমি ঢাকা শহরের মানুষকে সেবা দিচ্ছি। করোনা আমাকে মানুষের ভালোবাসা পেতে সাহায্য করেছে। এই যেমন সেদিন মোহাম্মদপুরে এক বাসিন্দা বলছিলেন, ‘আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাও এখন খোঁজ নেয় না। এই সময় আপনারা যে পাশে দাঁড়াবেন কল্পনায়ও ছিল না।’ বিপরীত চিত্রও আছে। যেমন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের একজন শিক্ষার্থী মিরপুর-১০-এ থাকেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর পরিবারের দুজন সদস্য হাসপাতালে।

শুরুর দিকে পাঠাও কিংবা উবারের মাধ্যমে বাসা থেকে হাসপাতালে খাবার পাঠাতেন তাঁরা। দুবেলা খাবার পাঠাতে গিয়ে অনেক খরচ পড়ে যেত। একদিন আমাদের ফোন দিলেন। দুই বেলা খাবার পৌঁছে দিতে আমরা রাজিও হয়ে যাই। কিন্তু তিনি বারবার জানতে চাইছিলেন, খাবারটা যেন কোনো হিজড়া না নিয়ে যায়। একজন শিক্ষিত ব্যক্তির কাছ থেকে এমন আচরণে কষ্ট পেয়েছি।’

 

সংক্ষেপে বৃহন্নলা

২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক তরুণের হাত ধরে যাত্রা শুরু। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, সমাজসচেতনতায় কাজ করছে বৃহন্নলা। সংগঠনটির সভাপতি সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সমাজে যাদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়, সেই তাঁরাই আজ সমাজের প্রয়োজনে, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে মানবসেবায় নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজ করছেন। এই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা