kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

করোনাকালের রকস্টার

কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা এখন পরিচিত ‘কেরালার করোনা-ঘাতক’ হিসেবে। কভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকিয়ে স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন ‘রকস্টার স্বাস্থ্যমন্ত্রী’। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাকালের রকস্টার

বেশভূষায় আর দশজন ভারতীয় নারী থেকে আলাদা করার উপায় নেই। পরনে সাধারণ শাড়ি। চোখে চশমা। আগে ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। তাই কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি মানুষের কাছে ছিলেন ‘শৈলজা টিচার’। তবে এখন আর মানুষ তাঁকে সেই নামে ডাকছে না। এখন তিনি ‘কেরালার করোনা-ঘাতক’। তাদের ‘রকস্টার স্বাস্থ্যমন্ত্রী’। বিশ্বজোড়া মহামারির মধ্যেও শৈলজা কেরালার মানুষদের আগলে রেখেছেন। তাঁর রাজ্যে কামড় বসাতে পারেনি করোনা। সেখানে প্রথম কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ে ২৭ জানুয়ারি।

এরপর কেটে গেছে চার মাস। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। অথচ কেরালায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ৪! সংক্রমণও খুবই কম। মাত্র সাড়ে পাঁচ শর মতো।

কেরালার এই সাফল্যের কারণ শৈলজার সময়োপযোগী পদক্ষেপ। জানুয়ারিতে চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। ২০ জানুয়ারি সংবাদপত্রে সে খবর পড়েন শৈলজা। এর আগে নিপাহ ভাইরাস মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। ভাইরাসের সংক্রমণ কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটা তাঁর ভালোই জানা আছে। তেমনি জানেন এসব পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ কতটা জরুরি। তাই নড়েচড়ে বসেন শৈলজা। তাঁর সহকারীদের মধ্যে একজন চিকিৎসকও আছেন। তাঁকে ফোন করেন। জিজ্ঞেস করেন, এই ভাইরাস কি কেরালায় আঘাত করতে পারে? উত্তর এলো, ‘অবশ্যই, ম্যাডাম।’ ব্যস, সেই দিনই প্রস্তুতি শুরু করে দেন কে কে শৈলজা।

দ্রুত র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করেন শৈলজা। তিন দিনের মাথায় তাদের নিয়ে বসেন মিটিংয়ে। পরদিন ২৪ তারিখে করোনা মোকাবেলায় কন্ট্রোল রুম বসানো হয়। প্রদেশের ১৪ জেলার চিকিৎসা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় জেলায় জেলায় কন্ট্রোল রুম গঠনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মোতাবেক নেওয়া হয় সার্বিক প্রস্তুতি। তিন দিনের মধ্যেই কেরালায় প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে।

২৭ তারিখ চীন থেকে একটি যাত্রীবাহী বিমান আসে কেরালার এক বিমানবন্দরে। থার্মাল স্ক্যানারে তাদের তিনজনের জ্বর ধরা পড়ে। তাদের সোজা নেওয়া হয় হাসপাতালে। রাখা হয় আইসোলেশনে। বাকি যাত্রীদের থাকতে বলা হয় হোম কোয়ারেন্টিনে। তাদের সবাইকে একটি করে নির্দেশিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাতে স্থানীয় মালয়ালাম ভাষায় কভিড-১৯ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা। হাসপাতালে নেওয়া তিনজনেরই করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ল। কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় সংক্রমণ ওই তিনজনেই সীমাবদ্ধ রাখা গিয়েছিল।

ফেব্রুয়ারি মাসেও পরিস্থিতি ভালোভাবেই সামাল দেওয়া যাচ্ছিল। তবে শেষ দিকে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়। ভেনিস ঘুরে এসে এক পরিবার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই সোজা বাড়ি চলে যায়। খবর পেয়েই ছুটল রেসপন্স টিম। পরীক্ষায় তাদের একজনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেল। এবার শুরু হলো কঠিন কাজ। যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছে, তাদের খুঁজে খুঁজে বের করা হলো। কয়েক শ মানুষকে রাখা হলো হোম কোয়ারেন্টিনে। পরে তাদের মধ্যে মাত্র ছয়জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে।

তবে শৈলজাকে সবচেয়ে বড় ঝড়ের মোকাবেলা করতে হয় মার্চে। এ সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরতে শুরু করে প্রবাসী শ্রমিকরা। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সবাই মূলত কেরালা দিয়েই ভারতে প্রবেশ করে। শেষ পর্যন্ত ২৩ মার্চ কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন শৈলজা। বন্ধ করে দিলেন প্রদেশের চারটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব। দুই দিন পর ভারতে শুরু হলো লকডাউন।

এ সময় প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক আটকা পড়ে কেরালায়। রাজ্য সরকার তাদের থাকার তো বটেই, খাবারেরও বন্দোবস্ত করে। টানা দেড় মাস। প্রতিদিন তিন বেলা। ঘরেই কোয়ারেন্টিনে রাখা হয় পৌনে দুই লাখ মানুষকে। স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নিতেন। নিশ্চিত করতেন তারা কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মানছে কি না।

এদিকে কেরালায় অনেক অঞ্চলেই শৌচাগার বানানো হয় বাড়ি থেকে দূরে। সেসব বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকা সম্ভব নয়। সে জন্য সরকারি খরচে বানানো হয় বিশেষ আইসোলেশন ইউনিট। সেগুলোতে রাখা হয় ২১ হাজার মানুষকে। এসব আয়োজন দেখে আবার অনেক গ্রামের মানুষই রীতিমতো ভড়কে গিয়েছিল। পালানোর তোড়জোড় শুরু করে। সেটাও থামিয়েছেন শৈলজা। নিজেই চলে গিয়েছিলেন সেসব জায়গায়। পঞ্চায়েতের মিটিং ডেকে কথা বলেছেন সবার সঙ্গে। তাদের বুঝিয়েছেন, পালাতে গেলে বরং ঝুঁকি আরো বাড়বে। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই বাঁচার একমাত্র উপায়। আর কিচ্ছু করার দরকার নেই।

এভাবেই করোনাকে ঠেকিয়ে দিয়েছেন শৈলজা টিচার। ভারতে যখন দিন দিন কভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে কেরালা ব্যতিক্রম। ভারতের বাইরের অনেক দেশও ভাবছে ‘কেরালা মডেল’ অনুসরণের কথা। এমনকি শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও চিঠি লিখে জানিয়েছেন তাঁর মুগ্ধতার কথা।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান, টাইমস অব ইন্ডিয়া দ্য হিন্দু

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা