kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

এই নিলাম মানুষের জন্য

করোনাযুদ্ধে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে তারকাদের প্রিয় জিনিস নিয়ে অনলাইনে চলছে ব্যতিক্রমী এক নিলাম। আয়োজক দাতব্য সংস্থা ‘অকশন ফর অ্যাকশন’। উদ্যোক্তাদের দুজন আলোকচিত্রী প্রীত রেজা এবং প্রকৌশলী আরিফ আর হোসেনের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আবুল বাশার মিরাজ

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এই নিলাম মানুষের জন্য

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছে গোটা বিশ্ব, বাদ যায়নি বাংলাদেশও। ঘরে থেকেই লড়তে হচ্ছে এ যুদ্ধে। লকডাউনে দিনমজুররা কর্মহীন হওয়ায় না খেয়েই দিন পার করার বিষয়টি ভাবায় ‘অকশন ফর অ্যাকশন’-এর প্রীত রেজা ও আরিফ আর হোসেনকে। আরিফ আর হোসেন বললেন, “এ সময় ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর মতো ‘সোশ্যাল ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বিষয়টি আমাদের নিলামের আয়োজন করতে সাহায্য করেছে। তবে নিলামের পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। মাত্র তিন থেকে চার দিনের মধ্যে এটির পরিকল্পনা করি। প্রথমে কথা বলি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের সঙ্গে। আমাদের প্রস্তাব শুনে সানন্দেই রাজি হন তিনি। তাঁকে যুক্ত করার বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন সাকিব আল ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা চিশতী ইকবাল। পরে তিনিও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন।’’

 

সাকিবের ব্যাট দিয়ে শুরু

২৪ মার্চ থেকে শুরু হয় নিলাম। আরিফ আর হোসেন বলেন, ‘দেশের প্রয়োজনে সব সময়ই পাশে দাঁড়ান সাকিব আল হাসান। এবারও ব্যত্যয় ঘটেনি।’ শুরুতে চিশতী ইকবালের কাছ থেকে জানলাম, ‘আমরা যেমনটা চিন্তা করছিলাম, সাকিব আল হাসান নিজেও তাঁর ব্যাটটি নিলামে তুলে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন।’

চিশতী ইকবালের মাধ্যমে আমরা সেই ব্যাটটিই ‘অকশন ফর অ্যাকশন’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিলামে ওঠাই। তাঁর ব্যাটের নিলামের ভিত্তিমূল্য রাখা হয়েছিল পাঁচ লাখ টাকা। সাকিব আল হাসানের প্রিয় ব্যাটটি শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ২০ লাখ টাকায়। এই অর্থের পুরোটাই দান করা হয় সাকিব আল হাসান ফাউন্ডেশনে। সাকিবের ব্যাটটি কিনেছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাজ নামের এক বাংলাদেশি। এরই মধ্যে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় অসহায়দের ত্রাণ সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন সাকিব।

 

চমক দেখালেন মাশরাফি

নিলামে বড় চমক নিয়ে আসেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ মাশরাফি বিন মর্তুজা। ১৮ বছর ধরে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ডান হাতের ব্রেসলেট নিয়ে হাজির হন নিলামে। প্রীত রেজা বলেন, ‘এ রকম জিনিস কেউ নিলামে দিতে পারেন, তা আমাদের ভাবনাতেই ছিল না। দেশ-বিদেশে যেখানেই ক্রিকেট খেলতে গিয়েছেন সেখানেই মাশরাফির সঙ্গী ছিল ব্রেসলেটটি। অনেকে ভেবেছিলেন এটি মূল্যবান কোনো ধাতুর তৈরি।’

কিন্তু লাইভ আড্ডায় দর্শকদের সে ভুল ভাঙিয়ে দেন মাশরাফি নিজেই। জানান, মাশরাফি নামাঙ্কিত ব্রেসলেটটি স্টিলের তৈরি। নিলামের সে লাইভ আড্ডায় যুক্ত হন শৈশব আহমেদ, বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক তামিম ইকবাল, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, নাফিজ মোমেন, চিশতী ইকবাল। দেশ-বিদেশের অনেক বিডারের দর-কষাকষির পরে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কম্পানির (বিএলএফসি) পক্ষে মমিনুল ইসলাম ৪০ লাখ টাকায় এটি কিনে নেন। আর আইপিডিসির চুক্তি মোতাবেক নিলামের টাকার ৫ শতাংশ অতিরিক্ত হিসেবে দুই লাখ টাকা যুক্ত হলে ব্রেসলেটটির মোট দাম দাঁড়ায় ৪২ লাখ টাকা। মজার ব্যাপার ব্রেসলেটটি কিনে সেটি আবার মাশরাফিকেই উপহার দেন মমিনুল ইসলাম। বলেন, ‘এটি শুধু মাশরাফির হাতেই মানায়।’ প্রতি উত্তরে মাশরাফি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মানুষের জন্য ক্রিকেট খেলেছি। সে জন্য প্রাপ্ত অর্থ শুধু নড়াইলবাসীর জন্য নয়, বরং পুরো দেশের অসহায় মানুষই এই অর্থের দাবিদার।’

 

আরো যা যা নিলামে উঠেছে

সাকিব আল হাসানের প্রিয় ব্যাট কিংবা মাশরাফির ব্রেসলেটটি ছাড়াও নিলামে উঠেছে তাহসান খানের প্রথম অ্যালবামের ডেট টেপ ও ‘ঈর্ষা’ গানের হাতে লেখা লিরিকের পৃষ্ঠা, প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির বহুল ব্যবহৃত চশমা, কবি নির্মলেন্দু গুণের নিজের হাতে লেখা কবিতা, এশিয়া প্যাসিফিক অ্যাওয়ার্ডের সময় পরা অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার প্রিয় শাড়ি, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাসকিনের হ্যাটট্রিক করা বল, লিটন দাসের এশিয়া কাপে ১১৭ বলে ১২১ করা ব্যাট, সৌম্য সরকারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির ব্যাট, সাইফ উদ্দিনের প্রিয় বল, এনামুল হক বিজয়ের সেঞ্চুরি করা ব্যাট, কিংবদন্তি ফুটবলার মোনেম মুন্নার জার্সি, চিরকুট ব্যান্ডের শিল্পী সুমির নথ, গিটারিস্ট ইমনের গিটার ও ড্রামার পাভেলের ড্রামস কিট ইত্যাদি।

 

যেভাবে ব্যয় হচ্ছে অর্থ

প্রীত রেজা বললেন, ‘আমরা কোনো ধরনের লেনদেনে অংশ নিচ্ছি না। বাংলাদেশে যেসব দাতব্য প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গে কাজ করছে যেমন—বিদ্যানন্দ, মজার স্কুল, এক টাকায় আহার, আমাল ফাউন্ডেশন, সাজেদা ফাউন্ডেশন, অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন, বন্ধু ফাউন্ডেশন, জাগো ফাউন্ডেশন, গিভ বাংলাদেশ, প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন, প্রোজেক্ট কন্যা, মাস্তুল ফাউন্ডেশন, আমরাই বাংলাদেশ-এর মতো ১৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম তালিকাভুক্ত করেছি। কোনো তারকা চাইলে আমরা সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিই। অনেক সময় তারকারা নিজ উদ্যোগেও টাকাটা মানুষের কাজে লাগান।’

 

নিলাম হয় যেভাবে

আয়োজকরা অফিশিয়ালি ফাইনাল বিডারের নাম শুধু তখনই প্রকাশ করেন, যখন নিলামের আর্থিক লেনদেন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এ জন্য তাঁরা প্রতি পর্বের পর ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়ে থাকেন। এখন পর্যন্ত সব লেনদেন এই সময়ের মাঝেই সম্পন্ন হয়েছে। লেনদেন সফল হওয়ার পর সর্বোচ্চ দরদাতার নাম প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কেউ যদি নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে না চান, তাহলে তা গোপন রাখা হয়।

রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে নিলামের ফেসবুক লাইভ আড্ডা শুরু হয়। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার দর্শক তাঁর প্রিয় তারকার প্রিয় জিনিসটির নিলামে অংশ নিতে হাজির হন। তারকাদের অনুভূতিসহ কিছু কমেন্ট করে জানতে চাওয়ার পাশাপাশি চলে নিলামের দর-কষাকষি। আয়োজকরাও চেষ্টা করেন তারকাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার। তারকাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব কিংবা বন্ধু আত্মীয়-স্বজনদের লাইভে যুক্ত করে নিলামের আড্ডাকে প্রাণবন্ত করেন।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও ঈদের কারণে নিলাম কয়েক দিন স্থগিত ছিল। দ্রুতই এটি আবার শুরু হবে বলে জানালেন প্রীত রেজা। তিনি বলেন, ‘আশা করছি ভবিষ্যতেও এভাবে দেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা