kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

কুর্মিটোলা থেকে বলছি

করোনা রোগীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর একটি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। শুরু থেকেই সেখানে রোগীদের সেবা দিয়ে আসছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স ফাতেমা আক্তার। তাঁর করোনা দিনগুলোর অভিজ্ঞতা শুনলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কুর্মিটোলা থেকে বলছি

ফাতেমা আক্তার

প্রায় বছর দুয়েক ধরে এই হাসপাতালে কর্মরত আছি। করোনার আগে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ডিউটি ছিল। তখনো দিবা, সান্ধ্য ও রাত—এভাবে দায়িত্ব বণ্টন করা ছিল। এখনো আছে। তখন সপ্তাহে এক দিন ছুটি ছিল। করোনার শুরুতে সাত দিন কাজ করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হতো। এখন ১০ দিন কাজের পর ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন আর পরিবারের সঙ্গে ছয় দিন।

 

হঠাৎ যেন সব বদলে গেল

স্বাভাবিক সময়ে আমাদের হাসপাতালের শুধু বহির্বিভাগেই দৈনিক গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী আসত। ভর্তি থাকত ছয় থেকে সাত শ। সব সময় গমগম করত হাসপাতাল। করোনাকালে এ চিত্র পুরোপুরি বদলে গেল। চিরচেনা সেই ভিড় কোথায় উধাও হয়ে গেল। মার্চের শুরু থেকেই আমার ডিউটি ছিল। প্রথম দিন হাসপাতালে ঢুকতে গিয়ে মনে হলো, যেন কোনো এক নির্জন দ্বীপে চলে এসেছি। আউটডোরে রোগী নেই। ওয়ার্ডেও ভিড় নেই। মানুষের ছোটাছুটি নেই। সবার চোখে-মুখে কেমন যেন ভয় আর উদ্বেগ।

 

একজন টিম লিডারের অধীনে কাজ চলে

আগে ইউনিফর্ম পরেই ডিউটিতে চলে যেতাম। এখন হাসপাতালে ঢুকে প্রথমে হাতে স্যানিটাইজার মাখতে হয়। পিপিই পরতে হয়। তারপর কাজ। হাসপাতালে আমরা পালা করে ডিউটি করি। তিনটি শিফট। প্রতি শিফটে একজন করে টিম লিডার থাকেন। তাঁর অধীনে পাঁচ থেকে ছয়জন করে নার্স থাকেন। রোগীর কাগজপত্র, ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী থেকে শুরু করে একটা ওয়ার্ডে যা কিছু লাগে টিম লিডার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে আসেন। পরে রোগীদের কাছে ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেন। একজন টিম লিডার এভাবে ১০ দিন চালান। এরপর আরেকজন আসেন। এভাবেই চলছে। ওয়ার্ডের ভেতরে রোগী থাকে। আর বাইরে আমাদের ডেস্ক। সেখানে রোগীর যাবতীয় ফাইলপত্র থাকে। সময় সময় আমরা গিয়ে রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দিই। আবার ডাক্তার টহলে এলে তাঁর সঙ্গে একজনকে থাকতে হয়। শুরুর দিকে অক্সিজেনের সমস্যা প্রকট ছিল। দেখা গেল, ১০০ রোগী কিন্তু সিলিন্ডার আছে ২০ থেকে ৩০টি। অথচ প্রায় ৬০ শতাংশ রোগীরই অক্সিজেন লাগবে। এখন অবশ্য এসব সমস্যা নেই।

 

কেউ দেখে না একলা মানুষ

করোনাকালে কাজ করতে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। মানুষের নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি দেখেছি ভালোবাসার রূপও। বিপুল অর্থবিত্ত থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষ কত যে অসহায়, করোনা আমাদের তা দেখিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে একজন রোগীর সঙ্গে দুই-তিনজন করে স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধব থাকত। কিন্তু করোনা রোগীর ক্ষেত্রে চিত্রটা ঠিক উল্টো। ডিউটিতে গিয়ে দেখি, অনেকের সঙ্গেই কেউ নেই। দেখাশোনা করার লোক  নেই। কেউ আসে না। এমনকি ফোনেও খোঁজ নেয় না। আক্ষরিক অর্থেই তারা একা।

ধনী-গরিব সবার বেলায়ই কথাটা খাটে। সমাজে নামডাক আছে এমন অনেক রোগীকে দেখেছি স্বজনরা হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে গেছে। একবার যেমন ৮০ বছর বয়সী এক রোগী এলেন। সম্ভবত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। নিজে নিজে চলতে পারেন না। অ্যাম্বুল্যান্সে করে ড্রাইভারের সঙ্গে কাপড়চোপড় আর কিছু শুকনো খাবার দিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখভাল করার মতো সঙ্গে কেউ নেই! এটা তো সরকারি হাসপাতাল। এখানে প্রায় ১০০ রোগীর জন্য একজন নার্স। এই রোগীর যত্ন কে নেবে? স্বজনরা এটা ভাবেনি।

 

আপা, আমার মা পড়ে আছেন

আমাদের ডেস্কে যে ফোন আছে সেটা একটু পরপর বাজতে থাকে। মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে বহুজনের কাছ থেকে ফোন আসে। এক দিন দুপুর ২টা থেকে আমার ডিউটি। মিনিট পাঁচেক আগে গিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলাম। সবে বসব, এমন সময় ফোন বাজল। ও প্রান্ত থেকে এক নারী কণ্ঠের আকুতি, ‘আপা, আমার মা পড়ে আছেন। কেউ ধরছে না। মাকে ওপরের তলায় শিফট করতে হবে।’ উনি চারতলায় সন্দেহভাজন ওয়ার্ডে ছিলেন। নিতে হবে ফিমেল মেডিসিন ওয়ার্ডে। জলদি করে পিপিই পরলাম। ওপরে গিয়ে দেখি প্রায় সব রোগী হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ভেতরে গিয়ে উনার কাপড়চোপড় ঠিক করে দিলাম। রোগীকে হুইলচেয়ারে বসালাম। তারপর চারতলা থেকে পাঁচতলায় নিয়ে গেলাম। সেখানে বিছানা, মশারি ঠিক করে দিলাম। অক্সিজেন লাগিয়ে তারপর এলাম। এভাবে সেদিন আরো চারজন রোগীকে চারতলা থেকে পাঁচতলায় দিয়ে এলাম।

 

মাকে রেখে কোথাও যাব না

প্রায় দিনই ওয়ার্ডে গিয়ে দেখেছি, বয়স্ক রোগীরা বেসামাল অবস্থায় পড়ে আছেন। তাঁদের কাপড় পরিয়ে দিয়েছি, বিছানা ঠিক করে দিয়েছি। অক্সিজেন লাগিয়ে দিয়েছি। পানি গরম করে দিয়েছি। রোগীর অ্যাটেনডেন্টকে ফোনও দিয়েছি। বলেছি, ‘রোগীর অবস্থা তো খারাপ। দয়া করে কাউকে পাঠান।’ কেউ কেউ সাড়া দিয়েছেন। আবার একদিন একজনকে বলতে শুনেছি, ‘যা হবার হোক। আমরা কেউই আসতে পারব না!’ এই যেমন সেদিন ওয়ার্ডে গিয়ে একজন রোগীকে বিছানায় দেখলাম না। পরে জানলাম, কিছুটা ভালো বোধ করায় নিজে নিজেই বাথরুমে গিয়ে গোসল করছেন। কিছুক্ষণ পর আবার এসে দেখি লোকটা বিছানার এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে আছেন। পরনে তোয়ালে। বেডের কোনায় ভেজা লুঙ্গি পড়ে আছে। পরে ব্যাগ থেকে লুঙ্গি নিয়ে লোকটাকে পরিয়ে দিলাম। বিপরীত চিত্রও আছে। এক ছেলে তার মাকে নিয়ে এসেছে। মায়ের করোনা পজিটিভ। ছেলের নেগেটিভ। ছেলেটি বলল, ‘আপা, মাকে রেখে কোথাও যাব না।’ 

 

আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে

করোনা রোগীর সেবার ক্ষেত্রে কিছু বিধি-বিধান মেনে চলতে হয়। কারণ আমাদের ঝুঁকিও কম নয়। রোগীকে গোসল করানো, কাপড়চোপড় বদলানো, খাওয়ানো—এগুলো সব সময় আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। একজন নার্সের পক্ষে শতাধিক রোগীকে সামাল দেওয়া মুশকিল।

স্বাভাবিক সময়ে ডাক দিলেই আমরা চলে যেতে পারতাম। কিন্তু করোনাকালে পিপিই পরা ছাড়া রোগীর কাছে যেতে পারি না। তবু সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে রোগীর সেবা করে যাচ্ছি। বাড়ি ফেরার পথে কেউ যখন বলে, ‘সিস্টার, আপনি দারুণ সাপোর্ট দিয়েছেন, ধন্যবাদ।’ তখন সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

 

আম্মু, আসো না কেন?

হাসপাতালের পেছনের ডরমিটরিতে থাকি। এক রুমে একা। বছর তিনেক আগে আমার স্বামী ক্যান্সারে মারা গেছেন। চার বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। মুন্সীগঞ্জে মায়ের কাছে থাকে। আগে যখনই ছুটি পেতাম বাড়ির পানে ছুটতাম। কিন্তু করোনা শুরুর পর থেকে অনেক দিন পর্যন্ত বাড়ি যেতে পারিনি। ডিউটি শেষে রুমে ফিরলে মেয়ের কথা মনে পড়ত। বুকটা খালি খালি লাগত। ভিডিও কলে কথা বলতাম। ও শুধু বলত, ‘আম্মু, আসো না কেন? তাড়াতাড়ি চলে আসো।’ শুনে কান্না পেত। কিছুদিন আগে হালকা কাশি ছিল। কোয়ারেন্টিনে ছিলাম। পরে টেস্ট করিয়েছি। যখন দেখলাম, নেগেটিভ তখন বাড়ি গেলাম। আগে বাড়ির দরজায় আমাকে দেখলে দৌড়ে কোলে এসে উঠত মেয়ে। এবার বাড়ি ফিরে সোজা বাথরুমে ঢুকেছি। গোসল শেষে কোলে তুলে সোনামণির কপালে চুমু খেয়েছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা