kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৬ জুলাই ২০২০। ২৪ জিলকদ ১৪৪১

এটা কি সেই সান্তাহার স্টেশন

১৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সান্তাহারে জন্ম। বাবা রেল কর্মকর্তা, তাই সান্তাহার স্টেশনটাই বুঝি হয়ে উঠেছিল বাড়ি। এখনো সান্তাহারেই থাকেন। করোনাকালে রেলস্টেশনের দিনলিপি লিখেছেন মাসুদ রানা আশিক

সান্তাহার থেকে বাস বা অন্য কোনো যানে দূরে কোথাও গিয়েছি মনে পড়ে না। ট্রেনই আমাদের বাহন। এখনো সান্তাহার স্টেশনেই দিনের অনেকটা সময় কাটে। আমজাদ নামের সেই লোকটাকে আমি অনেক দিন ধরেই চিনি, যিনি ডাবলু টি স্টলের পেছনে শানবাঁধানো বটগাছটার নিচে বসে থাকেন। তাঁকে আমরা বলি কানের ডাক্তার। মানুষের কান পরিষ্কার করা তাঁর কাজ। খুব সকালেই তিনি চলে আসেন স্টেশনে। হাতে থাকে একটা বাক্স, তাতে কান পরিষ্কারের কিছু যন্ত্রপাতি। শানবাঁধানো জায়গাটায় বাক্সটা রেখে আশপাশে পানি ছিটান। তারপর একটা আগরবাতি জ্বালিয়ে বসে পড়েন। শুনেছি সারা দিনে খুব বেশি হলে ২০০ টাকা আয়।

তারপর কালি করানো বাক্স মাথার লোকটাও চেনা বহুদিনের। পেশায় মুচি। সারা দিনই স্টেশনে ঘুরে বেড়ান আর বলেন, এই বুট পালিশ। বিকেল হতে হতে তাঁর পুরো হাত কালো হয়ে যেত। দিনে আয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। শনপাপড়িওয়ালার কথাও বলা যায়। জোড়া শনপাপড়ির প্যাকেট ১৫ টাকা হলেই বিক্রি করে দিতেন।

এখন সবাই অলস বসে আছেন। এই ঈদের মৌসুমেও তাঁরা বেকার! তারপর স্টেশনের লালবাহিনী? মানে যাদের আমরা কুলি বলি। তাদের হাঁকডাকে কান পাতার জো থাকত না। কোথায় তারা? হাজার হাজার মানুষের চলাচল এই স্টেশনে। নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়া অনেক সময়ই ভিড় সামলানো যেত না। টিকিট কাটতে তিনটি কাউন্টারে লাইন দিত যাত্রীরা। কাউন্টারে এখন শূন্যতা।

স্টেশনের যাত্রী

অনেক রোগীকে স্টেশনে দেখতাম। তাদের বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। প্যারালিসিস রোগীকে দুজন দুই দিক থেকে ধরে নিয়ে যায়। অনেককে দেখতাম জোরে জোরে ফোনে কথা বলছে, ‘তোমার নাতি তো তোমার কথাই বলে মা। দাদির কাছে যাব বলতে বলতে পাগল করে দেয়।’ হয়তো তখন ওপাশে আনন্দের কান্না। অনেককে দেখি অনেক বড় বড় বাক্সে ফল নিয়ে যাচ্ছে প্রিয়জনের জন্য। নিজের গাছেরই। ফরমালিন ছাড়া ফল। অনেকে আবার আসে আপনজনকে বিদায় দিতে। ট্রেন থেকে কেউ কেউ বলে ওঠে, ‘ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো বাবা।’ প্রতিবার ঈদের সময় এই স্টেশন দিয়ে কত মানুষ পারাপার হয় তার হিসাব করা সত্যি কষ্টের। ট্রেনের ছাদেও ওঠে অনেক যাত্রী। তাদের নামাতে হিমশিম খেত স্টেশন কর্তৃপক্ষ। অনেক সময় বাধ্য হয়েই যাত্রীদের নামাতে মই ব্যবহার করতে হতো। মানুষে গিজগিজ করত তখন স্টেশন। স্টেশনের পাশের রাস্তায় দাঁড়ানো অটোগুলো থেকে চিৎকার শুনতে পাওয়া যেত, ‘কই যাইবেন, ভাইজান, নওগাঁ?’ অটোর চালকরা অপেক্ষায় থাকত কখন একটা ট্রেন এসে দাঁড়াবে স্টেশনে। তাদের আয়-রোজগারের পথ খুলবে। অনেকে আপনজনকে রিসিভ করতে আসে। ঈদে সবাই এক হবে। কতই না আনন্দ। ঈদের পরও কিন্তু ভিড়। কর্মস্থলে ফিরতে হবে। তাই টিকিটের খুব খোঁজ। এখন সব সুনসান। নিথর পড়ে আছে স্টেশন। খুব অচেনা লাগে। এটা কি সেই সান্তাহার জংশন স্টেশন?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা