kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

[ দেশের মানুষ ]

শরণখোলায় আছেন ডালিম

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটির (সিপিপি) একটি স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ওহিদুজ্জামান ডালিম। দুর্যোগের খবর শোনা মাত্রই বেরিয়ে পড়েন হ্যান্ডমাইক নিয়ে। তাঁর কথা লিখেছেন মহিদুল ইসলাম

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শরণখোলায় আছেন ডালিম

সারা বিশ্বের এখন খারাপ সময়। এই সময় যাঁরা বিদেশ থেকে এসেছেন দেশে তাঁদের বাড়ি বাড়ি লাল পতাকা টাঙানো হচ্ছে। রাস্তাঘাটে ছিটাতে হচ্ছে জীবাণুনাশক স্প্রে। আর সব মানুষের কাছেই পৌঁছাতে হচ্ছে করণীয় সম্পর্কে প্রচারপত্র। খাবার বিতরণও করতে হচ্ছে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে। ওহিদুজ্জামান ডালিম আছেন সব কাজে।

 

পুরস্কার পেয়েছিলেন

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক পুরস্কার পেয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সী মানুষটি। এক ছেলে, তিন মেয়ে আর নাতি-নাতনিও আছে। তবে দেখতে এখনো তরুণই দেখায়। এই বয়সে এসেও তাঁর কোনো ক্লান্তি নেই। নিজেকে একজন স্বেচ্ছাসেবক পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করেন। বিপদের সময় নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত ভুলে যান। স্ত্রীর বকুনি খেয়েছেন অনেকবার, কিন্তু তাঁকে ফেরানো যায়নি। বললেন, ‘যত দিন সুস্থ আছি তত দিন মানুষের সেবা করে যেতে চাই।’

 

তাঁর বাড়ি

বাগেরহাট জেলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা শরণখোলার রায়েন্দা বাজারের পূর্ব মাথায় বলেশ্বর নদের তীরে  ডালিমের বাড়ি। মৃত আছমত আলী হাওলাদারের পাঁচ ছেলে, ছয় মেয়ের মধ্যে তিনি অষ্টম। ছোটবেলায় ভালো ফুটবল খেলতেন। মোরেলগঞ্জ, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটাসহ দক্ষিণের জনপদে খেলোয়াড় হিসেবে নাম করেছিলেন। পরিবার, ব্যবসা, স্বেচ্ছসেবকের কাজের ফাঁকে সময় পেলে এখনো ফুটবল মাঠে দেখা যায় তাঁকে।  

ডালিম বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিই। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর আইলা, মহাসেন, ফণি, নার্গিস, বুলবুল ইত্যাদি দুর্যোগেই দিনে, রাতেও সতর্ক বার্তা প্রচার করেছি। মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গেছি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়েছি। এখন এই করোনাকালে সবাই ঘরবন্দি। কিন্তু ঘরবন্দি মানুষগুলোরও খাওয়া-পরার ব্যাপার আছে। আছে ভালো থাকার ব্যাপারও। তার জন্যই আমরা রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি। নিজের মোটরসাইকেলের তেল পোড়াচ্ছি।’ প্রতিদিনই শরণখোলার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে ডালিমকে। কখনো প্রচারণা চালাচ্ছেন, কখনো বা লাল পতাকা টাঙাচ্ছেন, কখনো পৌঁছে দিচ্ছেন খাবার। আরো বললেন, ‘অন্য দুর্যোগে বের হলে পরিবার থেকে বেশি একটা চাপ আসত না। কিন্তু করোনা আসার পর থেকে স্ত্রী-সন্তানরা বাধা দিচ্ছে। সকালে বের হওয়ার পর থেকে আমাকে নিয়ে তারা চিন্তায় থাকছে। তবে আমি চুপচাপ বসে থাকার মানুষ নই। এই দুর্যোগে বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’

 

সেদিন ছিল সোমবার

৩০ মার্চ এক চৈত্রের দুপুর। খাঁখাঁ রোদ। ডালিমকে দেখলাম হ্যান্ড মাইক হাতে উপজেলা সদরের ঋষিপাড়ায় প্রচারে ব্যস্ত। মাইকে বলছেন, করোনায় আতঙ্ক নয়, সতর্ক হোন। অপ্রয়োজনে কেউ বাইরে বের হবেন না। ঘরে থেকে সরকারের নিদের্শনা মেনে চলুন। ওই দিন বিকেলেই তাঁকে আবার বেকার হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে সহযোগিতা করতে দেখলাম। জানলাম, আগের দিন রবিবারে ছিলেন উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সাউথখালী ইউনিয়নের তাফালবাড়ি বাজারে। গাড়িতে করে জীবাণুনাশক ওষুধ স্প্রে করেছেন। ১৮ মার্চ থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচারণা শুরু করেন ডালিম। লিফলেটও বিলি করছেন।  এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে আসা ১১ ব্যক্তিকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ এবং তাদের বাড়িগুলোতে লাল পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছেন। তবে এর মধ্যে ভারত থেকে আসা এক ব্যক্তির এক বাড়িতে লাল পতাকা টাঙাতে গিয়ে চরম অপমানিত হতে হয়েছে তাঁকে। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পরও সেখানে পতাকা টাঙিয়েছেন তিনি।

তিনি জানান, সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক হওয়ায় দুর্যোগ ও দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যসেবার ওপর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ২০১৯ সালে ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে বাংলাদেশের ৪১টি উপজেলার ৮২ জন স্বেচ্ছাসেবককে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক পুরস্কার প্রদান করে। তিনি ওই ৮২ জনের একজন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের প্রত্যেককে সদনপত্র, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিখচিত মেডেল এবং ১০ হাজার টাকার একটি চেক দেন। এটা তাঁর জীবনের পরম পাওয়া।

 

তাঁর আছে ট্রলার

ইঞ্জিনচালিত তিনটি ট্রলার আছে তাঁর। সুন্দরবন ও ইকো পার্কগুলোতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে এসব ট্রলার ভাড়া দেন। এটাই তাঁর আয়ের প্রধান উপায়। স্বেচ্ছাশ্রম দিতে গিয়ে ব্যবসায় বেশি সময় দিতে পারেন না। উল্টো গাঁটের টাকা খরচ হয়। এসব কারণে পরিবারে মাঝেমধ্যে মনোমালিন্য হয়েছে। কিন্তু এ কাজ না করে থাকতে পারেন না। সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কোনো বেতন বা সম্মানী পান না ডালিম। প্রশিক্ষণকালে অল্প কিছু পকেট মানি দেওয়া হয়। এ ছাড়া বছরে এক সেট পোশাক এবং এক জোড়া জুতা দেয় সিপিপি। তবে টাকা না পেলেও অনেক কিছু শিখতে পেরেছেন স্বেচ্ছাশ্রম দিতে গিয়ে। অল্প আহত বা অসুস্থ ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কৌশলও জানেন।

 

একবারের এক ঘটনা

ঝড়ের রাত ছিল সেটা। ৮টা কি সাড়ে ৮টা বাজে। ডালিম বাতাসের তোড়ে বলেশ্বর নদে পড়ে যান। ভাসতে ভাসতে নদের পারে একটি ঘরের পাশে গিয়ে ঠেকেন। এ সময় ওই ঘরের মধ্যে মানুষের কথার আওয়াজ শুনতে পান। তখন ভেজা অবস্থায় ঘরে উঠে দেখেন ওই ঘরের মধ্যে বৃদ্ধ দু্ই নারী-পুরুষ। ঝড় শুরু হতেই তাদের ফেলে পরিবারের সমর্থ লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছে। তখন তিনি ঘুটঘুটে অন্ধকারে দুই বৃদ্ধকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।  সিডরের পর পর অনেক ঝড় হওয়ায় সঠিক কোনো ঝড়ের ঘটনা তা তিনি মনে করতে পারেননি। ডালিম অতিথিপরায়ণ। বিনয়ী। সব সময় হাসিখুশি থাকেন। অন্যদের হাসিখুশি রাখেন। দুর্যোগে মানুষের সেবা করেই জীবন কাটিয়ে দিতে চান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা