kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

[ ভিনদেশে বাঙালি ]

মার্কিন মুল্লুকে করোনা

নিউ ইয়র্কে থাকেন অ্যাপোলো আশরাফ শাহ্। করোনায় যেমন যাচ্ছে দিনকাল তার বর্ণনা দিচ্ছেন

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মার্কিন মুল্লুকে করোনা

আমেরিকান জাতিটা বরাবরই ডাকাবুকো ধরনের, তবু ‘হুজুগে মাতাল’ এখানেও কম নেই। প্রথম যেদিন ন্যাশনাল নিউজ করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রচার করল, ওয়ালমার্টের মতো বড় গ্রসারি স্টোরগুলোতে মানুষের ঢল নামল। প্রথম ধাক্কায়ই হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও টয়লেট পেপার শেলফগুলো খালি হয়ে গেল। টয়লেট পেপার ব্যবহারে আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তবু এর দুষ্প্রাপ্যতার আশঙ্কা আমাদের খুব বেশি পীড়িত করে না। তাই সাদা আমেরিকানরা যখন চোখ বড় বড় করে টয়লেট পেপার ছিনতাইকারী দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যের লোমহর্ষক বর্ণনা দিচ্ছিল তখন আমরা তাতে বেশিক্ষণ মনোযোগ রাখতে পারিনি। আমাদের চোখে-মুখে টয়লেট পেপারহীন সমাজব্যবস্থার প্রতি উদাসীনতা ও নির্লিপ্ততা দেখে ওরা আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চিত হয়ে সন্দিগ্ধ মনে ফিরে গেল। অবশ্য কাউবয় জাতীয় লোকেরা আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ভদ্রলোকের আদিখ্যেতা নিয়ে চাপা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল। একজন তো বলেই ফেলল, টিস্যু না থাকলে কী হবে রে ব্যাটা, ওকগাছের পাতা তো আছে। অবশ্য সুবিধা হলো এই, করোনার হট্টগোলে হোর্ডার (মজুদদার) টাইপের লোকদেরও আরো একবার চিনে নিল আমেরিকা। মজুদ রাখায় বিশ্বাসী এই মানুষগুলো প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সবকিছু ঝেঁটিয়ে নিজেদের করায়ত্ত করল। দুদিন পরে এদের মুখোশও খুলে গেল। যেমন—খবর পাওয়া গেল ম্যাট নামে টেনেসির একজন আমাজন সেলার ১৭ হাজার ৭০০ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার চড়া মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুদ করেছে। দুর্যোগের সুযোগে প্রাইস গাউজিং আমেরিকায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিবেশীরাও তাদের ভালো চোখে দেখে না। ম্যাটের বিরুদ্ধে প্রাইস গাউজিংয়ের অভিযোগ আনতেই সে এগুলোকে দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করে নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছে। তবে তার এই হাতেম তাঈ ভূমিকায় অভিনয় তাকে শেষ রক্ষা করতে পারবে না বলে মনে হচ্ছে। মুক্তবাজারের দেশ আমেরিকায় কোনো পণ্যের সিলিং প্রাইস নেই। তাই ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের তারতম্যে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা সাধারণ প্র্যাকটিস। কাজেই হঠাৎ করে বাজার থেকে নাই হয়ে যাওয়া জিনিসের দাম যে আকাশ ছোঁবে সেটা জানা কথা।  

 

ভেতো বাঙালি

আমরা ভেতো বাঙালি। আমিও ব্যতিক্রম নই। তাই প্রথমেই গেলাম ওয়ালমার্টে চাল কিনতে। গিয়ে দেখি চালের শেলফ ফাঁকা। আমেরিকানরা ভাতের জন্য মরে না, তাহলে চাল নিল কে? শুধু কী চাল? ডাল, আটা, ময়দা কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাড়াতাড়ি কল দিলাম বাংলাদেশি গ্রসারির মালিক মোস্তফা ভাইকে, তিনি বললেন, এক ব্যাগ চাল আছে। আমি বললাম, ধরে রাখেন, আসতেছি। গিয়ে শুনলাম এক ব্যাগ চাল নিয়ে বেচারা আমার জন্য ধস্তাধস্তির শিকার হয়েছে। তবু ১০ কেজি চাল পেয়ে তার জন্য খাস দিলে দোয়া করলাম।

 

সোশ্যাল ডিসটেন্সিং

ভাইরাসটা আমাদের নতুন শব্দও শেখাল—সোশ্যাল ডিসটেন্সিং। ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি একবার ভেবেছিলাম  গজফিতা নিয়ে ঘুরব কিন্তু লোকজন ফাজিল ভাবতে পারে বলে বাদ দিয়েছি। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। ঘরে ঘরে সবাই বন্দি কিন্তু ওদের আছে অনলাইন গেমস। এমনিতেই এরা ফার্মের মুরগির মতো কুঠরিবদ্ধ জীবনযাপন করে, তার ওপর যুদ্ধেও গেমস খেলে খেলে ‘চিলেকোঠার সেপাই’। এদিকে সন্তানরা ঘরে থাকায় মা-বাবার জীবন অতিষ্ঠ। এরা যে কতটা অ্যানয়িং তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। এদের সারা দিন আগলে রাখা শিক্ষক সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধাবোধ এই সুযোগে তীব্রতর হলো। মার্কিন মুল্লুকে যে কত দরিদ্র বাস করে তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। পাবলিক স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চ ফ্রি দেওয়া হয়, হঠাৎ স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাচ্চারা যেন এই খাবার থেকে বঞ্চিত না হয় তার জন্য শিক্ষক আর বাস ড্রাইভার মিলে বাস রুট চালু রেখেছে, সবার ঘরে খাবার পৌঁছে যাচ্ছে। করোনা যত ছড়াচ্ছে তত মানুষকে সঙ্গ ছাড়া করা হচ্ছে। উপাসনালয়, বার, রেস্টুরেন্ট—কোথাও আড্ডা দিতে দেখা গেলে ৫০০ ডলার জরিমানা। খেটে খাওয়া মানুষদের কাজ নেই। যদিও সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তবু উৎকণ্ঠা থেকেই যায়। আমেরিকানরা ইনোভেটিভ জাতি, তারা কিছু একটা জোগাড় করেই ফেলবে, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়েও নিতে পারবে। যেমন কিছু মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এই দুর্যোগে অ্যালকোহল দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে সুলভে বিক্রি করছে। নিউ ইয়র্কের এক দম্পতি মাস্ক তৈরি করে বিনা মূল্যে বিলি করছে। কিন্তু আমরা বাঙালিরা মাইনকা চিপায়। সপ্তাহে একদিন সবাই মিলে গল্পগুজব করতে না পারলে দম বন্ধ হয়ে আসে। তবে দুর্যোগ বলে কথা। এখন স্বার্থপরতা, হীনতার সুযোগ কই? সবাই মিলেই মোকাবেলা করতে হবে। আমরা বাঙালিরা আরো বেশি পারব। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়, ১৯৮৮-এর বন্যা আমরা মোকাবেলা করেছি। তাই আমরা আরো বেশি পারব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা