kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

আমরাও তৈরি হচ্ছি

করোনাকালে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বা পিপিই গাউন নেই স্বাস্থ্যকর্মীদেরই। দেশে সংখ্যায় তাঁরা দুই লাখেরও বেশি। একপর্যায়ে ‘পে ইট ফরোয়ার্ড, বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে মিলে উদ্যোগ নিলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও হিটাচির ম্যানুফ্যাকচারিং গবেষক ড. চন্দ্র নাথ। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে শুনিয়েছেন পেছনের গল্প

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমরাও তৈরি হচ্ছি

পিপিই তৈরির জন্য একসঙ্গে মিলেছেন অনেকে

মধ্য মার্চ। বাংলাদেশেও তখন করোনা হানা দিয়েছে। ডাক্তাররা জানাচ্ছেন তাঁদের সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই। অথচ তাঁরাই তো সামনে থেকে মহামারিতে  লড়বে। তখন ভাবলাম স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো দরকার।

 

তখন দেশে গভীর রাত

ফেসবুকে একটি গ্রুপ আছে নাম ‘বুয়েটে আড়িপেতে শোনা’।  সেখানে একটি পোস্ট ছিল এমন—দুই হাজার পিপিই (পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট) বিনা মূল্যে বানিয়ে দেবে ড. ফজলে মাহবুব অভির একটি কারখানা। কিন্তু সংকট সামাল দিতে তো আরো অনেক পিপিই লাগবে। সে জন্য টাকাও দরকার। এটা ভেবেই চেনা একজন পোস্টটি আমাকে ট্যাগ (জুড়ে) দিয়েছেন।  মার্চের ২০ তারিখে আমেরিকায় তখন বিকেল আর দেশে গভীর রাত।  ড. মাহবুব বুয়েটে আমার এক ব্যাচ জুনিয়র ছিলেন। আমরা একসঙ্গে পিএইচডি করেছি সিঙ্গাপুরে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি সকাল হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। এরই মধ্যে ‘পে ইট ফরোয়ার্ড, বাংলাদেশ’-এর সমন্বয়ক ইকবাল তানজিরের ফোন। জানলাম, তাঁরাও পিপিই নিয়ে ভাবছেন। কিছুক্ষণ পর ফোনে পেলাম মাহবুবকে। তাঁর কাছে জানলাম, বাজারে সহজলভ্য ফেব্রিক দিয়ে বানানো পিপিই একবারের বেশি হয়তো ব্যবহার করা যাবে না। আর সেটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মানদণ্ড অনুযায়ী হবেও না। তবে দেশে পিপিই তৈরির বিশেষায়িত কিছু কারখানা আছে, কিন্তু লোকাল মার্কেটে পিপিই বিক্রির অনুমোদন তাদের নেই। মাহবুব আরো বললেন, দেশের বাইরে থেকে ফেব্রিক এনে বানাতে গেলে কমপক্ষে সপ্তাহ দুয়েক লেগে যেতে পারে। এ সময় বিশ্বব্যাপী পিপিইর চাহিদাও অনেক। তার ওপর চীন এটি রপ্তানির ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। আমি ভাবতে থাকলাম, কাঁচামালের ব্যবস্থা করে দেশেই পিপিই বানানো সম্ভব কি না। এর মধ্যে ‘পে ইট ফরোয়ার্ড, বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা বাদল সৈয়দ ভাইয়ের সঙ্গেও কথা বললাম। আমরা ঠিক করলাম, দেশেই কাঁচামাল জোগাড় করে পিপিই গাউন বানাব।

 

কাজে নেমে পড়লাম

পরদিন থেকেই ড. মাহবুব এবং পে ইট ফরোয়ার্ড, বাংলাদেশ-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসাইন এবং ইকবাল তানজির কাজে নেমে পড়লেন। ঢাকার কোন গার্মেন্ট কম্পানির কী কী ফ্যাসিলিটি আছে, মেশিনারি সাপোর্ট আছে কি না ইত্যাদির খবর নিলেন। এর মধ্যে ইকবাল তানজির মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের (এমঅ্যান্ডএস) হেড অব ফিন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন কামাল আহমেদ এবং  কান্ট্রি ম্যানেজার স্বপ্না ভৌমিকের সঙ্গে কথা বললেন। ওদিকে ওয়াহিদ হোসাইন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে একটা পিপিই জোগাড় করেছিলেন। তারপর এমঅ্যান্ডএসের অফিসে একটা সভা হলো। অনলাইনে সেই সভায় যোগ দিলাম। জোগাড় করা পিপিই দেখিয়ে এমঅ্যান্ডএসের প্রধান কোয়ালিটি কন্ট্রোলারের মতামত নেওয়া হলো। সভা শেষে ওয়াহিদ হোসাইন ও অন্যরা সাভারে একটা নন ওভেন কারখানায় গেলেন। কিন্তু মালিক উৎসাহ না দেখানোয় ধামরাইয়ের আরেক কারখানায় গেলেন তাঁরা। এখানে সম্মতি পাওয়া গেল। সেখান থেকে একরোল নমুনা কাপড় নিয়ে গেলেন সাভার ইপিজেডের আরেক কারখানায়। তিন ঘণ্টা বসে থেকে দুটি স্যাম্পল বানিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেই স্যাম্পল নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সরকারি ক্রয় প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরেজ ডিপোতে (সিএমএসডি) গেলেন রাত ৯টায়। সেখানকার পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদুল্লাহ পিপিইর নমুনা দেখে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি মৌখিক অনুমতি দিলেন। কিন্তু লিখিত অনুমোদন পেতে পিপিই বানাতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী।

 

অবশেষে অনুমোদন মিলল

বিভিন্ন ফেব্রিক দিয়ে কয়েকটি স্যাম্পল বানানো হলো। এখানে বলে রাখা ভালো, করোনা প্রতিরোধক্ষম পিপিই গাউন একটা হাইটেক পণ্য। এর ওয়াটার কলাম হবে ১৫০০ মিমি (ঘণ্টায় ৭৫ মাইল বেগে ঝড় এলেও বৃষ্টির ফোঁটা এর ভেতর ঢুকতে পারবে না)। আমরা বাজার থেকে পাওয়া ফেব্রিকের (সাধারণত ৬০ গ্রাম পার স্কয়ার মিটার বা জিএসএমের হয়ে থাকে) সঙ্গে আরো ৫০ জিএসএম যুক্ত করে মোট ১১০ জিএসএম কোটিংসম্পন্ন ফেব্রিক দিয়ে স্যাম্পল বানাতে সক্ষম হলাম। এরপর ডিজি হেলথ অফিস থেকে লিখিত অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা চলল। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পার হয়ে শেষে মার্চের ২৩ তারিখ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন পাওয়া গেল। শুরুতে আমরা বাজেট অনুসারে ২০ হাজার পিস পিপিই গাউন তৈরির অনুমোদন চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার পিস (লেভেল-১ ক্যাটাগরি) বানানোর অনুমোদন পাওয়া গেল। এবার  প্রয়োজনীয় পরিমাণে উপযুক্ত ফেব্রিক পেতে দৌড় লাগালেন মাঠে থাকা যোদ্ধারা। দফায় দফায় সভা হলো, ফোনে ফোনেও কথা হলো অনেক।

 

অনেকে হাত বাড়ালেন

ফেসবুক ফান্ডরাইজারের মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল শুরুতে। তারপর একে একে যোগ দেয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু গ্রুপ  ও অ্যাসোসিয়েশন। এ ক্ষেত্রে রাশেদ হাসান, তানভীর এহসানুর রহমান, আমিনুল ইসলাম ইমন, তানভীর আহমেদ লিংকন, দাইয়ান নাফিস প্রধান, অসীম কুমার রায়, জাহিদুল আলম, সরাফ আনজুম দিশার নাম উল্লেখ করতেই হয়। লেভেল-১ অনুমোদন পাওয়ার পর যোগ দিতে থাকে দেশের বাইরের বিভিন্ন কমিউনিটি এবং নন-প্রফিট সংগঠন। দেশেরও বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গ্রুপ, ব্যাচ এবং কমিউনিটির অনুদানের সমন্বয় করছেন মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সম্পাদক ড. মো. মুনিরুল হক। এক্সেলশিওর এবং সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস বিনা ফিয়ে বিভিন্ন স্থানে গাউন পৌঁছাতে সহায়তা করছে। উল্লেখ্য, ৩১ মার্চ পর্যন্ত জোগাড় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা।  

 

যেভাবে বিতরণ করছি

এখন ৪০ হাজার সেট পিপিই তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু শুধু গুগল ফর্মের মাধ্যমেই চাহিদা এসেছে দুই লাখেরও বেশি। আমরা অনলাইন ওপেন গুগল ডক খুলে বিভিন্ন শ্রেণির স্বাস্থ্যকর্মীর (ডাক্তার, নার্স প্রমুখ) নাম, হাসপাতাল ও ঠিকানা এবং সেই হাসপাতালের প্রধান এবং বিভাগীয় প্রধানের নাম ও ফোন নম্বরও সংগ্রহ করছি। আমরা একটি পিপিই বিতরণ নীতিমালাও তৈরি করেছি। ধরা যাক, ঢাকা মেডিক্যালে বিতরণ করব। গুগল ফর্ম দেখে আমরা আগেই ঠিক করব ওই হাসপাতালের কোন ইউনিটে কয়টি দেওয়া হবে। তারপর পরিচালকের রুমে ইউনিট প্রধানদের উপস্থিতিতে আমরা হাতে হাতে বুঝিয়ে দেব। সবই বিনা মূল্যে দেওয়া হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যবহারবিধিও সেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।

প্রথম ২৮০ সেট পিপিই বিতরণ করা হয়েছে ২৯ মার্চ, তেজগাঁওয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরস ডিপোতে (সিএমডিএস)। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, মোহাম্মদপুরের মা ও শিশু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য চিকিৎসা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হসপিটাল, ফৌজদারহাট বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাত হাজার সেট (৪ মার্চ পর্যন্ত) দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ঢাকায় পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর কর্তব্যরত সদস্যদের প্রায় ৫০০ পিপিই সেট দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিতরণ শুরু করেছি। 

 

সতর্ক থাকছি

পিপিই সেটের মধ্যে গাউন ছাড়াও আছে গগলস, গ্লাভস, মাস্ক, শু কাভার এবং ফেসশিল্ড। এর মধ্যে গাউন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, বাজারে সাধারণভাবে যেসব গাউন পাওয়া যায় সেগুলো ৬০ জিএসএমের। এগুলো দিয়ে করোনা প্রতিরোধ করা যায় না। আমি নিজেও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের গবেষক। তাই নিজেও অনেকবার ক্রসচেকিংয়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কোনো একটি ভুলে ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা হবে বিরাট বিপর্যয়।  

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ডাক্তার বা নার্স, যাঁরা একেবারে রোগীর সংস্পর্শে থাকবেন তাঁদের জন্য লেভেল ২ বা তারও ওপরের পিপিই দিতে চাইছি। আইসিইউতে পরা যায় এমন পিপিই সেট বানানোরও ইচ্ছা আমাদের। এখানে মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, পে ইট ফরোয়ার্ড, বাংলাদেশসহ বিজিএমইএ এবং মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের স্পেশাল টিম গত কয়েক দিন ধরে রাত-দিন খেটে যাচ্ছে। অঘোষিত লকডাউনের কারণে গার্মেন্ট পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে এগোতে পারছে না। মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার এবং বিজিএমইএ মিলে আমাদের প্রতিদিন গড়ে এক হাজার সেট পিপিই জোগান দিচ্ছে। বিজিএমইএর পক্ষে মোহাম্মদী গ্রুপের নাভিদুল হক ১০-১৫ হাজার পিপিইর অর্থায়ন করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা