kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

২৬ মার্চ : খাগড়াছড়ি সদর

আবু দাউদ কালের কণ্ঠের খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি। করোনা পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ি সদরের ২৬ মার্চের খবর বলছেন তিনি

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



২৬ মার্চ : খাগড়াছড়ি সদর

শহরের প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বরে সুনসান নীরবতা

সাংবাদিক রূপায়ণ তালুকদারের ফোনে সকালে ঘুম ভাঙল। তিনি জানতে চাইলেন, ‘মাটিরাঙ্গা উপজেলায় দুই দিন আগে কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে কি না?’ বললাম, ‘নিশ্চিত হয়ে আপনাকে জানাব।’ জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মিটন চাকমাকে ফোন দিলাম। তিনি বললেন, ‘এমন কোনো খবর আমার কাছে নেই।’ আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন গুজব ছড়িয়েছিল। 

ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পরই ফোন এলো বোন ফাতেমার। সে জানতে চাইল, খাগড়াছড়িতে করোনায় কারো মৃত্যু ঘটেছে কি?  বললাম, ‘না, করোনায় মৃত্যু হয়নি।’ তবে করোনাভাইরাস সন্দেহে বুধবার জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে এক যুবক মারা গেছেন। আগেও এই যুবক শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছিলেন। তারপর বুধবার দুপুরে জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে আবার এলে আউটডোরে দুজন চিকিত্সক তাঁকে দেখেন। হাসপাতালের জেনারেল বেডে ভর্তি নেন। পরে করোনা সন্দেহে তাঁকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়। সে রাতেই তিনি মারা যান। জেলা সিভিল সার্জন ডা. নূপুর কান্তি দাশের কাছে আরো জেনেছিলাম, মারা যাওয়ার আগেই রোগীর কাছ থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল রেখে দেওয়া হয়। ওই নমুনা ঢাকার আইইডিসিআরের কাছে পাঠানো হচ্ছে। রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা দুজন চিকিত্সক, দুজন নার্স ও একজন আয়াকে হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

এবার টিভি থেকে

আমার ছোট মেয়ের নাম তৌফিকা তাসমিন। টিভিতে খবর দেখে বলল, ‘আব্বু,  চীনের চেয়ে বেশি লোক স্পেনে মারা গেল।’ সে আরো জানালো করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ইবোলা আর সার্সকে ছাড়িয়ে গেছে। যাহোক নাশতা সেরে বাসা থেকে বের হয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বর পর্যন্ত যেতে যেতে দেখলাম সুনসান নীরবতা। অথচ এখানে মানুষের কোলাহল থাকত সব সময়। এখন  সেনাবাহিনী আর পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে। গাড়ি থেকে করোনাভাইরাস সম্পর্কে প্রচারণা কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। দুয়ের অধিক লোক একসঙ্গে দেখলেই সেনারা বাধা দিচ্ছেন। সব দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ সড়কের যান চলাচল। সড়কে চলছে না রিকশাও। জনসমাগম এড়াতে মাঠে আছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অমান্য করলেই জরিমানা করছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ি সাপ্তাহিক হাটের দিন হলেও জমেনি বাজার। ফার্মেসি ও নিত্যপণ্যের কিছু  প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও মানুষ তেমন নেই।

 

সাপ্তাহিক হাটে

সাপ্তাহিক হাট থেকে বাজার করেই পুরো সাত দিন চলেন অনেক পাহাড়ের মানুষ। দূর পাহাড়ের বাসিন্দারা তাদের জুম থেকে তুলে আনা শাকসবজিসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসেন বাজারে। সেসব বিক্রির টাকায় চাল, তেল, লবণ ইত্যাদি কিনে নিয়ে যান।  দুর্গম পাহাড়ের অনেকে হয়তো করোনার খবর পায়নি। তেমন দু-চারজনকে দেখলাম মাথায় কার্লুং (শস্য বহনের টুকরি) নিয়ে চলে এসেছে; কিন্তু বেচাকেনা না হওয়ায় তাদের কষ্ট বাড়ল। সাপ্তাহিক বাজারও করা হলো না। কষ্টেই কাটবে তাদের সপ্তাহটা।

সকাল সোয়া ১১টা নাগাদ যাই খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের দিকে। পথে মাইকিং শুনে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে যাই। কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে—‘নাকে-মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোন, নাকে-মুখে বা চোখে হাত দেবেন না, ঘরে থাকার অভ্যাস করুন’ ইত্যাদি। আরেকটু এগিয়ে আদালত সড়ক এলাকায় দেখলাম সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে জীবানুনাশক ছিটানো হচ্ছিল। একই সঙ্গে তরুণরা পথিকদের দাঁড় করিয়ে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা একেকজন নিরাপদ দূরত্বে থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

 

দুপুর হয়ে এলো

দেড়টার দিকে নারী অধিকারকর্মী সেফালিকা ত্রিপুরা ফোন দিয়ে জেলার খবর জানতে চাইলেন। বললেন, খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির (কেএমকেএস) পক্ষ থেকে তাঁরা জীবানুনাশক ও সুরক্ষা সরঞ্জাম বিতরণ করতে চান। সে ক্ষেত্রে আমার সহযোগিতাও চাইলেন তিনি। আমি তাঁকে কিছু পরামর্শ দিই এবং অরণ্য তারুণ্যের সংগঠক অপু দত্তের নাম্বারটি দিই। তিন দিন ধরে অপুর নেতৃত্বে শহরের বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়া কর্মসূচি ও জীবানুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। দুপুরে বাসায় ফিরে খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফের বের হতেই আরেক সহকর্মী সাংবাদিক নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা। দুজনে বাইকে করে শহর ঘুরে দেখি।  অনেক ঘোরাঘুরি করেও কোনো টি-স্টলই খোলা পাইনি। তবে সাধারণের মধ্যে যেমন সচেতনতা রয়েছে, তেমনি গুজবও কম নেই। শহীদ কাদের সড়কের পানখাইয়াপাড়া মোড়ে দাঁড়াতেই পাঁচ-ছয়জন লোকের জটলা দেখলাম। তারা একেকজন একেক ধরনের গল্প করছিলেন। একজন যেমন বলে উঠলেন যে, খাগড়াছড়িতে করোনায় দুজন মারা গেছে। অবশ্য তখন আমি তাঁদের আশ্বস্ত করে বললাম যে, করোনায় কারো মৃত্যুর খবর সঠিক নয়। তাঁদের মধ্যে আল আমিন নামের এক ভদ্রলোক আমার কথার প্রতিবাদ জানান। পরে অবশ্য বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলাম। এমন সময় একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া উচিত নয়; বলার পর তাঁরা আড্ডা ভাঙেন।

 

বিকেলে হাসপাতালে

হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক ডা. পূর্ণ জীবন চাকমাকে পেলাম। তিনি বললেন, মারা যাওয়া ওই যুবকের বাড়ি মহালছড়ি উপজেলার নুনছড়ি গ্রামে। বয়স ত্রিশের বেশিই হবে। শ্বাসকষ্ট তাঁর পুরনো রোগ। তিনি আগেও এই হাসপাতালে এসে চিকিত্সা নিয়েছেন। তাঁর স্বজনরা জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি ঘরে একাই থাকতেন। মা-বাবা না থাকায় স্বজনরাই তাঁকে দেখাশোনা করতেন। তেমন কারো সংস্পর্শে যাওয়ার তথ্য মেলেনি। তবে পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।

সন্ধ্যায় প্রেস ক্লাবে বসে ছিলাম। এমন সময় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য বাসন্তী চাকমার ফোন পেলাম। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি গুজব সম্পর্কে খাগড়াছড়ির সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। এই মুহূর্তে করণীয় নিয়ে মতামতও শুনতে চেয়েছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে জেলার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মিটন চাকমার সঙ্গে কথা বলি। তিনি জানালেন, সারা জেলায় এখন আইসোলেশনের জন্য শতাধিক শয্যা তৈরি আছে। আজকালের মধ্যে আরো শতাধিক শয্যা প্রস্তুত হচ্ছে। আরো জানান, খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল, গ্রিনস্টার হোটেল এবং ইকোছড়ি ইন হোটেলকে আইসোলেশনের জন্য উপযোগী করার কাজ চলছে।                                 ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা