kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

২৫ মার্চ : ঝিকরগাছা যশোর

কালের কণ্ঠের ঝিকরগাছা প্রতিনিধি এম আর মাসুদ। ১০ দিনের টানা ছুটির আগের দিন বেরিয়েছিলেন করোনা পরিস্থিতি দেখতে

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



২৫ মার্চ : ঝিকরগাছা যশোর

১০টা বেজে ৩০ মিনিট। দেখলাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আউটডোরে টিকিট নিতে দীর্ঘলাইন মানুষের। কমপ্লেক্সের ভেতরেও টিকিট হাতে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। ৩৯ নম্বর কামরায় রোগী দেখছেন ডাক্তার রশিদুল আলম। তিনি হাসপাতালটির আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার। ষাটোর্ধ্ব এক রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখছিলেন। কুশল বিনিময় শেষে বললেন, ‘আজ দুদিন ধরে আউটডোরে আসা রোগীদের বেশির ভাগই ঠাণ্ডা, কাশি বা সর্দির; কিন্তু কী করব? ডাক্তার হয়েছি যখন সেবা দিতেই হবে।’ হাতে রাবারের মোজা ও মুখে আঁটা মাস্ক দেখিয়ে বললেন, ‘এগুলো খুব কাজের না। যেহেতু করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে, তাই ভয়ও পাচ্ছি।’ ডাক্তারের ঘর থেকে বের হয়ে দেখলাম হাতে রাবারের মোজা, মুখে মাস্ক, চোখে প্লাস্টিকের বড় চশমা আর কালো রেইন কোর্ট পরা এক লোকের হাতে হ্যান্ড মাইক। তিনি ডাক্তার হাবিবুর রহমান। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বড় কর্মকর্তা। মাইকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন করোনাভাইরাস সম্পর্কে।

 

প্রবাসী মায়ের আকুতি

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ফোন দিলাম খালা তাহেরা খাতুনকে। বয়স ৬০ বছর। তাঁর বড় ছেলে দীর্ঘদিন ইতালিপ্রবাসী। তাঁর ছেলেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। খবরটি মাকে দিয়েছিল অবশ্য সুস্থ হওয়ার পরে। কেমন আছেন জানতে চাইলে বললেন, ‘বাবা, আমার ছেলের জন্য দোয়া কোরো। ওকে আল্লাহ ভালো করেছে, তোমাদেরও আল্লাহ ভালো রাখুক।’

 

কাজ নেই

দুপুর ১২টার দিকে সেঞ্চুরি ডিজিটাল প্রেসে অনেকটা অলসভাবে বসে আছেন ইসমত তোহা ও ইমরান হোসেন। প্রেসটি আশপাশের আরো দুটি উপজেলার বেশির ভাগ ছাপাছাপির কাজ করে থাকে। অন্য বছর মার্চ এলেই সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোস্টার, লিফলেটের কাজ করতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভোলে কর্মচারীরা। এবার করোনার কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় তোহাদের সব বন্ধ। ইমরান বলল, ‘আজ কয় দিন ধরে শুধু করোনাভাইরাসের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি এবং এ থেকে রেহাই পেতে করণীয় ছাপানোর কাজ করছি।’ কাল থেকে (ছুটি শুরু হচ্ছে বলে) সেটাও বন্ধ। বন্ধ থাকবে প্রতিষ্ঠানটিও।

 

যাত্রী নেই বাসে

দুপুর ১টা। বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা একটি বাস থামল ঝিকরগাছা বাসস্ট্যান্ডে। ৪০ সিটের বাসটির অর্ধেকই খালি। বাসের চালক আমির হোসেন জানালেন, যশোর থেকে বেনাপোল যাওয়ার ট্রিপে লস হয়েছে ৮০০ টাকা; যেখানে এক হাজার টাকা লাভ থাকার কথা। তিনি ভাবছেন, মানুষ করোনার ভয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। আগামীকাল থেকে আর বাসে কোনো যাত্রীই পাওয়া যাবে না।

 

সেলুনে বউনি হওয়া দায়

ঝিকরগাছা প্রেস ক্লাব গলিতে আইয়ুব আলী বক্সের সেলুনে সুধীজনেরা চুল-দাড়ি কাটাতে আসেন। সকাল ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের কাজ করতে হয়। তাই আয়-রোজগারও ভালো। কিন্তু করোনার প্রভাবে দোকানে লোকজন আসছে না। আইয়ুব আলী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত একজনও কাস্টমার পাইনি।’ একই মার্কেটের দোতলায় হাইলাইট সেলুন। টিনএজারদের ফ্যাশন কাটিং দিতে তাঁকে দিনভর হিমশিম খেতে হয়। অথচ আজ কাস্টমার নেই।

 

গলি জনশূন্য

ঝিকরগাছা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এস কে মার্কেটের ১ নম্বর গলির (জামে মসজিদের সামনে) দুই পাশে ডিজিটাল ফটো স্টুডিওর দোকান। এসব দোকান ছবি তোলার পাশাপাশি ভিসা করানো, বিমান ও ট্রেনের টিকিট বিক্রি ইত্যাদি কাজ করে। তাই গলিটি প্রায় সময়ই কোলাহলমুখর থাকে; কিন্তু এখন দোকানিরা অলস বসে আছেন। কেউ কেউ শাটার হাফ বন্ধ করে চোখ বুজে শুয়ে আছেন। সেতু স্টুডিওর আল শাহারিয়ার রুমেল বললেন, ‘করোনার আতঙ্কে মানুষ বের না হওয়ায় কোনো কাজকাম নেই। তাই প্রতিদিন দোকান খরচও পকেট থেকে গচ্চা যাচ্ছে।’ সিয়াম স্টুডিওর মালিক হাবিবুর রহমান বললেন, ‘ব্যবসা যাই হোক, আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুক। আমরা বেঁচে থাকলে, পরিবেশ ঠিক হয়ে গেলে, অবশই আবার একদিন ব্যবসা হবে।’

 

টেলিভিশন নিয়ে দৌড়

করোনাভাইরাসের সতর্কীকরণে এবং এ থেকে রেহাই পেতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ২৪ মার্চ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমী মজুমদার সব হাট-বাজারের চায়ের দোকানে টেলিভিশন বন্ধ ও বসার বেঞ্চ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পর আজ থেকে তিনি হাট-বাজারের বিভিন্ন দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অমান্যকারীকে দণ্ডিত ও জরিমানা করছেন। নওয়ালী বাজারে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের গাড়ি ঢুকতে দেখে দোকান থেকে টেলিভিশন বের করে ভোঁ-দৌড় দেন এক চা দোকানি।

 

কেনাকাটায় ধুম

বাজারঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে বাজারে বেচাকেনা হচ্ছিল খুব। মুদিখানা পট্টিতে কথা হয় বারবাকপুর (পঞ্চনগর) গ্রামের রেহেনা খাতুন ও হেলেনা খাতুনের (৪০) সঙ্গে। তাঁরা দেড় সপ্তাহের জন্য যাবতীয় কেনাকাটা করেছেন। প্রয়োজন ছাড়া আর বাড়ির বাইরে যাবেন না বলে জানালেন।

তবে বল্লা গ্রামের আরিফ হোসেন খোকন খুব চিন্তায় আছেন। তিনি পেশায় ভ্যানচালক। গত দু-তিন দিন ধরে তেমন আয়-রোজগার নেই। আগামীকাল থেকে একেবারেই বের হওয়া যাবে না, তাই কিভাবে সংসার চলবে তা ভেবে পাচ্ছেন না।

 ছবি: লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা