kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

২৫ মার্চ : শরণখোলা বাগেরহাট

মহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠের শরণখোলা প্রতিনিধি। ২৫ মার্চ সকাল সকালই বেরিয়েছিলেন করোনা পরিস্থিতি দেখতে

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



২৫ মার্চ : শরণখোলা বাগেরহাট

সৌদিফেরত খালেদা বেগমের বাড়িতে লাল পতাকা

সাড়ে ৮টায় সকালের নাশতা সারলাম। মাস্ক মুখে এঁটে রাস্তায় বের হলাম। ছোমেদ চৌধুরী নামের এক বৃদ্ধকে পেলাম। জানলাম, বয়স সত্তর। বাড়ি খোন্তাকাটা ইউনিয়নের পশ্চিম খোন্তাকাটা গ্রামে। শুধালাম, কোথায় যাচ্ছেন? বললেন, ‘করোনা নামের কী এক নতুন রোগ নাকি এসেছে। তাই উপজেলা পরিষদে কাজ সেরে একটা মাস্ক কিনে বাড়ি ফিরব।’ কাজ না থাকলে এমনিতেও খুব একটা বের হন না ছোমেদ চৌধুরী। তাদের গ্রামে আতঙ্ক থাকলেও সচেতন নয় সবাই। এর পর উপজেলা সদরের রায়েন্দা বাজারে যাওয়ার জন্য খেয়াঘাটে গেলাম। তখন খেয়া ওপারে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে অপেক্ষা করলাম। রায়েন্দা খালের ওপরের সেতুটি সপ্তাহখানেক আগে হেলে পড়ায় খেয়া নৌকাই ভরসা।

 

খেয়ায় উঠলাম

ঠাসাঠাসি করেই বসতে হলো। রায়েন্দা বাজারে উঠেই শুনলাম প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং চলছে। কিছু দূর যাওয়ার পর মধ্য খোন্তাকাটা গ্রামের আ. লতিফ গাজীকে পেলাম। তাঁর বয়স পঁচাশি। ডাকবাংলো মার্কেটের সামনে বসে ধনেপাতা বিক্রি করছেন। মাস্ক পরে বসেননি কেন জানতে চাইলে বললেন, ‘কিসের করোনা? কাফনের কাপড় আরো পাঁচ বছর আগেই কিনে রাখছি। শুধু আমার না, স্বামী-স্ত্রী দুজনেরটাই কিনছি।’ সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ বিশ্বাস তাঁর। তাই করোনাকে ভয় পান না তিনি।

বুধবার হচ্ছে রায়েন্দা বাজারের সাপ্তাহিক হাটের দিন। করোনার বিস্তার ও সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার হাটে জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে। তাই বাজারে বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ। ওষুধের দোকান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচামালের কিছু দোকান শুধু খোলা। বাজারে যারা এসেছে, বেশির ভাগেরই মুখে মাস্ক নেই। তবে রায়েন্দা ইউনিয়নের উত্তর কদমতলা গ্রামের ভ্যানচালক মহিদুলের মুখে মাস্ক দেখতে পেয়ে কৌতূহলী হলাম। বললেন, ‘নিজেকে সুস্থ রাখতে মাস্ক পরেছি। ভ্যানে বিভিন্ন ধরনের যাত্রী ওঠে, তাই সাবধানে থাকতে হয়।’

এরপর মেসার্স ভাই ভাই মেডিক্যাল হলের মালিক ফারুক হোসেন হিরুর দোকানে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘করোনার প্রভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা মাস্কের চাহিদা কেমন?’ তিনি জানান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বলতে ডেটল, স্যাভলন বা হেক্সিসল কোনোটাই তাঁর দোকানে নেই। হ্যান্ড গ্লাভসও নেই। কম্পানির কাছে অর্ডার দেওয়ার পরও পাওয়া যাচ্ছে না।

 

সকাল সাড়ে ১১টা

রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে যেতেই চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিলনের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন বাজারের পূর্ব দিকে। এখানে নির্মল দাসের বাসা। তিনি হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। তিনি একজন ধোপা। তাঁর বাসায় লাল পতাকা টাঙানো। তিনি বাসার একটি কক্ষে একা অবস্থান করছেন। নির্মল দাস কয়েক দিন আগে ভারত থেকে এসেছেন। তাই তিনি কোয়ারেন্টিনে। পরিবারের লোকজন তাঁর সঙ্গে মিশছে না, প্রয়োজন ছাড়া কথাও বলছে না কেউ। তবে তিনিই দরিদ্র পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই চেয়ারম্যান মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁর বাসায় চাল, ডাল, তেল, আলু, লবণ পৌঁছে দিলেন। এখানেই সিপিপির (সাইক্লোন প্রিপায়ার্ডনেস প্রগ্রাম) স্বেচ্ছাসেবক ও ৭ নম্বর ইউনিটের টিম লিডার ওহিদুজ্জামান ডালিমের সঙ্গে দেখা। জানালেন, এলাকায় মাইকিং করে সরকারের নির্দেশনা প্রচারের পাশাপাশি যাঁরা ভারত বা অন্যান্য দেশ থেকে এসেছেন, তাঁদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে প্রত্যেকের বাড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

 

ছয় কিলোমিটার দূরে

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে চালরায়েন্দা গ্রাম। খবর পেলাম খালেদা বেগম নামের এক সৌদিপ্রবাসী ১০ দিন আগে বাড়িতে এসেছেন। তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। নজরুল ইসলামকে নিয়ে যাই সেখানে। গিয়ে দেখি ওই বাড়িতেও লাল পতাকা। স্বামী হেমায়েত হাওলাদারও থাকেন সৌদি আরবে। বাড়িতে গিয়ে কে আছেন বলতেই দরজা খুলে দিল তাঁর দুই মেয়ে তানজুম আক্তার ও সাদিয়া সুলতানা। বললেন, ‘মাকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে। তাঁর থালা, গ্লাস, এমনকি বাথরুমও আলাদা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর তিনি বাড়িতে এসেছেন, অথচ আমরা তাঁর কাছে যেতে পারছি না, মাকে জড়িয়ে ধরে একটু আদর করতে পারছি না। খুব খারাপ লাগছে।’

আ. লতিফ হাওলাদার (৬০) নামের তাঁদের এক প্রতিবেশী আমাদের দেখে ছুটে এলেন। বললেন, ‘লাল পতাকা দেখে মানুষ এই বাড়িতে ঢুকতে ভয় পায়। গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।’ ওই গ্রামেরই মিজান ফরাজীর বয়স ৪৫। পেশায় জেলে। ১০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গত সোমবার (২৩ মার্চ) সাগর থেকে বাড়িতে এসে করোনার খবর শুনেছেন। বললেন, ‘পরিবারের সবাই পায়খানা থেকে এসে এবং খাওয়ার আগে এখন সাবান ব্যবহার করে। এর আগে এভাবে কখনো নিয়ম মানা হয়নি।’

 

বগী দশঘর গ্রামে বাড়ি

চালরায়েন্দা থেকে উপজেলা সদরের উদ্দেশে চেপে বসলাম শফিকুলের ইজিবাইকে। সহযাত্রী পেলাম শামসুল হককে। তাঁর বাড়ি সুন্দরবনসংলগ্ন বগী দশঘর গ্রামে। দিনমজুর তিনি। মাস্ক নেই বলে পরে আসতে পারেননি। পরিবারে সদস্যসংখ্যা ছয়। করোনার কারণে কেউ কাজে ডাকছে না এখন। চরম কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে। পাঁচরাস্তা মোড়ের বাদল চত্বরে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে সময় ইজিবাইক থেকে নামলাম। তারপর যে যার পথ ধরলাম। বিকেল ৩টার দিকে উপজেলা সদরের শের-ই-বাংলা সড়কে গিয়ে দেখি মাছ বিক্রেতা মো. ইউনুফ হাওলাদার মিজানের মুদি দোকান থেকে ব্লিচিং পাউডার কিনছেন। জানতে চাইলাম, এ দিয়ে কী হবে? তিনি বললেন, ‘মাছের পানি রাস্তায় পড়েছে, তাই এই পাউডার সেখানে দিতে হবে। দেশের পরিস্থিতি ভালো না। এখন কোনো কিছু নোংরা রাখা যাবে না।’ আরো জানান, বাজার থেকে বাড়ি গিয়ে আগে সাবান দিয়ে গোসল করে তার পর ঘরে ঢোকেন। পরিবারের সবাইকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন।

রায়েন্দা বাজারের খোকন বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারিতে স্যানিটাইজার হিসেবে রাখা হয়েছে সাবান। বড় ট্যাপ লাগানো জারে রাখা আছে পানি। কেউ কিছু খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন মো. খোকন শিকদার।

 

বনের বাজার

বনের ভেতরে এক বাজারে মাছের কারবার করেন জালাল মোল্লা। তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় বিকেল ৫টার দিকে। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ অফিসের উল্টো দিকে বাজারটি। এক শর মতো দোকান আছে। করোনার কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারের বেশির ভাগ দোকান বিকেল না হতেই বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা বাড়ি চলে যান। সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে। তাঁর নৌকার জেলে চালিতাবুনিয়া গ্রামের রিপন হাওলাদার ও সোহাগ ফরাজী করোনার ভয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে না।

 

আমিও পাইনি

আগের রাতে (মঙ্গলবার) একটি হ্যান্ড ওয়াশের জন্য ফোন করেছিলাম উপজেলা সদরের পাইকারি মুদি ব্যবসায়ী মো. সরোয়ার হোসেনকে। তিনি তখন খুলনার মোকামে ছিলেন। বলেন, তাঁর দোকানে কোনো হ্যান্ড ওয়াশ নেই। খুলনায় পেলে নিয়ে আসব; কিন্তু আজ রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফোন করার পর তিনি হতাশ করলেন আমাকে। বললেন, ‘খুলনার সারা মার্কেট খুঁজে কোথাও একটা হ্যান্ড ওয়াশ পাইনি। করোনাভাইরাস আসার পর হ্যান্ড ওয়াশ উধাও হয়ে গেছে। কম্পানির কাছে অর্ডার করেও পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি আরো বললেন, ‘করোনার প্রভাব পড়েছে সব কিছুতেই। নিত্যপণ্যের দাম পাইকারি বাজারে আগের চেয়ে বেড়েছে। চালের দাম প্রতি বস্তায় দেড় শ থেকে দুই শ টাকা বেড়েছে।   

 ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা