kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

২৫ মার্চ : বরগুনা সদর

সোহেল হাফিজ বরগুনায় কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি। ২৫শে মার্চ বেরিয়েছিলেন করোনা পরিস্থিতি দেখতে

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



২৫ মার্চ : বরগুনা সদর

ছাদিম আলী

আগে থেকেই কিছু সমস্যা

কিডনি সমস্যায় আব্বা অসুস্থ দেড় মাস ধরে। আট বছর আগে ওপেন হার্ট সার্জারিও হয়েছিল। উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত তিনি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার কিছুদিন পরই পেনশন বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন সম্বল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। আমার স্ত্রীর হিস্টেরেক্টমি অপারেশন শেষ হতে না হতেই আব্বাকে নিয়ে যেতে হয়েছিল ঢাকার বারডেমে। আর বারডেম থেকে ফিরতে না ফিরতেই করোনার উদ্বেগ। বাসায় বাজার-সদাই যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্যই বলা যায়। যদি বড় কোনো সংকট তৈরি হয় দুই ছেলে, বৃদ্ধ মা-বাবা আর নিতুকে নিয়ে কিভাবে পরিস্থিতি সামলাব জানি না।

 

সকাল ৯টা তখন

আমাদের ছোট শহর বরগুনা। সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হলাম। বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড থেকে আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে সোজা বাজারের দিকে চললাম। পথে দেখা হলো এলাকার ছোট ভাই জিয়ার সঙ্গে। একটি বড়সড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক সে। খানিকটা দূরত্ব রেখে দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। জিয়ার কাছে জানলাম, এক সপ্তাহ হয় বরগুনার কোনো দোকানেই কোনো হ্যান্ডওয়াশ নেই। নেই হ্যান্ড স্যানিটাইজারও। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চালের দামও বাড়িয়ে ফেলেছে। বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা প্রায়। কিছু পরে জেলা তথ্য অফিসের একটি মাইক্রোবাস দেখলাম। সেটি থেকে মাইকে করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে—করোনা মোকাবেলায় করণীয় বিষয় আর দোকানপাট (রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, কাঁচাবাজার ও ওষুধের দোকান বাদে) ও গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখার। থানা সদরের সামনে গিয়ে জিয়া বিদায় নিল। আমি থানার গেটের কাছে গেলে একজন কনস্টেবল থামাল। বলল, ‘হাত ধুয়ে নিন।’ কাছেই একটি পানির ড্রাম আর হ্যান্ডওয়াশ রাখা। হাত ধুয়ে ভেতরে ঢুকতেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবীর মোহাম্মদ হোসেনকে দেখলাম কয়েকজনের সঙ্গে  আলাপ করছেন। বললাম, ‘এত ব্যস্ততার মধ্যে আপনাকে বিরক্ত করব না, শুধু জানতে চাই, এই সময়ে অভিযোগ কেমন আসছে?’

বললেন, অনেক কম।

 

চললাম মূল শহরের দিকে

রিকশা, অটোরিকশা, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল আছে সড়কে, তবে অনেক কম। থানা মসজিদের সামনে দিয়ে ব্রিজ পার হয়ে বাজারে ঢুকলাম পূর্ব মাথা দিয়ে। মুচিপট্টির মুচিদের দেখলাম যথারীতি জুতা কালি করে চলেছে। কিছু কাস্টমারও আছে। এর পরই বরগুনার একমাত্র পোষা পাখি, মাছের অ্যাকোরিয়ামসহ মাছ ও পাখির খাবারের দোকানটা। ভাবলাম, এ দোকান খোলা রাখা ঠিক হচ্ছে কি না।  একটু বাঁক নিয়ে শাহাপট্টির দিকে গেলাম। চায়ের দোকানগুলো সরব দেখলাম। অনেকেই দল বেঁধে চা খাচ্ছে। আরেকটু সামনে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধকে দেখলাম টুকরিতে কিছু বেল নিয়ে বিক্রির আশায় বসে আছেন। চেহারা দেখে মায়া লাগল। পাশে বসলাম। জানলাম, তাঁর নাম ছাদিম আলী। সদর উপজেলার ধুপতি গ্রামে বাড়ি। এক ছেলে আর দুই মেয়ে। ছেলের আবার দুই ছেলে। ছেলে রিকশা চালায়। রিকশা চালিয়ে নিজের সংসারই সামলাতে পারে না। বুড়ো বাবা আর মায়ের খরচ চালাবে কিভাবে? মেয়ে দুটির বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়ির গাছের বেল পেড়ে বাজারে নিয়ে এসেছেন যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়। এই সময় হঠাত্ শুরু হলো হুড়াহুড়ি আর দৌড়াদৌড়ি। জেলা পুলিশের একটি দল বাজারে জড়ো হওয়া লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই খালি হয়ে গেল অলিগলি। ছাদিম আলী তখনো টুকরি নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

 

ছাদিম আলীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে

খলিফাপট্টি হয়ে মিজান টাওয়ার আর সদরঘাট মসজিদের মাঝের সড়ক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বরগুনা পৌরসভার সামনে দিয়ে চলে এলাম লঞ্চঘাট। লঞ্চঘাটের ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম নৌবন্দরের একটি কক্ষে ৮-১০ জন ঘাট শ্রমিক ঠাসাঠাসি করে শুয়ে-বসে অলস সময় পার করছে। ঘাটে বড় বড় দুটি লঞ্চ বাঁধা। পুরো লঞ্চঘাট জনশূন্য। লঞ্চ চলাচল বন্ধ। লঞ্চঘাট ঘুরে যেতে থাকলাম প্রেস ক্লাবে। ক্লাবের সদস্যদের বছরে কমপক্ষে ১২০ দিন হাজির থাকতে হয়। স্বাক্ষর করতে হয় হাজিরা খাতায়। শহরের প্রাণকেন্দ্রেই বরগুনা প্রেস ক্লাব। তিনতলা ভবন। নিচতলার বেশির ভাগটা ভাড়া দেওয়া। দ্বিতীয় তলায় কৃষি ব্যাংক। তৃতীয় তলায় উঠে অফিস সহকারী ইব্রাহিম ছাড়া কাউকেই দেখলাম না। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার সময় ইব্রাহিম একটি মাস্ক এগিয়ে দিল। বলল, আওয়ামী লীগ নেতা মশিউর রহমান সিহাব প্রেস ক্লাবের সব সদস্যের জন্য মাস্ক পাঠিয়েছেন। মাস্ক নিয়ে প্রেস ক্লাব থেকে নামতেই পকেটে থাকা মোবাইল ফোন বেজে উঠল। আরেক সাংবাদিক ছোট ভাই ফোনে জানাল, বরগুনায় নৌবাহিনীর কমান্ডার নূর-উজ-জামানের নেতৃত্বে দুই শতাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কাজ করবে।

 

আজ রোদ অনেক

হাঁটাহাঁটির কারণে ঘামে ভিজে গেছে জামা। যাচ্ছি বরগুনা সদর হাসপাতাল। হাঁটতে হাঁটতে তখন জেলা পরিষদ ছাড়িয়ে গেছি। প্রায় জনশূন্য এলজিইডির সামনে দিয়ে পৌঁছলাম বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। এখানে করোনা সন্দেহে দুজনকে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। অন্য দিনের মতো ভিড় খুব একটা চোখে পড়ল না। জরুরি বিভাগে বসে আছেন কর্তব্যরত চিকিত্সক। আশপাশে নার্স, ব্রাদারসহ দু-একজন সাধারণ রোগী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অফিস সহকারী জানালেন, এখানে ডাক্তারদেরই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। তার ওপরে নার্স ও ব্রাদাররা আছেন। তাই সামান্য সর্দি-কাশির রোগী এলেও সবাই তটস্থ হয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে বাসার দিকে ফেরার পথে মামাতো ভাই বেলালের ফোন পেলাম। তালতলী উপজেলার পচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নের স্লুইস গেট বাজারে ওরা থাকে। সেখানকার একজন বড় ব্যবসায়ীও তিনি। ফোনে আব্বার অসুস্থতার খোঁজখবর নিলেন। আমিও এই ফাঁকে জেনে নিলাম সেখানকার পরিস্থিতি। তিনি জানালেন, স্লুইস গেট বাজারের বেশির ভাগ মানুষই করোনা নিয়ে আতঙ্কিত, তবে নিয়ম সেভাবে কেউ মানছে না। সবাই যে যার মতো চায়ের দোকানে আর এখানে-সেখানে জটলা পাকাচ্ছে। বেলালের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই পৌঁছে গেলাম বাসায়। জামা-কাপড় খুলে মেলে দিলাম রোদে। হাত-মুখ ধুতে যাওয়ার সময় শুনলাম স্ত্রীর চড়া গলা—‘এতবার বললাম, বাজারে গেলে জাকিরের দোকান থেকে কিছু ডিম আর দুটি প্লাস্টিকের স্প্রে হুক আনতে, কে শোনে কার কথা।’

বললাম, ‘দোকানপাট সব বন্ধ, আনব কী করে?’

নিতু উত্তর দিল, ‘সব দোকান বন্ধ বললেই বিশ্বাস করতে হবে?’

আমার গেল মেজাজ খারাপ হয়ে। বললাম, ‘দোকানে দোকানে ঢুকে পুলিশ দোকান মালিকদের লাঠিপেটা করছে আর আমি তার মধ্যে গিয়ে বলব আমাকে দুটি স্প্রে মেশিন দেন ভাই!’ আরো বললাম, ‘দেখো, করোনা মোকাবেলায় সরকার কিন্তু অনেক কঠিন নির্দেশনা দিয়েছে। তার মধ্যে এ-ও বলা হচ্ছে, অযথা চিল্লাচিল্লি করবেন না, শান্ত থাকুন এবং আশপাশের সবাইকে শান্তিতে থাকতে দিন।’ নিতু আরো রাগতে গিয়ে হেসে উঠল, আর আমাদের দুই ছেলেও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা