kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

২৫ মার্চ : কুড়িগ্রাম সদর

রাস্তায় চলাচলকারী পথচারী, পরিবহনের চালক আর জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরোনো প্রায় সবার মুখে মাস্ক। কেউ কাউকে ঠিকমতো চিনছে না। ভয় আর আতঙ্ক সবার চোখে-মুখে। ২৫ মার্চ দিনভর উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম সদরে করোনা পরিস্থিতি দেখে বেড়িয়েছেন আব্দুল খালেক ফারুক

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



২৫ মার্চ : কুড়িগ্রাম সদর

সকাল ১১টায় আমি ছিলাম সোনালী ব্যাংকে। কর্মচারীরা সবাই মাস্ক পরে কাজ করছেন। কেউ কেউ হাতে গ্লাভসও পরেছেন। ডেস্কের সামনে লেখা ‘নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান।’ ক্যাশ কাউন্টারে টাকা ওঠাতে দাঁড়িয়েছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর হোসেন। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার শহিদুল ইসলাম মাইকে ঘোষণা দিলেন—‘মাস্ক পরে আসুন, না হলে কোনো সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।’ সেখান থেকে বাজার রোডের উত্তরা ব্যাংকে গেলাম। প্রধান ফটকে লেখা—‘মাস্ক পরে ভেতরে ঢুকুন’। আরো কয়েকটি ব্যাংক ও অফিস ঘুরে দেখলাম, মাস্ক না পরে গেলে সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদসহ আরো অফিসে ঢোকার মুখেই ড্রামভর্তি পানি আর সাবান রাখা হয়েছে হাত ধোয়ার জন্য। কুড়িগ্রাম পৌরসভা হাত ধোয়ার জন্য ২০টি পানির ড্রাম রেখেছে জনবহুল এলাকাগুলোয়।

 

হাসপাতালে নেই ভিড়

১২টা নাগাদ কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম বহির্বিভাগেও কোনো ভিড় নেই। ডিউটিতে থাকা চিকিত্সক আর নার্সরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. রেদোয়ান ফেরদৌস সজিব জানান, গুরুতর অসুস্থ রোগী ছাড়া কাউকে ভর্তি করা হচ্ছে না। বন্ধ হয়ে গেছে প্রাইভেট প্র্যাকটিস। শহরের সেন্ট্রাল ক্লিনিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক নামমাত্র খোলা রয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টায় সেবা ক্লিনিকে গিয়ে দেখলাম সুনসান অবস্থা। অথচ অন্য সব দিনে এখানে রোগীর ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না। ক্লিনিক ম্যানেজার আতাউর রহমান বাবু জানান, জরুরি বিভাগ ছাড়া সবই বলতে গেলে বন্ধ। 

 

আজ বউনি হয়নি

কুড়িগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ ভ্যানচালক আব্দুল মজিদ। বাড়ি হাসপাতাল পাড়ায়। ভ্যান চালাচ্ছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। বললেন, ‘গতকাল ৫০ টাকা আয় হয়েছে। আজ এখনো বউনি হয়নি।’ মুখে মাস্ক কেন নেই জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘চাউল কিনি না মাস্ক কিনি?’ ২০ ফুট দূরে রাস্তার ওপর রিকশা নিয়ে বসে আছেন চালক গোলাপ হোসেন। মুখে মাস্ক। চড়া রোদে কাহিল অবস্থা। তার ওপর যাত্রী নেই। দিনে আয় করে সন্ধ্যায় চাল কেনা  মানুষগুলোর আয় হঠাত্ বন্ধ হয়ে গেছে করোনার প্রকোপে। শহরে বাড়ি বলে খাদ্যবান্ধব কার্ডও নেই অনেকের। তাই স্বল্পমূল্যে চালও সংগ্রহ করতে পারছেন না। পৌর বাজারের মার্কেটের বারান্দায় সেলাই মেশিন নিয়ে বসে আছেন মাঝ বয়সী ফেরু খলিফা। আগে দৈনিক গড়ে ৩০০ টাকা আয় হতো। সেই আয়ে চলত পাঁচজনের সংসার। গতকাল ৭০ টাকা আয় হলেও আজ দুপুর ২টা পর্যন্ত বউনিই হয়নি। খলিলগঞ্জ বাজারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে ফুটপাতে বসা সাইকেল মেকার সাহেব আলী আর পান দোকানদান মিন্টু মিয়া হঠাত্ করে বেকার হয়ে গেছেন। তাঁরা চান, সরকার যেন তাঁদের কষ্ট বোঝে। তা না হলে, না খেয়ে থাকতে হবে।

 

বাড়ি ফেরার ধুম

শহরের শাপলা চত্বরে দেখলাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ নানা স্থান থেকে বাস, ট্রাক, পিকআপ আর মাইক্রোবাসে করে আসছে মানুষ। তারপর রিকশা, ভ্যান আর অটোরিকশায় ছুটছে নানা গন্তব্যে। হাতে ব্যাগ, কারো মাথায় পোঁটলা। সবারই মুখে মাস্ক আর চোখে হতাশা।  গণপরিবহন বন্ধ হবে, তাই ছুটে আসার তাড়াও ছিল। চট্টগ্রাম থেকে পিকআপ ভাড়া করে এসেছেন রডমিস্ত্রির কাজ করা ১০ যুবক। ভাড়া গুনেছেন ২১ হাজার টাকা। এদের একজন আসাদুজ্জামান জানান, কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়ি আসা ছাড়া উপায় নেই। চিলমারীর কাঠমিস্ত্রি মমিনুল মাত্র পাঁচ দিন আগে ঢাকায় গেছেন। এরই মধ্যে করোনার কারণে ফিরতে হচ্ছে বাড়ি। বললেন, ‘ধারদেনা করে ঢাকা গেছি। এখন কী করব জানি না।’ এত সর্বনাশের মধ্যে পৌষ মাস এখন ঘোষপাড়ার ফুটপাতে ফল বিক্রি করা মোকছেদ আলীর। ঢাকা থেকে দল বেঁধে আসা অনেকেই গ্রামের পথে পা বাড়ানোর আগে কিছু ফল কিনছেন।

 

মলম ছেড়ে মাস্ক

হঠাত্ করেই বেড়ে গেছে মাস্কের চাহিদা। তাই আবির্ভাব হয়েছে অনেক মৌসুমি মাস্ক ব্যবসায়ীর। মলমের ব্যবসা করতেন সওদাগরপাড়ার যুবক নাসির। এখন মাস্ক বেচেন ফেরি করে। ভিড় দেখলেই ছুটে যান। দাম মানভেদে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। তাঁর প্রতিবেশী মিলন মিয়াও কসমেটিকসের ব্যবসা ছেড়ে মাস্কের ব্যবসায় নেমে পড়েছেন। আজ তিনি তিন হাজার টাকার মাস্ক বিক্রি করেছেন। তবে এক রাজনৈতিক নেতাকে ফ্রি মাস্ক বিতরণ করতে দেখে মিলনের মন খারাপ হলো। বললেন, ‘আমার ব্যবসা শ্যাষ।’

 

প্রভাব পড়েছে কৃষি ক্ষেত্রেও

মোড়ে মোড়ে এখন চায়ের দোকান। আর তাতে টিভি থাকেই। কৃষক আর দিনমজুররা বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে বসে আড্ডা দেন আর খবর সংগ্রহ করেন। দেখলাম, করোনাভাইরাস নিয়ে তাঁরা নানা আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করছেন। চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখে সবারই কপালে চিন্তার রেখা। সদর উপজেলার সন্ন্যাসী গ্রামে আলু তোলার কাজ করেন নাজিনা বেগম। বললেন, ‘কিসের নাকি ভাইরাস আচ্ছে। কাম বন্ধ হইলে হামরা খামো কী?’ গ্রামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে সবার কার্ড নেই। রেশনে চাল বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে আটা। সেখানেও লম্বা লাইন। কুড়িগ্রামের রেশন ডিলার নুরুজ্জামান খোকা জানান, প্রতিদিন আটা কিনতে হুড়াহুড়ি লাগে। তবে সবাই চালই চায়। সরকার রেশনে চাল দিলে কর্মহীন গরিব মানুষের উপকার হতো। 

 

কেনাকাটায় তাড়াহুড়া

মার্কেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার আগে নিত্যপণ্য কেনাকাটায় অনেক তাড়াহুড়া দেখলাম। লম্বা ছুটিতে ঘরে থাকার প্রস্তুতি নিতে অনেকেই চাল, ডাল, পেঁয়াজ, সয়াবিন, মাছ-মাংসসহ নানা পণ্য কিনেছেন। চাল প্রতি কেজিতে তিন থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। দেখলাম জ্বর, সর্দি, কাশি ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের ওষুধ কেনার তাড়াহুড়া।

 

সামাজিক উদ্যোগ

কুড়িগ্রামের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নেমেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাইকিং, পোস্টার লাগানো, বিনা মূল্যে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ১৫ হাজার মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাফর আলী জানিয়েছেন, দরিদ্র নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এসব মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম পৌরসভার পক্ষ থেকেও বিনা মূল্যে ১০ হাজার মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। মাইকিং, জীবাণুনাশক ওষুধ ছিটানো ও প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের ১৪ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক মিলে প্রায় দুই হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছেন। তা বিতরণও করা হয়েছে। কলেজের উপাধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দিন জানান, কাঁচামাল সংগ্রহ করে আরো কিছু স্যানিটাইজার প্রস্তুত করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা