kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

[বাঙালির মানিক-রতন]

সাধনা ঔষধালয়

সে ছিল স্বদেশি আমলে তৈরি আয়ুর্বেদিক ওষুধ সংস্থা। ঢাকায় জন্ম, পরে শাখা মেলেছিল কলকাতার হরেক জায়গায়। তার পণ্য রপ্তানি হতো আফ্রিকা, চীনেও। এখানকার ওষুধ খেতেন সুভাষচন্দ্র থেকে শরত্চন্দ্রও। এখন বিস্মৃতির অতলে

১০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সাধনা ঔষধালয়

পাড়াটা জনশূন্য। কেমন যেন জমাট বাঁধা ভয়! ১৯৭১, এপ্রিল। পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দা খানসেনার ভয়ে পালিয়েছেন; কিন্তু টলানো যায়নি অশীতিপর যোগেশবাবুকে।

২১ নম্বর দিননাথ সেন রোডে বিশাল জায়গাজুড়ে তাঁর বাড়ি আর আয়ুর্বেদিক ওষুধের কারখানা। সেখানকার সারিবাদি সালসা, মৃতসঞ্জীবনী সুরা, বিউটি ক্রিম, দশনা সংস্কার, কূটজারিস্ট, চ্যবনপ্রাশ, মকরধ্বজ, মহাদ্রাক্ষারিষ্টের মতো ওষুধের খ্যাতি দেশজুড়ে। কারখানার প্রতিটি ইটের সঙ্গে তাঁর আত্মার সম্পর্ক। চরম অশান্ত আবহে বাড়ির সবাইকে কলকাতায় পাঠিয়ে নিজে ভিটে আঁকড়ে রয়েছেন। রয়েছেন ১৭ বছরের পুরনো দুই বিশ্বাসী দারোয়ান সুরজ মিঞা আর রামপাল।

একটি জিপ গাড়ি

৩ এপ্রিল গভীর রাতে একটি মিলিটারি জিপ এসে থামল বাড়ির সামনে। পাঁচ-ছয়জন সশস্ত্র খানসেনা লাফিয়ে নেমে বাইরের ফটকের তালা ভেঙে শুরু করল গুলিবৃষ্টি। সুরজ মিঞা পাল্টা গুলি ছুড়লেন। অসম লড়াই, তবু কেমন যেন ঘাবড়ে গেল সেনারা। জিপে উঠে চলে গেল। সুরজ অভিজ্ঞ মানুষ। বুঝলেন, আহত বাঘ আবার ফিরবে। হাত জোড় করে পালিয়ে যেতে বললেন বৃদ্ধ মনিবকে; কিন্তু যোগেশবাবু অনড়। ‘মরতে হয় তো এ দেশের মাটিতেই মরব।’

পরদিন সকালেই দ্বিগুণ বাহিনী আর অস্ত্র নিয়ে ফিরে এলো খানসেনারা। রাইফেলের মুখে সুরজ, রামপাল ও যোগেশবাবুর বিশ্বস্ত কিছু কর্মচারীকে দাঁড় করিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। সেখানে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, তারপর গুলি করে মারা হলো যোগেশচন্দ্র ঘোষকে। লুট হলো তাঁর বাড়ি, কারখানা। সেই যোগেশচন্দ্র, যিনি সূত্রাপুরে ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আয়ুর্বেদিক ওষুধের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘সাধনা ঔষধালয় (ঢাকা)’।

 দক্ষিণদাঁড়ি কারখানা, কলকাতা

ভারতের আয়ুর্বেদিক ওষুধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আজ আলোচনা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিদেশের বাজারে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে; কিন্তু এসব কিছুর অনেক আগে, স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, চীনে  আয়ুর্বেদিক ওষুধের বিপুল বাজার তৈরি করেছিলেন এক বাঙালি। যোগেশচন্দ্র দত্ত। অবিভক্ত বাংলার ঢাকা থেকে সেই ওষুধ রপ্তানি হতো বিদেশে। রসায়নের শিক্ষক তথা গবেষক যোগেশচন্দ্রের চেষ্টায় বাংলার আয়ুর্বেদ চিকিত্সাচর্চা ও ওষুধ প্রস্তুত প্রণালী প্রকৃত অর্থে আধুনিক ও বাজারমুখী হয়েছিল; কিন্তু ইতিহাসবিমুখ বাঙালি তাঁকে ভুলে গিয়েছে।

 

বয়স ১০০ পেরিয়েছে

১০৫ বছরের পথ পেরিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ঔজ্জ্বল্য এখন ম্লান। সংকুচিত হচ্ছে ব্যবসা, নিভে আসছে প্রাণবায়ু। হাল ধরার মতো হাতেরও বড় অভাব। জরাগ্রস্ত হয়েও তবু টিকে রয়েছে ‘সাধনা’ বাঙালির মেধা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, উদ্যোগী মানসিকতা ও সফল ব্যাবসায়িক প্রচেষ্টার প্রায় বিস্মৃত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। কলকাতার অনেক মোড়ে এখনো হঠাত্ চোখে পড়ে ‘সাধনা ঔষধালয় (ঢাকা)’-এর আদ্যিকালের গন্ধমাখা, মলিন, ছেঁড়া ব্যানার। গোটা ভারতজুড়ে এখনো প্রায় ১৩০টি দোকান তাদের। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে গোটা তিরিশ। তবে বেশির ভাগ দোকান বছরের বেশির ভাগ দিন বন্ধ থাকে, বহু ওষুধই আর পাওয়া যায় না।

 

চামচিকা বাসা বেঁধেছে

আশির দশক পর্যন্ত ছিল সংস্থার সোনার সময়। ১৯৯৫ সালে ব্যবসা কমে বাত্সরিক লাভ দাঁড়ায় চার কোটির মতো। এখন তা আরো কমে বার্ষিক দুই কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এপার বাংলায় প্রথম কারখানা তৈরি হয় ১৯৪৮ সালে দক্ষিণদাঁড়িতে। রেজিস্ট্রি হয় ১৯৫২ সালে। এলাকার রাস্তার নাম এখনো সাধনা ঔষধালয় রোড। কারখানা চত্বরটি বিশাল, ভগ্নপ্রায়। একদা যত্নে লালিত বাগানে এখনো অজস্র ফলের গাছ; কিন্তু চারদিকে আগাছার লাগামছাড়া বাড়বাড়ন্ত। বড় থামওয়ালা বাড়িগুলো পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপের মতো। সেখানে মাকড়সা, চামচিকা, ইঁদুর, পেঁচার বাসা। লম্বা লম্বা ঝুল। কবেকার পুরনো, দামি কাঠের আসবাবে পুরু ধুলা। চওড়া কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ধুপ-ধুপ শব্দের অনুরণন। পাঁচিল ভেঙে পড়েছে নানা দিকে। অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাদের ইন্ধনে ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে কারখানার জমি।

কলকাতা ও সন্নিহিত এলাকায় একসময় মোট পাঁচটি কারখানা ছিল ‘সাধনা’র। দক্ষিণদাঁড়ির পর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একে একে লেক টাউন, টালিগঞ্জ, কাশীপুর ও বেলুড়ে কারখানা হয়; কিন্তু এখন টিমটিম করে চালু শুধু দক্ষিণদাঁড়ির কারখানা। সেখানেও শ্রমিক সংখ্যা কমতে কমতে ৩৮। কিছু ওষুধ, চূর্ণ, তেল ‘জিএমপি’ পেয়েছে। বাকিগুলোও যাতে শংসাপত্র পায়, তার জন্য তৈরির পুরনো প্রক্রিয়া ও যন্ত্রপাতি বদলানো হচ্ছে। ওষুধ বানানোর শুদ্ধ উপকরণ পেতেও এখন তাদের নাজেহাল অবস্থা (একসময় খাঁটি সোনা, রুপা, বহু গাছগাছড়া, এমনকি ওষুধবিশেষে পাঁঠার মাংসের তেল ব্যবহার করা হতো)। কোনো ক্রেতা যখন দোকানে এসে ‘সাধনা বিউটি ক্রিম’ বা ‘সারিবাদি সালসা’ কিনে এক গাল হেসে বলেন, ‘আমাদের বাড়ি এখনো এটা ছাড়া চলে না’, তখন পুরনো কর্মীদের মনে হয় অন্ধকার পথের শেষে টিমটিমে একটা বাতি এখনো জ্বলছে। আসামে এখনো বেশ জনপ্রিয় ‘সাধনা’। বিক্রি ভালো হচ্ছে ঢাকায়ও।

 

সময়টা স্বদেশি

ফেরা যাক উনিশ শতকের প্রথম পর্বে। সেখানেই নিহিত ‘সাধনা’র মতো ‘স্বদেশি উদ্যোগ’-এর উত্স। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তে গর্জে উঠল বাঙালি। শুরু হলো স্বদেশি বয়কট আন্দোলন। বিদেশি জিনিস বর্জনের পাশাপাশি দেশি জিনিস ব্যবহারের ঢেউ উঠল। এগিয়ে এলেন জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ বাঙালি উদ্যোগপতিরা। একের পর এক বাঙালি সংস্থা জন্ম নিতে লাগল। এ পর্বেই ১৯১৬ সালে খগেন্দ্রচন্দ্র দাস, আরএন সেন এবং বিএন মৈত্রের হাত ধরে যাত্রা শুরু ক্যালকাটা কেমিক্যালের। এর বেশ আগে ১৮৯০-৯১ সালে এসে গিয়েছে হেমেন্দ্রমোহন বসুর ‘সিলিন্ডার রেকর্ড’, ‘কুন্তলীন’ তেল, ‘দেলখোস সুবাস’ ও ‘তাম্বলিন’ পান-মসলা। এসেছে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’। উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়ায় কিশোরীমোহন বাগচী খুলে ফেলেছেন ‘পি এম বাগচী অ্যান্ড কোং।’ লেখার কালি দিয়ে তাঁদের জয়যাত্রা শুরু। তারপর সুগন্ধি, রাবার স্ট্যাম্প, সিরাপ, ওষুধ কিছুই বাদ যায়নি। এরাই নিজেদের সুগন্ধির বিজ্ঞাপনে লিখত ‘ফরগেট মি নট।’ ছিল শোভাবাজার এলাকার ‘বটকৃষ্ণ পাল অ্যান্ড কোং।’ তাদের নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি ম্যালেরিয়ার ওষুধের তখন ভারতজোড়া পরিচিতি।

বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পর একে একে সামনে এলো ‘বেঙ্গল পটারি’, ‘বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস’, ‘বন্দে মাতরম ম্যাচ ফ্যাক্টরি’, ‘বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস’, সুরেন্দ্রমোহন বসুর ‘বেঙ্গল ওয়াটারপ্রুফ’ আর ১৯১৪ সালে ‘সাধনা ঔষধালয় (ঢাকা)’। এর পরে আসবে ‘ক্যালকাটা ফ্যান ওয়ার্কস’, ‘বেঙ্গল ল্যাম্প’, ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’। ‘রেডিয়ম ক্রিম’, নগেন্দ্রনাথ শাস্ত্রীর ‘হিমকল্যাণ’, সি কে সেনের ‘জবাকুসুম’ বা ডাক্তার উমেশচন্দ্র রায়ের এস সি রায় অ্যান্ড কোংয়ের ‘পাগলের মহৌষধ’-এর মতো বহু পণ্যের বিক্রিই তখন বিপুল। এই তালিকার প্রথম সারিতে উঠে এসেছিল যোগেশচন্দ্রের ‘সাধনা ঔষধালয়’।

 

গুরুর মান রাখলেন

মাস্টারমশাই প্রফুল্লচন্দ্র রায় স্বদেশি উদ্যোগের যে স্বপ্ন প্রিয় ছাত্রের মন ও মস্তিষ্কে বপন করেছিলেন, তাকে মহীরুহে পরিণত করেছিলেন যোগেশচন্দ্র। অবিভক্ত বাংলার শরীয়তপুরের গোসাঁইরহাটে জলচ্ছত্র গ্রামে ১৮৮৭ সালে জন্ম যোগেশচন্দ্র ঘোষের। বাবা পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। সংস্থার একমাত্র ও শেষ উত্তরাধিকারী, যোগেশচন্দ্রের পৌত্রী শীলা ঘোষ জানালেন, ১৯০২ সালে ঢাকার কে এল জুবিলি স্কুল থেকে তাঁর ঠাকুরদা এন্ট্রান্স পাস করেন। দুই বছর পর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ পাস করে চলে যান কোচবিহার। ১৯০৬ সালে সেখানকার কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএ করেন। ১৯১২ সাল পর্যন্ত ভাগলপুর কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, তারপর অধ্যাপনা শুরু জগন্নাথ কলেজে। ১৯৪৮ সালে সেখান থেকেই অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নেন। তিনি ‘রয়াল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি’র ফেলো এবং ‘আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’র সদস্যও ছিলেন। প্রথম থেকেই আগ্রহ ছিল আয়ুর্বেদে। পরে  নেশায় পরিণত হয়। ওষুধ তৈরিতে রসায়নশাস্ত্রের জ্ঞান পুরোপুরি কাজে লাগান তিনি। প্রচুর বইও লিখেছেন আয়ুর্বেদের ওপর।

ঢাকায় তাঁর ওষুধ কারখানায় সুভাষচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, চিকিত্সক নীলরতন সরকারের মতো অনেকে গিয়েছেন। ‘সাধনা’র জ্বরের ওষুধের অন্যতম ক্রেতা ছিলেন শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ওষুধ খেয়ে ফল পেয়ে যোগেশচন্দ্রের ছেলে নরেশচন্দ্রকে ধন্যবাদ দিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন তিনি।

যোগেশচন্দ্র বিয়ে করেছিলেন কিরণবালাকে। এক ছেলে ও দুই মেয়ে তাঁদের। ছেলে নরেশচন্দ্র ছিলেন এমবিবিএস ডাক্তার এবং যোগ্য উত্তরসূরি। দেশভাগের পর ‘সাধনা’কে জিইয়ে রেখেছিলেন তিনিই। ১৯৫০-১৯৬০ এর দশকে ভারতের প্রায় প্রতিটি শহরে ‘সাধনা’র দোকান ছিল, বিশেষ করে বিহার ও আসামে ছিল অসম্ভব চাহিদা। বিদেশেও প্রচুর ওষুধ রপ্তানি হতো। সে সবই এখন ইতিহাসের গর্ভে।

সূত্র : আনন্দবাজার (অভিযোজিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা