kalerkantho

বুধবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২ ডিসেম্বর ২০২০। ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

মনোভূমি

ভার্সিটি লাইফে সবই হয়েছে আমার সঙ্গে

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চোখ বন্ধ করলে এখনো ওই দিনের সব কিছু স্পষ্ট মনে পড়ে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম দিন। বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে বানানো ডিপার্টমেন্টের বুথের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছি। বুথ থেকে সবাইকে সিলেবাস, ম্যাগাজিন ও আইডি কার্ডভর্তি কাগজের ব্যাগ দিচ্ছিল। যে ভাইটা সবার হাতে কাগজপত্র দিচ্ছেন, তিনি আমার পরিচিত। ফেসবুকে একটা গ্রুপ আছে, ঝটঝঞ অফসরংংরড়হ অরফ—ভাইটা ওই গ্রুপের অ্যাডমিন। বললেন, ‘সেন্ট্রাল ওরিয়েন্টেশন শেষে ‘ই’ বিল্ডিংয়ের ৩২৮ নম্বর রুমে যাবা। ওইখানে তোমাদের ডিপার্টমেন্টাল ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হবে।’ সেন্ট্রাল ওরিয়েন্টেশন শেষ হতেই ‘ই’ বিল্ডিংয়ের দিকে গেলাম। ডিপার্টমেন্টের ঠিক সামনে আসতেই থমকে গেলাম। এতক্ষণের আনন্দ সব হাওয়া। কয়েকবার লেখাটির দিকে তাকালাম। ইংরেজিতে বড় করে লেখা, জধম উধু. যে রুমে আমাদের ওরিয়েন্টেশন হবে, সে রুমের সামনেই এ রকম লেখা দেখে মাথা গোলাতে শুরু করল। ভাবলাম, চুপি চুপি বাসায় চলে যাব কি না। পরে মনে হলো, লাভ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু ভর্তি হয়েছি, আজ হোক, কাল হোক র্যাগের মুখোমুখি হতেই হবে। তবে একটা জিনিস কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না। জানতাম, র্যাগ একটা আন-অফিশিয়ালি জিনিস, যেটা শুধু সিনিয়র ভাই-আপুরা দেন; কিন্তু এখানে এসে দেখি স্যাররাও আছেন। তা না হলে রুমের বাইরে এত বড় করে র্যাগ ডে লেখা আর্ট করা ককশিট লাগাবে কেন? ভয়ে জড়সড় হয়ে পেছনের দিকের একটি সিটে গিয়ে বসলাম। তখনো অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। নতুনদের সবাই খুব হাসি-খুশি হয়ে ক্লাসরুমে ঢুকছিল। মনে মনে বললাম, ‘শালারা, একটু পরই মজা বুঝবা।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যাররা চলে এলেন। অনুষ্ঠান শুরু হলো। আমার ধারণার মতো কিছুই সেদিন হলো না।

ভাবতেই অবাক লাগছে, এরই মধ্যে আমার র্যাগ ডে পালন  শেষ! সেদিনও ‘অপরাহ্নের আলাপন’ অনুষ্ঠানে বলেছি, আমার যে সম্মান শেষ হয়ে যাচ্ছে, ও পধহ'ঃ নবষরবাব ঃযরং!  কারণ, চোখের পলকেই সম্মানের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে—এটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। আর আমি সাইজে যেমন ছোট, ঠিক তেমনি বয়সেও। আমার বয়সী একটা ছেলে, যাকে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র বলে দিব্যি চালিয়ে দেওয়া যাবে, তার কি না বিবিএ শেষ! ভার্সিটি যাওয়ার পথে প্রায়ই এক চাচার সঙ্গে দেখা হতো। জিজ্ঞেস করতেন, ‘মুহিত, স্কুলে যাচ্ছ?’ হাসতে হাসতে বলতাম, ‘জি না চাচা, কিন্ডারগার্টেনে যাচ্ছি!’

আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পুরোটাই রঙিন। শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রগ্রামে স্ট্যান্ডআপ কমেডি করেছি, ক্লাব করেছি, লেখালেখি করেছি, ফ্রিতে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের গাইডলাইন দিয়েছি, বন্ধুদের নিয়ে ভিডিও বানিয়েছি, বিভিন্ন কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছি। রাত জেগে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, মাঝরাতে কিলোরোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নস্টালজিক হয়েছি, নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া টিলার পুরোটাই চষে বেড়িয়েছি। আরো কত কি যে করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই!

আপন মানুষদের চরম স্বার্থপর হিসেবে আবিষ্কার করা, ভিড়ের মধ্যে থেকেও নিজেকে একা মনে হওয়া, মাঝে মাঝে খাপ খাইয়ে চলতে না পারার কষ্ট, খোলামেলা আচরণের জন্য সমালোচনা, লেখালেখির জন্য ব্যঙ্গাত্মক অর্থে সুধী উপাধি পাওয়া, বিভিন্ন রকমের ছ্যাঁকা খাওয়া, সামনে না থাকলে যে কেউ মিস করে না—সেটা উপলব্ধি করতে পারা। এককথায় ভার্সিটি লাইফে সব কিছুই আমার সঙ্গে হয়েছে।

শাবিপ্রবিতে চান্স পাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন নিয়ে অনেক ভুল ধারণা এবং খানিকটা মোহ ছিল। অনেক স্বপ্ন ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে ঘিরে। খুব কম স্বপ্নই সত্যি হয়েছে। শুরুর দিকে ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল; কিন্তু যখন বুঝলাম শিক্ষক হওয়া ছাড়া এত হাই সিজিপিএর আসলে তেমন প্রয়োজন নেই, তখন থেকেই ৩.৫০ এর টার্গেট ঠিক করলাম। এখন পর্যন্ত সিজিপিএ ৩.৫০ এর ওপরেই আছে। শুরুর দিকে থিয়েটার করা আরম্ভ করলেও একটা সময় বুঝতে পারলাম সিলেটে থেকে মিডিয়ায় কাজ করাটা এত সহজ নয়। চার বছরে বেশ লেখালেখি করেছি। পত্রিকায়, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে, ব্লগে, ফেসবুকের জনপ্রিয় কয়েকটি পেজে আমার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছে।

ইন্টার্নশিপের জন্য যখন সিভি এডিট করতে যাব, তখন আবিষ্কার করলাম, সিভিতে লেখার মতো উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু আসলে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে করিনি। খুব হতাশ লাগছিল। টানা দুই-তিন দিন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমি কী করেছি সেটা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। তারিখ ধরে ধরে একটা তালিকাও বানালাম। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অনেক কিছুই করেছি। শেষে তো এমন অবস্থা হলো, এক পৃষ্ঠার সিভিতে আমার সব ইনফরমেশন জায়গাই হচ্ছিল না। 

যাই হোক, নতুনদের প্রতি আমার পরমার্শটা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের একেবারে প্রথম বর্ষ থেকেই নিজের সিভি বানানোর কাজটা শুরু করা উচিত। কেন উচিত তার কারণ হলো, একেবারে প্রথম দিকে সিভি বানানোর কাজ শুরু করলে সিভিই বলে দেবে আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে একাডেমিক রেজাল্ট কেমন থাকা চাই, অভিজ্ঞতা কেমন লাগবে, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ কী কী থাকতে হবে, তারপর প্রয়োজনীয় কোন কোন দক্ষতা অর্জন করতে হবে ইত্যাদি।

বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াই সিভি নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করি একেবারে শেষের দিকে এসে। এতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নির্দিষ্ট একটা চাকরি বা কাজের জন্য নিজেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করতে যেসব যোগ্যতা, দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়, সেগুলোর কোনোটিই হয়তো গত চার বছরে করা হয়নি। তত দিনে নতুন করে ভুলগুলো সংশোধনেরও উপায় থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনটা যত বেশি পারা যায় রঙিন করার চেষ্টা করবেন। একটা মানুষের জীবনের সবচেয়ে উত্ফুল্ল সময় কাটে ঠিক এই চার বছরেই। সময়টাকে কাজে লাগান। ভবিষ্যতে যখন চাকরি হয়ে যাবে, তখন কিন্তু একাডেমিক রেজাল্ট নয়, মনে পড়বে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া কিংবা ঘোরাঘুরি করার সুন্দর ওই মুহূর্তগুলোর কথাই। জীবনের একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত এসব মুহূর্তের কথা মনে থাকবে।

মুহিত আহমেদ জামিল

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা