kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

[অন্য বাংলাদেশ]

বাবার ছবি

‘টোকাই’-এর জনক শিল্পী রফিকুন নবীর বাবা রশিদুন নবী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশে চাকরি করলেও তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে শিল্পী। অফিস থেকে ফিরে হারিকেনের আলোয় বসে ছবি আঁকতেন। তাঁর সেসব ছবি নিয়ে ধানমণ্ডির গ্যালারি চিত্রকে চলছে ‘পরম্পরা’ শীর্ষক প্রদর্শনী। সঙ্গে আছে তিন ছেলে—রফিকুন নবী, রেজাউন নবী, তৌহিদুন নবী ও পুত্রবধূ সোহানা শাহ্রীনের শিল্পকর্ম। দেখে এসেছেন মোহাম্মদ আসাদ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাবার ছবি

ম্যাডোনা, শিল্পী : রশিদুন নবী

একজন রশিদুন নবী

জন্ম ১৯১৪ সালে। শৈশব থেকেই তিনি শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। স্কুলে ছবি এঁকে পুরস্কার পেয়ে সেই বাসনা আরো প্রবল হয়। ম্যাট্রিক পাস করেই কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা বাবা বাদ সাধেন। ফলে রশিদুন নবীর আর্ট কলেজে পড়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। স্নাতকে ভর্তি হওয়ার পর বাবা মারা যান। তখন আবার চেষ্টা করেছিলেন আর্ট কলেজে ভর্তির জন্য। মাদ্রাজে গিয়ে দেবী প্রসাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন ভাস্কর্য শিখবেন বলে; কিন্তু পরিবারের একমাত্র ছেলে বলে সে যাত্রায়ও তাঁকে ফিরে আসতে হয়। প্রবেশ করতে হয় কর্মজীবনে। পুলিশের চাকরি। কয়েক বছর কাজ করেছেন পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটিভ ডিপার্টমেন্টে বা সিআইডিতে। তখন থেকে বিকেলে বাসায় ফিরে বসে যেতেন ছবি আঁকতে। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি এঁকেছেন অসাধারণ সব ছবি। গড়েছেন ভাস্কর্য।

 

শিল্পী রশিদুন নবী

বাবা ছিলেন শিক্ষকের মতো

রফিকুন নবী

শৈশবে কেউ জানতই না বাবা ছবি আঁকেন। স্কুলজীবনে আমার কোনো বন্ধু বাবার কাছেই আসার সাহস পেত না—ওরে, বাবা পুলিশ! আমি শৈশব থেকেই ভালো ছবি আঁকতাম। বাবার ইচ্ছাতেই চারুকলায় ভর্তি হয়েছি। ভাই-বোনরা যে যেটা করতে চেয়েছে, পেরেছে। ১৯৫৪ সালে বর্ধমান হাউসে অল পাকিস্তান আর্ট এক্সিবিশন দেখতে নিয়ে যান বাবা। সেটিই আমার জীবনের প্রথম প্রদর্শনী দেখা। তখনো আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হইনি। সে প্রদর্শনী দেখে ছবি আঁকার প্রেমে পড়ি। পরে বাবা বললেন, ‘ঢাকায় আর্ট কলেজ হয়েছে। যাও ভর্তি হও।’ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শফিউদ্দিন আহমেদ স্যারের সঙ্গে বাবার ওঠাবসা ছিল। তাঁদের কলকাতা থেকেই চিনতেন।

বাবার সব ছবি আমাদের সামনেই আঁকা। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে খাটে বসে হারিকেনের আলোয় ছবি আঁকতেন। আমরাও তখন বাসায় ফিরতাম। দেখতাম বাবা ছবি আঁকছেন।

তত দিনে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা দিয়েছি। থাকতাম ওপরের তলায়। তখন বাবা নিচের তলায় বসে বসে ক্যানভাস রাঙাতেন। বাবা বলতেন, দেখ তো, ছবিটা কেমন হলো।

রশিদুন নবীর আঁকা লালবাগ কেল্লা গেট

 

আর্ট কলেজে ভর্তির আগে কিন্তু কোনো দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেননি—ছবি ভালো না মন্দ হচ্ছে। কারণ তখন তো আমি আর্টিস্ট হওয়ার পথে নেই। বাবার ছবি আঁকা নিয়ে মায়ের কোনো ভাবনা-চিন্তা ছিল না। আমরা ১১ ভাই-বোন। এত বড় সংসার। এটা নিয়েই তো তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হতো। রাত-দিন ঘরে কয়েকজন মিলে খালি ছবি আঁকাআঁকি—এ নিয়ে তিনি কখনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। তখন আমার ভাই-বোনদের অনেকেই ছবি আঁকত। দেখে অভ্যস্ত ছিলেন মা। ছবি ভালো লাগলে বলতেন—‘ভালো’, কিন্তু খারাপ হলে কোনো মন্তব্য করতেন না।

বাবা বেশির ভাগ সময় নিজের কল্পনাকে ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন। অনেক সময় ফটোগ্রাফ দেখেও এঁকেছেন। যা কিছু মনে চাইত এঁকে ফেলতেন। এটা একটা প্যাশনের মতো। ছবিগুলো নিয়ে প্রদর্শনী করবেন—এ রকম শুনিনি কখনো। শেষ জীবনেও না; কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে আরো আগে ছবিগুলোর প্রদর্শনী করা উচিত ছিল। বাবা বেঁচে থাকতে দেশে আমার সব প্রদর্শনীতেই হাজির হতেন। ছবির সমালোচনা করতেন। বলতেন, এই ছবিটা আরো ভালো হতে পারত। যেটা ভালো লাগত সেটা ভালো বলতেন। তিনি ছিলেন আমার শিক্ষকের মতো।

আমার জানা মতে, বাবার আঁকা সহস্রাধিক ছবি থাকার কথা; কিন্তু সেগুলোর আর হদিস মিলছে না। কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু ছবি যাদের কাছে আছে তাদের খুঁজে পাইনি। এবার প্রদর্শনীর জন্য শতাধিক ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। ছবিগুলো ছিল আমার ভাই-বোনদের কাছে। ভাস্কর্যও ছিল বেশ কয়েকটি।

রশিদুন নবীর গড়া ভাস্কর্য

প্রদর্শনী

গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দৃশ্য। যেখানে রয়েছে ছোট ছোট ঘরবাড়ি, কিছু মানুষ। তার পরই রয়েছে নদীতে কয়েকটি নৌকার দৃশ্য। পাশেই রয়েছে গাছে পাখি, মায়ের কোলে দুগ্ধজাত শিশুসহ বেশ কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং মানুষের ছবি। প্রদর্শনীর ৭০টি শিল্পকর্মের মধ্যে ৩২টি কাজই রশিদুন নবীর। সেগুলোর মধ্যে পেনসিল, কালি, জলরং ও মিশ্র মাধ্যমে রশিদুন নবী এঁকেছেন নৌকা, যাযাবরের মুখচ্ছবি, খেজুরগাছ, গ্রামের দৃশ্য, ঘোড়া, নদী থেকে জল নিতে আসা নারীর ছবি। সঙ্গে ভাস্কর্য আছে আটটি। রশিদুন নবীর ছবিগুলো আকারে ছোট। কোনোটায় ডিটেইল কাজ, কোনোটা আবার ভেঙেচুড়ে নিজের মতো করে এঁকেছেন। তার মধ্যে ‘ম্যাডোনা’ শিরোনামে কাজটিতে মায়ের যে অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছেন—দেখে মুগ্ধ হতে হয়। ‘লালবাগ কেল্লা গেট’ শিরোনামে ছবিটিতে সে সময়ের চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা। সবার জন্য উন্মুক্ত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা