kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

[ সুপ্রভাত বাংলাদেশ ]

বিনে পয়সায় বই বিলান

গাঁটের পয়সা খরচ করে মানুষকে বই উপহার দেন। এ পর্যন্ত প্রায় হাজারখানেক বই দিয়েছেন। তাঁর পারিবারিক পাঠাগারে ১০ হাজারের বেশি বই আছে। সুনামগঞ্জের প্রদীপ কুমার চৌধুরীর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন শামস শামীম

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিনে পয়সায় বই বিলান

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর ফতেপুর জমিদার পরিবারের সন্তান মহেন্দ্র রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে প্রদীপ কুমার চৌধুরী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বাবা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। কলকাতায় আড়ম্বড়পূর্ণ জীবনের হাতছানি ছেড়ে মহেন্দ্র রায় চৌধুরী নিজ এলাকায় শিক্ষকতা করেছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে অন্যান্য জমিদারের মতো তাঁদের পরিবারেরও দুর্দান্ত প্রতিপত্তি ছিল। বলা হতো ফতেপুরের জমিদারি হাওর থেকে পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রদীপ চৌধুরীর পরিবার এলাকায় একটি হাই স্কুল, দুটি প্রাইমারি স্কুল এবং সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজেও ভূমি দান করেছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জমিদারদের বিপর্যয়ের শুরু হয়। মহেন্দ্র রায় চৌধুরী পাকিস্তান আমলের শুরুতে পারিবারিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতায় পড়ালেখা শেষে তিনি ফিরে আসেন সুনামগঞ্জ শহরে। বিসি স্কুল, সিলেটের রসময় ও এইডেড হাই স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছিলেন। তিনি গণিতের শিক্ষক ছিলেন। ওই সময় কলকাতা-ঢাকা-সিলেট থেকে পছন্দের বই সংগ্রহ করে পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করেন। কলকাতা থেকে বই কিনে হাওরের দুর্গম এলাকার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসতেন। অন্য কিছু না এনে বস্তাভর্তি বই নিয়ে আসতেন দেখে লোকজন হাসাহাসি করত। কিন্তু এতে দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না মহেন্দ্র রায়। ১০ হাজারের বেশি বই ছিল পাঠাগারটিতে। নাম ছিল ‘ফতেপুর চৌধুরী বাড়ি পারিবারিক পাঠাগার’। ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনী পাঠাগারটি ধ্বংস করে ফেলে। পরে প্রদীপ ‘ফতেপুর চৌধুরী বাড়ি মনোমোহন-মনীন্দ্র-মহেন্দ্র-মহেশ স্মৃতি পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন সুনামগঞ্জ শহরে। ওই পাঠাগারটিও ১৯৯২ সালে আগুনে পুড়ে যায়।  পাঠাগারটিতে ৮৩৩টি পুরনো বাংলা ও ২০০টি ইংরেজি ম্যাগাজিন ছিল। ছিল ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে বিভিন্ন লেখকের ৩০টি মূল্যবান অভিধান। নাটকের বই ছিল ৪২৫টি। এ ছাড়া গল্প, উপন্যাস, কবিতা, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনির বই ছিল কয়েক হাজার। সেসব বই নিয়ে কাজ করেছেন ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার প্রখ্যাত নাট্যজনেরা। ২০০৫ সালে পাঠাগারটি পুনর্নির্মাণ করেন প্রদীপ। এখন সেই পাঠাগারে ছয়টি শেলফে বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বই বিতরণে আনন্দ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে এমএ শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। মাস ছয়েক ক্লাসও করেছেন রসায়নে। কিন্তু রসায়নের বাঁধা-ধরা চৌহদ্দিতে মন বসেনি প্রদীপের। ইস্তফা দিয়ে ভর্তি হন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার বিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করেন ১৯৭৯ সালে। প্রদীপের সামনে তখন ভালো ক্যারিয়ার গড়ার হাতছানি; কিন্তু চলে এলেন নিজ শহরে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে লাইব্রেরিয়ান পদে যোগ দেন ১৯৮০ সালে। মনের মতো করে কলেজের লাইব্রেরিও সুসজ্জিত করে তোলেন। লাইব্রেরিয়ান হলেও শুরুতে ক্লাসও নিতেন তিনি। এ কারণে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ‘স্যার’ বলে ডাকত। ২০১১ সালে অবসরে যান। তাঁর বাবার বই সংগ্রহ করার তুমুল নেশা ছিল। পারিবারিক সেই আবহে সেটা পেয়ে বসে প্রদীপকেও। তিনিও ছাত্রজীবন থেকেই বই সংগ্রহ করতেন। অবসরের পর থেকে পারিবারিক পাঠাগারের দেখভাল করতেন। বইপ্রেম তাঁকে এখনো ছাড়েনি। প্রতিদিনই নানা ধরনের বই কিনে পারিবারিক পাঠাগার সমৃদ্ধ করছেন। তখন থেকেই জেলার লেখক-গবেষক ও পড়ুয়াদের নিয়মিত পছন্দের বই উপহার দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত হাজারখানেক বই দিয়েছেন মানুষকে। শুধু গেল বছরই তিনি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, আত্মজীবনী মিলিয়ে দুই শতাধিক বই উপহার দিয়েছেন সুনামগঞ্জের নানা শ্রেণি-পেশার লোকদের। প্রদীপ চৌধুরী বললেন, ‘বই বিতরণ করে নির্মল আনন্দ পাই। এই আনন্দ নিয়েই বাকি জীবন পার করতে চাই। আমার কাছে বই মহামূল্যবান। সবাই তো বইয়ের কদর বোঝে না, তাই গণহারে সবাইকে বই দিই না। শুধু সেলফে সাজিয়ে রাখা নয়, বই পড়ে যেন জীবনবোধ তৈরি হয় মানুষের, তাই সে রকম মানুষদেরই বই দিয়ে থাকি।’

প্রদীপ চৌধুরীর সংগ্রহে আছে এমন অনেক দুর্লভ জিনিস

গ্রহীতারা যা বললেন

প্রদীপ চৌধুরী যাঁদের বই দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই এই অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত লেখক-গবেষক ও বিদগ্ধজন। এ বছর বই উপহার দিয়েছেন লেখক সুখেন্দু সেন, কবি ও গবেষক ইকবাল কাগজী, মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, গবেষক কল্লোল তালুকদার চপল, কবি রুহুল তুহিন, কবি মানবেন্দ্র কর পাপ্পু, অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার দাস রায়, প্রফেসর দীলিপ কুমার দে, প্রফেসর কল্পনা তালুকদার, প্রফেসর পরিমল দে, কবি কুমার সৌরভ, প্রাবন্ধিক এনামুল কবীর, সাংবাদিক খলিল রহমান, আকরাম উদ্দিনসহ এই জেলার গুণীজনদের। সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রদীপ চৌধুরী আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। মানুষটি সারা জীবন বইয়ের সঙ্গেই কাটিয়ে দিয়েছেন।’ সুনামগঞ্জ শহরের বই ব্যবসায়ী মানবেন্দ্র কর পাপ্পু বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান থেকে গত বছর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকার বই উপহার দিতে কিনেছেন তিনি। তাঁর পারিবারিক পাঠাগারের জন্যও পছন্দের বই এনে দিয়েছি আমি।’ লেখক-গবেষক কল্লোল তালুকদার চপল বলেন, তিনি ভালোবাসেন বই উপহার দিতে। এমন ভালো মানুষ সমাজে বিরল।

প্রদীপ চৌধুরীর সহধর্মিণী অপর্ণা সরকার বলেন, ‘শুরু থেকেই এই মানুষটি বইপ্রীতির সঙ্গে পরিচিত। মানুষকে বই উপহার দিয়ে আনন্দ পান তিনি। প্রথম দিকে মানা করতাম। শুনত না। পারিবারিক নানা সমস্যা হলেও তাঁর এই আনন্দ আমরা মেনে নিয়েছি।’

 

তাঁর আরো সংগ্রহ

জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে নানা ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্র ছিল তাঁর। সেই মূল্যবান বস্তুসহ অনেক কিছুই ১৯৭১ সালে তস্কররা হরণ করেছে। তার পরও যতটুকু ছিল সেই শৌখিন ধাতব পুরনো পিতল-কাঁসার বস্তুগুলো সংগ্রহ করে বাসার শেলফে সাজিয়ে রেখেছেন। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে পুরনো পিতলের দুর্লভ ও মূল্যবান শতাধিক উপকরণ। কিছু দুর্লভ জিনিস দান করে দিয়েছেন সুনামগঞ্জ জাদুঘরে। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে রয়েছে পুরনো পিতল-কাঁসার থালা, বাটি, বাসন, কলসি, সুরাদানি, কলমদানি, পানদানি, ঘট, ফুলদানি, ছোট মূর্তি, বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি, গ্লাস, মগ, হুঁকা প্রভৃতি।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা