kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

[মহাপৃথিবী]

হাত-পা ছাড়াই!

আর দশজন ১১ বছরের কিশোরের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন তিয়ো সাত্রিওর জগত্। একা একা সে বিছানা থেকেও নামতে পারে না। তাই বলে জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকতে চায় না সে। এক এক করে জয় করছে সব প্রতিবন্ধকতা। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাত-পা ছাড়াই!

ওয়াওয়ান সাত্রিও ও মিমি সাত্রিও দম্পতির বাস ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভা দ্বীপের চাওমিস শহরে। তাঁদের পাঁচ সন্তান। যে রাতে পঞ্চম সন্তানের জন্ম হয়, মিমিকে জানানো হয়েছিল আরো একটি সুস্থ-স্বাভাবিক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন তিনি; কিন্তু পরদিন ছেলেকে দেখে হতভম্ব হয়ে যান মিমি। ছেলেটির একটিও হাত-পা নেই!

প্রথমটায় ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলেন মিমি। তবে পরে মেনে নেন ভাগ্যকে। ছেলেটির নাম রাখা হয় তিয়ো। স্বামীর সঙ্গে মিলে শুরু করেন সন্তানকে নিয়ে লড়াই। অন্য চার সন্তানের তুলনায় তিয়োর দেখাশোনা করাটা অনেক বেশি কঠিন ছিল। কারণ ছোটবেলায় তিয়ো পুরোপুরি মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের ছাড়া বলতে গেলে কিছুই করতে পারত না। হাত-পা ছাড়া কোনো কিছু করার সুযোগ তো আসলে বেশি থাকে না।

মায়ের সঙ্গে তিয়ো

এখন তিয়োর বয়স ১১ বছর। অনেক দিন ধরেই ওয়াওয়ান-মিমির বাকি চার সন্তানের কেউই তাঁদের সঙ্গে থাকে না। বলা ভালো থাকতে পারে না। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে তাদের থাকতে হয় ইন্দোনেশিয়ার নানা প্রান্তে। সংসার বলতে তাই মা-বাবা আর তিয়ো—এই তিনজনই। এসব কারণে মা-বাবা এত দিন অন্য কোনো কাজও করতে পারতেন না। ২৪ ঘণ্টাই তাদের তিয়োর দেখাশোনা করতে হতো। তা নিয়ে অবশ্য খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিল না। কারণ গত বছর পর্যন্ত তারা এ জন্য সরকারি ভাতা পেতেন।

বছরখানেক হলো সেই ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না তাদের। কারণ এর মধ্যেই অনেক কিছু শিখে ফেলেছে তিয়ো। এখন অনেক কাজই করতে পারে একা একা; এমনকি শুরু করে দিয়েছে স্কুলে যাওয়া! এতে এখন দিনে অন্তত ছয় ঘণ্টা কাজ করার ফুরসত মিলছে ওয়াওয়ান-মিমির। স্কুল শুরুর সময় দুজনে মিলে মোটরসাইকেলে করে ওকে দিয়ে আসেন স্কুলে। বাবা চালান। মাঝে তিয়োকে রেখে পিছে বসেন মা। ওকে ধরে রাখেন শক্ত করে। স্কুল শেষে আবার দুজনে মিলে নিয়ে আসেন। মাঝের সময়টুকু তিয়োর দেখাশোনা করেন স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীরা। ফলে সে সময়ে কমবেশি কাজ করতে পারেন ওয়াওয়ান-মিমি দুজনেই।

এখন মুখে কলম ধরে লিখতে পারে তিয়ো

তাঁদের বাড়ির কাছেই আছে প্রতিবন্ধী শিশুদের একটি স্কুল। নাম এসএলবি ফিরদাউস। মোট শিক্ষার্থী মাত্র ২৪ জন। সেখানেই পড়ছে তিয়ো। অবশ্য প্রথম দফায় কিছুদিন ক্লাস করেই ছেড়ে দিয়েছিল স্কুল! ‘এমনিতেই ওর শারীরিক সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি। তার ওপর নিজের ওপর প্রয়োজনীয় বিশ্বাসটাও ছিল না তিয়োর। তাই বন্ধ করে দিয়েছিল স্কুলে আসা,’ বলেন স্কুলটির প্রিন্সিপাল বুদিয়াতি।

কিন্তু সেসব পুরনো কথা। এখন ও স্কুলের নিয়মিত ছাত্র। পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। লেখে মুখে কলম ধরে। চলাফেরা-নড়াচড়া করার জন্য তাকে সাহায্য করেন শিক্ষক ও সহপাঠীরা। সবার সঙ্গে মেতে থাকে খুনসুটিতে। পড়াশোনায়ও করছে ভালো, বিশেষ করে গণিত ও ধর্মে। বুদিয়াতির কথা অনুযায়ী ওকে গণিতের ওস্তাদই বলতে হয়, ‘তিয়োর আইকিউ খুবই ভালো, বিশেষ করে গণিতে ও খুবই দক্ষ। এখন ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। অথচ এর মধ্যেই চতুর্থ শ্রেণির গুণ-ভাগও শিখে ফেলেছে।’

আরো একটা কাজে খুবই ভালো তিয়ো—প্লেস্টেশনে গেমস খেলায়। শুধু ভালো বললে আসলে কমই বলা হয়। কারণ চার হাত-পা নিয়েও অন্যরা তিয়োর সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে হিমশিম খায়। প্লেস্টেশনের গেম কনসোলে অনেক বাটন থাকে। ব্যবহার করতে হয় দুই হাত দিয়ে। অথচ সেটা তিয়ো সামলে নেয় স্রেফ থুঁতনি আর কাঁধের হাড় ব্যবহার করেই! তাই দিয়েই টেক্কা দেয় অন্য সবাইকে। এককথায় ওকে বলতে হয় প্লেস্টেশনের পোকা। ‘সকালে গোসল সেরেই খেলতে শুরু করে তিয়ো। মাঝে শুধু স্কুলের সময়টা বাদ পড়ে। ফিরে আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়ে খেলায়,’ বলেন মিমি।

এভাবেই এক এক করে সব প্রতিবন্ধকতা জয় করছে তিয়ো। একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন পূরণের পথে। না, খুব বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখে না সে। শুধু চায় আর দশজনের মতো করে জীবনটাকে উপভোগ করতে। যে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন ওর মা-বাবা। যে স্বপ্ন পূরণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ওর স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠীরা। হাত-পা ছাড়াই আর দশজন হাত-পাওয়ালা মানুষের মতো করে বাঁচার ছোট্ট সুন্দর স্বপ্ন।

সূত্র : মিরর, ডেইল মেইল

দ্য সান, বারক্রফট টিভি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা