kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

ভবঘুরে দম্পতি

তাঁরা ঘুরে বেড়ান দেশে দেশে। বেড়ানোর ভিডিও ইউটিউবের মাধ্যমে তুলে ধরেন ভ্রমণপিপাসুদের সামনে। ইউটিউব চ্যানেলের পাশাপাশি একটি ট্রাভেলসাইটও আছে তাঁদের। চট্টগ্রামের জিয়াউল হক ও মেলিসা মিথিলা মারমা দম্পতির সঙ্গে গল্প করে এসেছেন প্রবীর বড়ুয়া

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




ভবঘুরে দম্পতি

সিঙ্গাপুর বেড়াতে  গেলে পাশের দেশ মালয়েশিয়ায় বেড়ানোর কথা অনেকেরই মাথায় থাকে; কিন্তু সেই সঙ্গে যে ইন্দোনেশিয়াও ঘুরে আসা যায় তা অনেকের মতো আমারও জানা ছিল না। জিয়াউল ও মেলিসার  ইউটিউব ব্লগ বিডি ট্রাভেলার্সের  মাধ্যমে প্রথম জেনেছিলাম, সিঙ্গাপুর থেকে মাত্র তিন হাজার টাকায় ঘুরে আসা যায় ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপরাজ্য বাটাম থেকে। সেদিনই মূলত এই ত্রিদেশীয় ভ্রমণ পরিকল্পনাটা করি। এভাবে এক দেশে এসে পাশের আরো কয়েকটি দেশ একসঙ্গে ঘুরলে খরচ কম পড়ে। সময়ও বাঁচে। অনেকেই তথ্যগুলো জানেন না বলে বেড়াতে গিয়ে অনেক কিছুই মিস করেন।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে

তাঁরা ঘোরে দেশে দেশে

বিডি ট্রাভেলার্স চ্যানেলের ব্লগার জিয়াউল হক ও   মেলিসা মিথিলা মারমার ঘোরাঘুরির নেশা অনেক দিনের। বাংলাদেশ-ভারত তো বটেই—এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার পথে-প্রান্তরে পদচিহ্ন রেখে চলেছেন এই দম্পতি। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে ইউটিউবের মাধ্যমে সেগুলো তুলে ধরেন ভ্রমণপিপাসুদের সামনে। বিয়ের পর থেকে তাঁরা শুধু দুজনেই ঘুরে বেড়াতেন। বছর দুয়েক ধরে তাঁদের ভ্রমণসঙ্গী দুই বছর বয়সী কন্যা মেলিনাও। ইউটিউব চ্যানেলের পাশাপাশি একটি ট্রাভেল সাইটও আছে তাঁদের। সেখানে নিয়মিত পোস্ট করা হয় ভ্রমণবিষয়ক খবর, ভ্রমণকাহিনি ও ফিচার। অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তাঁদের ইউটিউব চ্যানেল। bd travellers-এ সাবস্ক্রাইবার প্রায় আড়াই লাখ। চ্যানেলটিতে ট্রাভেল ভিডিও রয়েছে ৭৪টি। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিওটি হচ্ছে ‘সোনারগাঁও হোটেলে একটি রাত’। মাত্র ১৩ মাস আগে পোস্ট করা ভিডিওটি দেখা হয়েছে ২২ লাখ বার। এরপর ‘চলুন আমেরিকা যাই’ ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১৮ লাখ বার। এ ছাড়া এই চ্যানেলের অন্য বেশির ভাগ ভিডিওর ভিউ লাখের কোটা পার হয়েছে।

ইউটিউবের সিলভার বাটন হাতে

ইউটিউব খরচ জোগাচ্ছে?

একসময় তাঁরা শুধু ঘুরতেই যেতেন। বিভিন্ন দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এসব উপভোগ করার পাশাপাশি চেখে দেখতেন স্ট্রিট ফুডও। নিজেদের ভ্রমণকে স্মৃতিময় করে রাখতে তুলতেন অসংখ্য ছবি। একসময় মনে হলো, নিজেরা যেসব জায়গা দেখেছেন সেগুলো মানুষকেও দেখাবেন। ঠিকঠাক তথ্যের অভাবে অনেকে ঘুরতে গেলেও অনেক কিছু মিস করে চলে আসেন—সেসব তুলে ধরবেন। আর এসবের জন্য ইউটিউব হলো সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। জিয়াউল বলেন, ‘এখন ভিজ্যুয়ালাইজেশনের যুগ। আজকাল মানুষ নানা রকম তথ্য পড়ে জানার চেয়ে দেখে জানতে পছন্দ করেন বেশি। সে জন্য বিশ্বজুড়ে ইউটিউবের এত জয়জয়কার। ঠিক দুই বছর আগে নিতান্ত শখের বশেই শুরু করেছিলাম ইউটিউবিং। যেটা এখন শখের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের কাছে।’ ইউটিউব তো তাহলে এখন আপনাদের ভ্রমণ খরচও জোগাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাব হাসিমুখেই দিলেন জিয়াউল—‘বাউন্ডেলেপনা করে জীবনে যা খরচ করেছি, ইউটিউব সেটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কখনো ভাবিনি—শখের বশে আপলোড করা ভিডিওগুলো দিন দিন এতটা পথ এগিয়ে আনবে আমাদের।’

জুরং বার্ডপার্ক, সিঙ্গাপুর

এখন তাঁরা তিনজন

দেশে এখন অনেক ট্রাভেল ব্লগার আছেন। তাঁদের বেশির ভাগই সলো ট্রাভেলার। সেই হিসাবে জিয়া-মিথিলা দম্পতিই একমাত্র বাংলাদেশি ফ্যামিলি ট্রাভেল ব্লগার, যাঁরা ব্লগ করেন বাংলায়। সম্প্রতি তাঁরা ইউটিউবের পক্ষ থেকে ক্রিয়েটর্স অ্যাওয়ার্ড হিসেবে সিলভার প্লে বাটন পেয়েছেন। জিয়াউল বললেন, ‘আমরা দুজনেই বাউন্ডুলে, বোহেমিয়ান! একসময় সলো ট্রাভেলার ছিলাম। বিয়ের পরদিন থেকে ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে যোগ দিল মিথিলা। আমাদের দলে দুই বছর আগে যোগ দিল মেলিনা হক (কন্যা)।’

তিনি বলেন, ‘আমার বিদেশভ্রমণ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ভারত গিয়েছিলাম সেবার। তারপর সেখানে অসংখ্যবার যাওয়া-আসা। ২০০৪ সালে ভ্রমণ শুরু হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। প্রথমে থাইল্যান্ড, তারপর মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ দেখতে শুরু করলাম বিভিন্ন দেশ। এই তালিকায় আছে মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, হংকং, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র। বেশ কিছু দেশে একাধিকবার গিয়েছি। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত শতাধিকবার বিদেশভ্রমণ করেছি আমরা।’

 

এত টাকা কোথায় পান?

‘আমাদের অনেক ফলোয়ার ও ভিউয়ার প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এত টাকা-পয়সা কোথায় পাই? এ রকম প্রশ্ন আসলে বিব্রতকর। আসলে প্রতি মাসে বেতনের পাশাপাশি ইউটিউব থেকে ভালো একটা অ্যামাউন্ট পাই। তা ছাড়া পৈতৃক জমিজমা থেকেও আসে আরো কিছু। সব মিলিয়ে মাস শেষে বেড়ানোর টাকা হয়ে যায়। আমরা তো প্রতি মাসেই বেড়াতে যাই না। যাই দুই থেকে তিন মাস পর পর।’ বলছিলেন জিয়াউল হক।

কোনো দেশে যাওয়ার আগে তাঁরা নেট ঘেঁটে জেনে নেন কোথায় কোন লাক্সারি হোটেল বা এয়ারলাইনসে প্রমোশন চলছে। তারপর বুকিং দিয়ে দেন পছন্দ অনুযায়ী। জিয়াউল হক বললেন, ‘এভাবেই সাধারণ হোটেলের দামে আমরা ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপের হোটেল র্যাডিসন, দুবাই র্যাডিসন, শারজাহ শেরাটন, দুবাই সুইসটেলের মতো পাঁচতারকা হোটেলে থেকেছি। কখনো কখনো অবশ্য ছোট্ট মেলিনার সুবিধার জন্য দামি হোটেলে থাকতে হয়েছে।’ গত ছয় বছরে তিনবার প্লেনের বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করেছেন তাঁরা—একবার ঢাকা থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসে দুবাই যাওয়ার সময়, অন্য দুবার থাই এয়ারওয়েজে কলকাতা থেকে ব্যাংকক এবং ব্যাংকক থেকে ঢাকা আসার সময়। ঢাকা থেকে দুবাই ভ্রমণ ছিল ব্যয়বহুল। কারণ তাঁরা ফ্লাইটে উঠে কৌতূহলবশত ইনস্ট্যান্ট টিকিট আপগ্রেড করেছিলেন। সেটা ছাড়া থাই এয়ারওয়েজে বিজনেস ক্লাসে চড়তে পেরেছিলেন প্রায় ইকোনমি ক্লাসের ভাড়ায়। মিথিলা বললেন, ‘একবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক বেড়াতে গিয়ে একসঙ্গে ঘুরে এসেছিলাম লাওস ও কম্বোডিয়া। ব্যাংককে যাওয়ার সময় এই দুই দেশে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ব্যাংকক থেকে কম্বোডিয়ার ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় গিয়েছিলাম কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে। ভিসা পেতে সময় লেগেছিল মাত্র এক ঘণ্টা। খরচ পড়েছিল এক হাজার ২০০ থাই বাথ। নমপেনে চার দিন বেড়িয়ে সেখান থেকে আবার দুই ঘণ্টার মধ্যে ভিসা নিয়ে চলে গেলাম লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে। লাওসের ভিসা খরচ পড়েছিল বাংলাদেশি চার হাজার ৫০০ টাকার মতো। মেলিনার জন্মের আগে পর্যন্ত আমরা আসলে এভাবেই বেড়াতাম, কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই।’

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের কর্মীদের সঙ্গে

এখন কন্যার মর্জিমতো চলতে হয়

মেলিনার জন্মের আগে খেয়ালখুশি মতো ঘোরাঘুরি করা গেলেও এখন কন্যার মেজাজ-মর্জির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে বলে জানালেন মিথিলা। বললেন, ‘আগে স্বাচ্ছন্দ্যে মুভ করা যেত। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাচ্চার মেজাজ-মর্জি বা তার রেগুলার শিডিউল মতো চলতে হয়। দেখা গেল, আপনি খুব ভোরে কোনো ট্যুরিস্ট স্পটে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন, কিন্তু বাচ্চা তখনো ঘুমাচ্ছে। সে অবস্থায় তাকে তৈরি করে বাইরে নিয়ে যেতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। তা ছাড়া বাচ্চা সঙ্গে থাকলে একদিনে দু-একটির বেশি স্পটে বেড়ানোও যায় না। তাই যে দেশে পাঁচ দিনে ট্যুর শেষ হওয়ার কথা, সেখানে হয়তো সাত দিনেও কিছু দেখা হয়ে ওঠে না অনেক সময়। তা ছাড়া এসব কারণে গ্রুপ ট্যুরেও যাওয়া যায় না। ট্যুর প্ল্যান সাজাতে হয় নিজেদের মতো করে। এসব কারণে খরচও বেড়ে যায়।’

 

দুজনেই সংবাদকর্মী

কর্মজীবনে তাঁরা দুজনই সংবাদকর্মী। কাজ করেন চট্টগ্রামের একটি জনপ্রিয় দৈনিকে। চাকরি করে বেড়ানোর জন্য এত সময় কিভাবে বের করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জিয়াউল বলেন, ‘আসলে আমরা বছরে চার থেকে পাঁচবার বিদেশভ্রমণ করি। যে কয় দিন অফিসের বাইরে থাকি দেশে এসে সাপ্তাহিক ছুটি না কাটিয়ে সেগুলো পুষিয়ে দিই। তার মানে দেশে থাকাকালে একদিনের জন্যও আমরা অফিস মিস করি না।’

 

এবার যাবেন উজবেকিস্তান

এই দম্পতির  পরবর্তী  ট্রাভেল ডেস্টিনেশন সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও উজবেকিস্তান। এবারের ভ্রমণের পর আরো নতুন নতুন ভিডিও পোস্ট করবেন বলে জানালেন জিয়াউল হক ও মিথিলা। তাঁদের ট্রাভেল ব্লগ দেখে যাঁরা ভ্রমণে যাবেন তাঁরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি যাঁরা যেতে পারবেন না তাঁরাও ঘরে বসে করতে পারেন মানসভ্রমণ। আগামী এপ্রিলে ভ্রমণ নিয়ে একটি মাসিক ট্যাবলয়েড করার পরিকল্পনা আছে তাঁদের। বিডি ট্রাভেলার্স নামে এই ট্যাবলয়েডটি প্রকাশিত হবে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায়ই।                                   

     ছবি : সংগ্রহ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা