kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

[হয়ে ওঠার গান]

কুঁড়েঘরে শরিফুল আলো

বৈচিত্র্যময় বোলিং, আগ্রাসী মনোভাব আর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্রেক থ্রু এনে দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে তাক লাগিয়েছেন বাঁ হাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। পঞ্চগড়ের এই তরুণের শুরুটা কিন্তু মোটেও সুখকর ছিল না। লিখেছেন লুত্ফর রহমান

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কুঁড়েঘরে শরিফুল আলো

ধপঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডপাল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম নগরডাঙ্গা। এলাকার দুলাল মিয়ার দ্বিতীয় ছেলে শরিফুল ইসলাম। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাত। ভাগ্য বদলের আশায় ২০০১ সালে ছোট্ট শরিফুলকে নিয়ে সাভারে জিরানি এলাকায় চলে যান দুলাল। সেখানে তিনি ভ্যান চালাতেন আর গার্মেন্টে কাজ করতেন স্ত্রী। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শরিফুল সাভারে লেখাপড়া করেন। তারপর আবার গ্রামে ফিরে আসেন। শরিফুলকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয় কালীগঞ্জ সুকাতু প্রধান উচ্চ বিদ্যালয়ে।

ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। গ্রামে এসে বর্গাচাষ শুরু করেন। মাঝে মাঝে ভ্যানও চালাতেন। সংসারে অভাব লেগেই থাকত। বাবাকে কাজে সহযোগিতা করতেন শরিফুল।

বাবা-মা ও বোনদের সঙ্গে শরিফুল

ছোটবেলা থেকেই শরিফুলের ক্রিকেটের প্রতি নেশা। বিকেলবেলা শরিফুলকে আটকানোর উপায় নেই। মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যেতেন মাঠে। কখনো স্কুলে যাওয়ার পথে মৌমারী বাজারে দোকানে বই রেখে চলে যেতেন খেলতে। এর জন্য তাঁকে মায়ের বকুনি আর বাবার পিটুনিও কম খেতে হয়নি। তবু খেলা ছাড়েনি। বৈচিত্র্যময় বোলিংয়ের কারণে কৈশোরেই স্থানীয় বিভিন্ন দলে ডাক পড়ত ছয় ফুট লম্বা শরিফুলের। শুধু ক্রিকেট নয়, ভলিবলও খেলতেন।

মজার বিষয় হচ্ছে, ক্রিকেটার হিসেবে নয়, ২০১৫ সালে বিকেএসপিতে ডাক পেয়েছিলেন ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে। তবে সেখানে না গিয়ে ক্রিকেট খেলায়ই মনোযোগ দেন শরিফুল। তাঁর মামা জাহাঙ্গীর হোসেন তাঁকে ক্রিকেট খেলায় তালিম ও উত্সাহ দিতেন। শরিফুলের মা বলেন, ‘‘ক্রিকেট খেলার প্রতি ওর নেশা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, মাঝ রাতে ঘুমের মধ্যে ‘আউট আউট’ বলে চিত্কার করে উঠত।’’ এ অবস্থায় শরিফুলের মামা মাহমুদ আল আয়ান তাঁকে ভালো ক্লাবে অনুশীলনের পরামর্শ দেন। কিন্তু দুমুঠো খাবার জোগাড়ই যেখানে দায়, সেখানে ক্লাবের টাকা দেবেন কী করে। ফলে পরিবারের কেউ রাজি ছিলেন না। একপর্যায়ে শরিফুলকে খেলোয়াড় বানানোর জন্য বড় ভাই আশরাফুল ইসলাম অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনায় ইতি টানেন। কাজ নেন ঢাকার একটি গার্মেন্টে।

২০১৬ সাল। দিনাজপুরে ক্লেমন ক্রিকেট স্কিল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ভর্তি হন শরিফুল। ভর্তির তিন দিনের মাথায় খেলোয়াড় বাছাইয়ে আসেন রাজশাহী ক্লেমন একাডেমির প্রশিক্ষকরা; কিন্তু নতুন ভর্তি হওয়া শরিফুলকে বাছাইয়ে অংশ নিতে সম্মতি দিচ্ছিলেন না দিনাজপুরের প্রশিক্ষকরা। অনেক অনুরোধের পর তাঁকে বাছাইয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। খেলোয়াড় বাছাই করছিলেন ক্লেমনের প্রশিক্ষক ও জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় আলমগীর কবির, ধীমান ঘোষ ও হান্নান সরকার। একটি বল করার পরই শরিফুলকে মনে ধরে নির্বাচকদের। বাঁ হাতি এই পেসারকে সিলেক্ট করেন তাঁরা। তারপর তাঁকে নিয়ে যান ক্লেমন একাডেমি রাজশাহীতে। প্রশিক্ষক আলমগীর কবির শরিফুলের খরচ বহন করার দায়িত্ব নেন। নিজের কিট দিয়ে দেন তাঁকে। তাঁর তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে অনুশীলন। কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমে ২০১৭ সালে থার্ড ডিভিশনে খেলার সুযোগ পান শরিফুল। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। অধ্যবসায় আর কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে ডিপিএল, বিপিএল, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ ও বাংলাদেশ ‘এ’ দলে খেলার সুযোগ পান শরিফুল। সদ্যঃসমাপ্ত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে তো দলকে এনে দেন একের পর এক সাফল্য। পঞ্চগড়ের এই বাঁ হাতি পেসার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে একটি মেডেনসহ ৩১ রান খরচায় দুটি উইকেট নিয়েছেন। জাগিয়েছিলেন হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও। এ ছাড়া দুটি ক্যাচ নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। সরাসরি থ্রোতে একটি রানআউটও করেছেন। এই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই বাঁ হাতের নৈপুণ্য দেখিয়েছেন শরিফুল।

খেলায় ভালো করার পাশাপাশি পরিবারেও সচ্ছলতা আসতে থাকে। নিজের টাকায় পাঁচ কক্ষের একটি টিনশেড বিল্ডিং করেছেন। এখনো কাজ শেষ হয়নি। এ ছাড়া বড় ভাই আশরাফুল ইসলামকে গার্মেন্ট থেকে এনে বাড়িতে গরুর খামার করে দিয়েছেন।

শরিফুল ২০১৬ সালে দেবীগঞ্জের কালীগঞ্জ সুকাতু প্রধান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। এবার কালীগঞ্জ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবেন। খেলায় ব্যস্ততার কারণে গত বছর পরীক্ষা দিতে পারেননি। তাঁর ছোট বোন দুলালী আক্তার দেবীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে এবং শম্পা আক্তার কালীগঞ্জ এমপি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে।

শরিফুল ইসলামের বাড়িতে এখন উত্সবের আমেজ। শুধু ক্রিকেটভক্তই নয়, প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও শরিফুলের মা-বাবাকে শুভেচ্ছা জানাতে মিষ্টি ও ফুল নিয়ে ছুটে আসছেন। ছেলের এমন বিজয়ে আনন্দে অশ্রুসিক্ত শরিফুলের মা-বাবা।  আনন্দের এত বড় উপলক্ষ আর আসেনি তাঁদের জীবনে। শরিফুলের ভাই আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটের আমি চরম ভক্ত। আমি এই দিনটির জন্যই গার্মেন্টে কাজ করে ওকে খেলোয়াড় বানিয়েছি।’ শরিফুলের মা বুলবুলি খাতুন বলেন, ‘আমার জীবনে এমন আনন্দ আর আসেনি। কুঁড়েঘর  আলোকিত করেছে ছেলে। মা হিসেবে আমি গর্বিত।’

শরিফুলের বাবা দুলাল মিয়া বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ওর খেলার প্রতি খুব ঝোঁক। মারধর করেছি; কিন্তু লাভ হয়নি। তার পরও খেলতে গেছে। আমার সামর্থ্য ছিল না শরিফুলকে ভালো ক্লাবে ভর্তি করতে। খেয়ে-না খেয়ে কষ্ট করে খেলা অনুশীলন করেছে।’ শরিফুলের মামা মাহমুদ আল আয়ান বলেন, ‘ভারতের বিপক্ষে মুস্তাফিজের উইকেট শিকার দেখে আমার শরিফুলের কথা মনে পড়েছিল। ভাবলাম শরিফুল যেহেতু ভালো খেলে, সুযোগ পেলে সে-ও মুস্তাফিজের মতো হয়ে উঠবে। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে ওর বাবা-মাকেও রাজি করাই। আজ আমি কতটা তৃপ্ত, বলে বোঝাতে পারব না।’ দেশে ফিরে শরিফুল বললেন, ‘‘ফাইনালে জিতে আমরা যে আনন্দ পেয়েছি দেশের মাটিতে মানুষের উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসায় সেটি দ্বিগুণ হয়েছে। বিমান থেকে নামার পর মানুষ যেভাবে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল তাতে দায়িত্বটা আরো বেড়ে গেল। দোয়া করবেন যেন দেশের হয়ে এমন জয় আরো এনে দিতে পারি।’’

ছবি : লেখক ও সংগ্রহ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা