kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

মনোভূমি

যেভাবে ‘বইচোর’ হলাম

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিশোর বয়স থেকেই আমার একটা বদ-অভ্যাস ছিল—বই চুরি করা। বই চুরির কলাকৌশল বেশ নিখুঁতভাবেই রপ্ত করেছিলাম। তাই বলে সব সময়ই যে পার পেয়ে যেতাম, তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে হাতেনাতে ধরাও পড়েছি। অপমানিতও হয়েছি। তবু অভ্যাসটা তখন বদলাতে পারিনি। লাজ-লজ্জা ভুলে আবার বই চুরি করেছি। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত লোকের জীবনে বই চুরির অভিজ্ঞতা আছে। তাই ভাবতাম, বই চুরি করলে এটাতে কোনো দোষের কিছু নেই। যিনিই আমাকে এই ব্যাপারে তিরস্কার করতেন, তাঁর বই চুরি করে অপমানের শোধ নিতাম। অবশ্য বই চুরির পেছনে আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত রম্য লেখক মার্ক টোয়েন। তিনিও ছিলেন বই চুরিতে একজন সিদ্ধ পুরুষ। যা হোক, আমার জীবনে বই চুরির অভিজ্ঞতা থেকে কিছু মজার ঘটনা বলছি।

 

এক.

তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে দেখি, ওদের পড়ার টেবিলের এক কোণে যত্ন করে রাখা আছে হুমায়ূন আহমেদের ‘এলেবেলে’। রুম থেকে বের হওয়ার সময় যত্ন করে বইটি আমার জাম্বুু টাইপের জ্যাকেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিই। তারপর ড্রয়িংরুমে আধাঘণ্টা আড্ডা দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসি। সেদিন রাতেই ওই বন্ধুর বড় ভাই আমাদের বাসায় এসে হাজির। বইয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই আমি যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম। আমার অভিনয়ে তিনিও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তবু তিনি নাছোড়বান্দা হয়ে আমাকে বইটি ফেরত দিতে চাপ দিচ্ছেন। একপর্যায়ে তিনি কসম কেটে বললেন, ‘যদি তুমি ওই বইটা ফেরত দাও, আমি তোমাকে এখনই তিন গোয়েন্দা সিরিজের দুটি বই এনে দেব।’ শেষ পর্যন্ত তিন গোয়েন্দা সিরিজের দুটি বই পাওয়ার লোভে ওই বইটা ফেরত দিলাম। তবে ফেরত দেওয়ার আগে ভালোমতো চেক করে দেখি ওই বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভাইয়ার একটা প্রেমপত্র। ভাগ্যিস, তখন প্রেমপত্রটা রেখে দিয়েছিলাম। তাই অনাগত বিপদ থেকে প্রেমপত্রটা রক্ষাকবচের কাজ করেছিল।

 

দুই.

এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে আম্মুকে নিয়ে নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলাম। তখন বেশ কিছু গল্পের বই ব্যাগে ভরে নিয়ে গিয়েছিলাম। আশপাশের যাঁরাই আসতেন, আমার বইগুলো ধার চাইতেন। আমিও হাসিমুখে দিয়ে দিতাম। তবে হ্যাঁ, তাঁদের কাছ থেকেও নতুন কোনো বই পড়ার জন্য ধার নিয়ে আসতাম। এভাবে পাঁচ-ছয়জনের কাছ থেকে ১০-১২টি বই সংগ্রহ করে নিলাম। নানাবাড়ি থেকে ফিরে আসার আগের দিন আমার সব বই ফেরত নিয়ে এলাম। আমি ফেরত দেওয়ার সময় বলি, বইয়ের শেষাংশের কিছু বাকি আছে। আজকে রাতের মধ্যে বইটা পড়ে শেষ করে টেবিলের ওপর রেখে যাব। পরের দিন সকালে সব বই বেঁধে চম্পট দিই। এতগুলো বই দেখে আম্মু জানতে চাইলেন, বইগুলো কোথায় পেলে? বললাম, এগুলো উপহার পেয়েছিলাম। তারপর টানা দুই বছর নানাবাড়িতে যাইনি।

 

তিন.

কলেজে ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতাম। এখনকার সময়ে পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট কিংবা মেডেল দেওয়া হলেও আমাদের সময়ে দেওয়া হতো মহামূল্যবান বই। একবার বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে পেলাম তিনটি বই; আর যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে, সে পেল একটি বই। মজার ব্যাপার হলো, তৃতীয় স্থান অধিকারীর বইটি আমার ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়। সেটি ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পঞ্চতন্ত্র’। বিভিন্নভাবে তাকে বুঝালাম ওই বইটি আমাকে দিয়ে দিতে, বিনিময়ে তাকে দেব দুটি বই। এতেও সে রাজি না, কারণ এটাই তার জীবনে প্রথম পুরস্কার। এই বইয়ের ভেতরে তার নামসহ পুরস্কার প্রাপ্তির বিবরণ লেখা আছে। তাই বইটি স্মৃতি হিসেবে রেখে দেবে, কোনোভাবেই হাতছাড়া করবে না। উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত বইটা চুরি করতে বাধ্য হলাম। বই চুরি হওয়ায় সে ভীষণ কষ্ট পেল। নীরবে চোখের পানি ফেলল। তার অবস্থা দেখে আমিও বেশ কষ্ট পাচ্ছিলাম। তাই তার চোখের পানি মুছে দিয়ে আমার একটি বই তার হাতে তুলে দিই। ওই বইটা চুরি করে দীর্ঘদিন আমি অনুশোচনায় ভুগেছি।

 

চার.

চোরের ১০ দিন তো গৃহস্থের এক দিন। প্রবাদের বাণী আমার ক্ষেত্রেও সত্য হয়েছিল। প্রতিবছরই বইমেলায় ভিড়ের মধ্যে সুযোগ বুঝে বই চুরি করতাম। একবার অনার্সে পড়ার সময় চার বন্ধু মিলে একুশে বইমেলায় ঘুরতে গেলাম। একটি স্বনামধন্য প্রকাশনীর স্টলের সামনে তখন বেশ জটলা বেধে আছে। অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারকে ঘিরে এই জটলা। সবাই তাঁর নতুন বই কিনে অটোগ্রাফ নিতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই ওই স্টল থেকে তাঁর ‘জলমানব’ বইটি নিয়ে জটলার ভেতরে ঢুকে যাই। বন্ধুরাও আমাকে অনুসরণ করল। আমি সেলসম্যানের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও তারা সেটা পারেনি। তাই সেলসম্যান আমাদের অনুসরণ করে পেছন থেকে এগিয়ে আসে। যেই না আমরা অটোগ্রাফ নিয়ে কেটে পড়ব, ঠিক তখনই ‘বইচোর’ বলে আমাদের পেছন দিক থেকে দুজন সেলসম্যান ঝাপটে ধরে। খুবই অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম, সেই ঘটনা আর নাইবা বলি। যা হোক, জাফর ইকবাল স্যার সেই যাত্রায় আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন। তবে ওয়াদা করিয়ে নিলেন, ভবিষ্যতে যেন এভাবে বই চুরি না করি। বাস্তবে ওটাই ছিল আমার জীবনের শেষ বই চুরি।

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা