kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

[প্রাণের মেলা]

লেখকের নাম ফরিদ উদ্দিন

বুয়েটের নিরাপত্তারক্ষী তিনি। বই পড়তে সময় মেলে বলে রাতে ডিউটি নিতেন। একসময় লেখালেখিও শুরু করেন। এরই মধ্যে তাঁর তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লেখকের নাম ফরিদ উদ্দিন

ছবি : শারাবান তাহুরা আলী শারিন

জন্ম ১৯৮১ সালে। বাবার দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। ১৯৯৮ সালে ভর্তি হয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে। সে সময়েই বিডিআরে (এখনকার বিজিবি) যোগ দেন সৈনিক হিসেবে। সাত বছর পর পারিবারিক কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। পরে যোগ দেন আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজে, নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে। মাস ছয়েক পর ২০০৮ সালে চলে আসেন বুয়েটের আহসানউল্লাহ হলে। এখানেও নিরাপত্তা প্রহরী।

 

বুয়েটের দিন

বিডিআরের চাকরির সময়ও অবসর পেলে বই পড়তেন; কিন্তু বুয়েটে আসার পর বই পড়ার সময় পেলেন আরো বেশি। বুয়েটের ছাত্র মাইনুল নাটক করতেন। ফরিদ তাঁর সঙ্গেই ঘুরে বেড়াতেন, নাটক দেখতেন। সেই মাইনুল একদিন ফরিদকে কিনে দিলেন রবিঠাকুরের গল্পগুচ্ছ। ফরিদের সাহিত্য পাঠের সেই শুরু। আর থামেননি। তখন ইচ্ছা করেই রাতে ডিউটি নিতেন। কারণ রাতে ডিউটি নিলে পড়ার সময় মেলে। টানা সাত বছর রাতে ডিউটি করেছেন। প্রথম দিকে ছয় মাসে প্রায় ৩০টির মতো বই পড়েছেন। বই কখনো নিজে কিনে পড়তেন, কখনো বা কেউ কিনে দিত। ছাত্রদের কাছ থেকে ধারও নিতেন। সঙ্গে প্রতিদিন নিয়ম করে হলে থাকা সব কয়টি দৈনিক পত্রিকার শুরু থেকে শেষ পড়তেন। একসময় বাংলা অভিধান ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলেন। ছয় মাস পর মাইনুল চিত্রনাট্য লেখা শেখালেন ফরিদকে। ফরিদ একটা চিত্রনাট্য লিখেও ফেলেছিলেন। ২০০৯ সালে লিখলেন গান। প্রথম গান ছিল, ‘কে বলে নেই রবি কাজী/নেই তাঁদের প্রাণ/নিশীথে এসে আমায় শোনায় তাঁরা/কবিতার গান।’ সেবারের সরস্বতী পূজায় এই গান গাওয়া হয়েছিল বুয়েটে। তারপর ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, আধুনিক, দেশাত্মবোধকসহ অনেক গান লিখেছেন। লিখেছেন স্বরবর্ণ ছাড়া গান, ‘কখন কাকে ভালো লেগে যায়/মন জানে না/ভালোবাসা পেলে হূদয়/ভালোবাসা ছাড়া বাঁচে না।’

ফরিদের বইয়ের প্রচ্ছদ

কবিতায় ফরিদ 

২০১৫ সালের সালে এসে কবিতা লেখার শখ জাগল ফরিদের। শুরু থেকেই শব্দ নিয়ে খেলায় তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। বিভিন্ন ধরনের কবিতা লেখা শুরু করলেন, যাতে শব্দরা বিভিন্ন রকম করে আসে। ২০১৭ সালে বইমেলায় বের করলেন প্রথম কবিতার বই ‘বর্ণের খেলাঘর’। নিজের খেয়ালখুশি মতো কবিতা লিখলেন এখানে। যেমন—বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর দিয়ে শব্দ তৈরি করে একটি কবিতা। ‘অসীম আমাদের ইনকিলাবের ইতিহাস/ঈগলের ঈর্ষার উত্থান উনিশের ঋতুতে/একাত্তরে এদিক ঐদিকে ওদের ওঁচা ঔদ্ধত্য/কণ্ঠে খোকাখুকিদের গর্জন ঘূর্ণিবাত দাঙ্গাতে/ চক্রিকে ছিনিয়ে ছেলেরা জাগাল ঝড় ঝঞ্ঝাট’।

বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর একবার করে ব্যবহার করেও কবিতা লিখলেন। একটি কবিতা লিখলেন, যেটাতে দুরকম অর্থ আছে। প্রথমে পড়লে সেটা নেতিবাচক, আবার নতুন করে পড়া শুরু করবেন। তবে এবারে প্রতিটি শব্দের শুরুর অক্ষরটি বাদ দিতে হবে, এবার আরেকটি নতুন কবিতা পাবেন, সেটা দেবে ইতিবাচক অর্থ, ‘অন্যায় অবিচার অকর্তব্যের অকাজ।/অসত্য অকথা অনেকের অকল্যাণের।/অজয় অউপকারী অমানুষ অকাজে-অকর্মে।/অন্যায় অবিচার অপ্রত্যাশিত অকাম্য।’ এবার শুরুর ‘অ’ ছাড়া পড়ে দেখুন। শব্দের শুরুতে এ আছে, শুধু এমন শব্দ দিয়েও কবিতা লিখেছেন; তেমনি শব্দের শুরুতে ‘উ’ দিয়ে কবিতা লিখেছেন, ‘উপনেতার উপদেশে উপনগরীর উন্নয়ন/উপপ্রধানের উপদেশে উপকৃত উপনগরী’।

লিখেছেন শুধু শুরুতে ‘বি’ কিংবা ‘প্র’ উপসর্গযুক্ত শব্দ দিয়ে কবিতা। শব্দের প্যালিন্ড্রোমের কবিতা, ‘ফুলেল বই পড়, বই ফুলেল/আনন্দে উত্সাহে মনের উত্সাহে আনন্দে।’ লাইন দুটি পেছন দিক থেকে পড়ে এলেও একই জিনিস পাবেন। এটিই প্যালিন্ড্রোম। বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর দিয়ে শব্দ তৈরি করে কবিতা লেখাকে বলে ‘প্যানগ্রাম’, প্রতিটি অক্ষর একবার করে ব্যবহার করে লেখাকে বলে ‘লিপোগ্রাম’ আর শুরু থেকে এবং শেষ থেকে পড়লে একই রকম লাগাকে বলে প্যালিন্ড্রোম। ফরিদ সব কিছুই জেনেছেন কবিতা লিখে ফেলার অনেক পরে।

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিজের বই দিচ্ছেন ফরিদ

প্যালিন্ড্রোমের সঙ্গে বসবাস  

ফরিদ প্যালিন্ড্রোম নিয়ে জেনেছেন বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সাইকুল ইসলামের কাছে। সাইকুল বলেছিলেন এটা তো ম্যাথের বিষয়। পরে ফরিদের আগ্রহ দেখে বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন। এরপর ফরিদ ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র আমির খসরুকে বললেন, বিশ্বসাহিত্যের প্যালিন্ড্রোমের খোঁজখবর দিতে। খসরু বললেন, বিশ্বসাহিত্যে প্যালিন্ড্রোম নিয়ে বেশ চর্চা হয়, বাংলা সাহিত্যেও প্যালিন্ড্রোম চর্চা আছে, শুরুটা করেছিলেন দাদা ঠাকুর শরত্চন্দ্র পণ্ডিত।  তারপর থেকেই প্যালিন্ড্রোম নিয়ে কাজ শুরু করলেন ফরিদ। টানা চার বছর চর্চার পর ২০১৯ সালের বইমেলায় বের করেন প্যালিন্ড্রোম কবিতার বই ‘কথা থাক’। ফরিদের দাবি, এটাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্যালিন্ড্রোম কবিতার বই। এর পর ফরিদের মনে হলো প্যালিন্ড্রোম ছড়িয়ে দেওয়া দরকার মানুষের মাঝে। ফলে ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুললেন ‘প্যালিন্ড্রোম প্রচারণা পর্ষদ’ নামে। কেউ আগ্রহ দেখালে ফরিদ তাঁকে ফোন করে বুঝিয়ে দিতেন। এভাবে প্রায় চৌদ্দ শ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন ফরিদ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ফেসবুকে ঘোষণা দিলেন—প্যালিন্ড্রোম কবিতার বই বের করবেন নিজের সম্পাদনায়। তাই প্যালিন্ড্রোম বাক্য, অণুগল্প ও প্যালিন্ড্রোম শব্দের ব্যবহার করে গল্প আহ্বান করলেন। মানুষ পাঠাতে আরম্ভ করল। প্রচারণার জন্য ফরিদ গণিতবিদ চমক হাসানের দ্বারস্থ হলেন। চমকও আগ্রহী হয়ে লিখে ফেললেন কয়েকটি কবিতা। তারপর থেকে প্যালিন্ড্রোম কবিতাও আসতে শুরু করল। এভাবে বই হয়ে গেল দুটি। গল্পের বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘নবযৌবন’ আর কবিতার বইয়ের নাম ‘নবপ্লাবন’। নবযৌবনে আছে ৫৫ জনের লেখা। ১১১ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২৬২ টাকা। নবপ্লাবনের লেখক ৩৩ জন, কবিতা আছে ৮৮টি, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১১১ আর বইয়ের মূল্য ২৬২ টাকা। ছেপেছে বেহুলা বাংলা। এই বইয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্যালিন্ড্রোম সনেট। লিখেছেন কাতারপ্রবাসী হাফেজ আহমেদ। তিনিও একজন নিরাপত্তা প্রহরী। হাফেজ আরো লিখেছেন ‘লতিফা’। লতিফার ধারণাটি আরবি সাহিত্যের। এটি ছয় লাইনের বেশি বা কম হওয়া যাবে না। প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ চরণে চারটি করে শব্দ; তৃতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ চরণে সাতটি করে শব্দ। বই দুটিতে ফরিদ প্যালিন্ড্রোমের ইতিহাস এবং বিস্তারিত নিয়ম লিখেছেন। চমক হাসানকে দিয়ে লিখিয়েছেন বাংলায় প্যালিন্ড্রোম লেখার কৌশল।

কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে

ফরিদ চান প্যালিন্ড্রোম নিয়ে মানুষ লিখুক, কথা বলুক, চর্চা হোক। ‘আমার নাম না আসুক, তাতেও আমার আপত্তি নেই।’ তবে কেউ যদি সহযোগিতা করে, তাহলে স্কুল-কলেজে গিয়ে বিনা মূল্যে প্যালিন্ড্রোম বিষয়ে বুঝিয়ে দিয়ে আসতে চান ফরিদ। ফরিদ শিশুদের পড়ার উপযোগী প্যালিন্ড্রোম লিখতে চান।

 

ব্যক্তিগত ফরিদ

২০০৯ সালে বিয়ে করেছেন। দুটি ছেলে স্কুলে পড়ছে। ফরিদ বললেন, ‘আমি দেখাতে চেয়েছি, ইচ্ছাশক্তির বলে মানুষ অনেক দূর পৌঁছাতে ও অনেক দুঃসাধ্য সাধন করতে পারে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা