kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

[আ মরি বাংলা ভাষা]

সালাম যেভাবে মূর্ত হলেন

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সালাম যেভাবে মূর্ত হলেন

এটিই আজ ভাষাশহীদ সালামের ছবি বলে সবার কাছে সমাদৃত

ভাষাশহীদদের নাম বলতে গিয়ে আমরা বলি রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার। এই চারজনের মধ্যে তিনজনের ছবি পাওয়া গেলেও ২০০০ সালের আগে সালামের কোনো ছবি ছিল না। ভাস্কর রাসা ভাষাশহীদদের ভাস্কর্য করতে গিয়ে দেখেন এই ভাষাশহীদের কোনো ছবিই নেই। সালামের গ্রামের বাড়ি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর কোথাও কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। ‘অস্তিত্বের শেকড়ে আলো’ নামে একটি সংগঠন চিত্রশিল্পীদের দিয়ে সালামের ছবি আঁকার আয়োজন করে। এই আয়োজনে প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ভাস্কর রাসা।

 

আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ

২০০০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে দেশে প্রখ্যাত পোর্ট্রেট পেইন্টারদের নিয়ে সালামের ছবি আঁকার আয়োজন শুরু হয়। আমি ছাড়াও সেখানে ছিলেন শিল্পী অলকেশ ঘোষ, আবদুল মান্নান, আহমেদ শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল। এই আয়োজনে ভাস্কর্য গড়েন রাজীব সিদ্দিকী। আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। সবে মাস্টার্স করেছি। সেই সময় প্রতিকৃতি আঁকিয়ে হিসেবে আমাকে অনেকেই চিনতেন। কথা ছিল আমাদের সালামের গ্রামের বাড়ি ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তাঁর ছোট ভাই ও বোনের কাছে তাঁর বর্ণনা শুনে আঁকব। শেষ পর্যন্ত আমাদের আর ফেনী যাওয়া হলো না। তখন অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। সালামের ছোট ভাই ও বোন উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মুখে সালামের বর্ণনা শুনে আমরা আঁকতে শুরু করি। সকাল থেকে আঁকতে আঁকতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।

অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম

এখানে যে শিল্পীরা ছিলেন, তাঁরা আমার শিক্ষকতুল্য এবং শ্রদ্ধাভাজন। সেই সময় তাঁদের সঙ্গে ছবি আঁকা, এটা আমার এক ধরনের ধৃষ্টতা মনে হয়েছে। তবে ভেতরে ছিল সাহস ও চ্যালেঞ্জ। মনে হয়েছে, আমি বোধ হয় সালামকে আঁকতে পারব। ভাই-বোনের কাছে সালামের বর্ণনা শুনে ফিরতে চেয়েছি সেই বায়ান্ন সালে। সালামকে তাঁর ভাই-বোনের বর্ণনা মতে ধারণ করার চেষ্টা করেছিলাম। সবাই আঁকছিলেন। আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম কিভাবে সালামকে ধারণ করা যায়। তারপর আঁকা শুরু করলাম। সেই দিন আমরা সবাই অর্ধবৃত্ত হয়ে বসে ছবি আঁকছিলাম। পাশেই দাঁড়িয়ে ভাইয়ের বর্ণনা দিচ্ছিলেন সালামের ভাই ও বোন। তাঁরা কখনো বলছিলেন নাকটা একটু লম্বা হবে। চোখটা একটু বড় হবে। কখনো বলছেন তাঁর একটু হালকা গোঁফ ছিল। কখনো বলছেন—না, গোঁফটা আরেকটু ভারি হবে। তখন তাঁর বয়স কেমন ছিল। কেমন ছিল তাঁর পোশাক-আশাক। ঠোঁটের গড়ন কেমন ছিল—সবই বলছিলেন। এসব শুনে আমি যেন স্বপ্ন দেখছিলাম। আমাদের সঙ্গে ভাস্কর রাসা ভাই, রাজীব সিদ্দিকী বর্ণনা শুনে ভাস্কর্য করছিলেন।

 

‘এ আঁর ভাই’

একসময় আঁকা শেষ হলো। সন্ধ্যায় সব ছবি একসঙ্গে ডিসপ্লে করা হয়। সালামের ভাই ও বোন দেখতে থাকেন আসলে কোনটি সালামের মতো হয়েছে। কোন ছবিতে সত্যিকারের সালামের দেখা মিলবে। দেখতে দেখতে আমার ছবির সামনে এসে তাঁরা চিত্কার দিয়ে উঠলেন—‘এ আঁর ভাই, বেগগুনো নো’ (এটা আমার ভাই, অন্যগুলো নয়)। তাঁরা মনে করেছিলেন এই ছবিতে তাঁদের ভাইকে খুঁজে পেয়েছেন। তখন আবিষ্কারের যে আনন্দ সেটা অনুভব করলাম। সেই দিন সালামের ভাই-বোনের মুখে যে আনন্দ দেখেছিলাম, তা বলে বোঝানোর মতো না।

 

এখনো জাতীয় জাদুঘরে আছে

পরে এই ছবিটি সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে দেওয়া হয়। এখনো সেখানেই এটি আছে। এই ঘটনা নিয়ে একটি ফিল্মও তৈরি হয়েছিল। নাম ‘অস্তিত্বের শিকড়ে’। সেই ফিল্মটিও জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়। সে অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম।

যাহোক, এর পর থেকে এই ছবিটিই সালামের ছবি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ছবিটি ধরেই পরে অনেকে নতুন করে সালামকে এঁকেছেন। একাত্তরে আমার জন্ম, তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নেই। আর ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন তো প্রশ্নই আসে না। তবে  চিত্রশিল্পী হিসেবে একজন ভাষাশহীদকে সবার সামনে তুলে আনতে পারা আমার জীবনে একটা বড় অর্জন। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সালামকে তুলে আনা হয়েছে তাঁর সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে ভালো লেগেছে। যতগুলো কাজ করেছি তার মধ্যে এই কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কতটুকু দক্ষতার সঙ্গে আঁকা হয়েছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সালামকে কতটুকু তুলে ধরতে পেরেছি। সেই সময়ে নরমালি যেভাবে প্রতিকৃতি আঁকতাম, এখানে ছিল তার ব্যতিক্রম। আমি তেলরঙে কাজ করি, অ্যাক্রিলিকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম না। তাই ছবিটায় কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।

 

একজন শাহাজাহান আহমেদ বিকাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৯৬ সালে। এখন ইউডার চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান। ছাত্রজীবন থেকে প্রতিকৃতি আঁকিয়ে হিসেবে খ্যাত। শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি করেছেন আট শতাধিক।                         

     ছবি : সংগ্রহ ও লেখক

ভাষাশহীদ আবদুস সালাম

১৯২৫ সালে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নামে বর্তমানে এই গ্রামের নাম সালামনগর। ১৯৫২ সালে তিনি সচিবালয়ে চাকরি করতেন। থাকতেন পলাশী ব্যারাকে। সেখান থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভে অংশ নেন। জনতার ওপর পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে অন্যান্যের সঙ্গে আবদুস সালামও গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে ভর্তির প্রায় দেড় মাস পর ৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

টিএসসিতে শহীদ সালামের ছবি আঁকছেন শিল্পীরা

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা