kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

যাঁরা আড়ালে থাকেন

বিশ্বজয় করে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা। সবার মুখে মুখে এখন তাঁদের নাম-ডাক। আজকের এই মাহমুদুল, শামীম কিংবা মৃত্যুঞ্জয়দের গড়ে তুলতে নিভৃতে কাজ করেছেন অনেকে। আড়ালে থাকা এমন কয়েকজনের গল্প বলছেন নোমান মোহাম্মদ

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যাঁরা আড়ালে থাকেন

বিশ্বকাপ জয়ের পর যুবাদের উল্লাস

নেপথ্য নায়ক

গত শতকের শেষ দশক। বিসিবির অধীনে কোচদের এক ট্রেনিং প্রগ্রাম। জালাল আহমেদ চৌধুরী ও আবদুল হাদি রতন প্রশিক্ষণ দেন ২৮ জেলার কোচদের। প্রশিক্ষণ শেষে সার্টিফিকেট বিতরণের সময় তাঁরা বলেন, ‘এখন সবাই নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভাঙা ব্যাট, সুতা ওঠা বল দিয়ে অন্তত একটি ছেলেকেও যদি ক্রিকেট শেখাও, তাহলে আমাদের এ প্রগ্রাম সার্থক হবে।’

কে জানত, অনুপ্রেরণার ওই একটি বাক্যেই লেখা দুজন বিশ্বজয়ীর নাম! শামীম হোসেন ও মাহমুদুল হাসান। ১৯৯৯ সালের সে সময়টায় তো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী এ দুই ক্রিকেটারের জন্মই হয়নি। তাহলে? গল্পটা শুনতে হবে শামীম ফারুকীর কাছে, ‘জালাল স্যার ও রতন স্যারের সে কথায় আমি খুব অনুপ্রাণিত হই। নিজ জেলায় ফিরে প্রতিষ্ঠা করি চাঁদপুর ক্রিকেট একাডেমি। এর-ওর কাছে ব্যাট-বল চেয়েচিন্তে, বাচ্চাদের কাছ থেকে পাঁচ-দশ টাকা বেতন নিয়ে তা এগিয়ে নিয়েছি। পরে ২০১৪ সাল থেকে ক্লেমন আমাদের স্পন্সর করছে। আজ যখন দেখি আমার সেই একাডেমির দুই ছাত্র শামীম ও মাহমুদুল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছে, মনে হয় সারা জীবনের কষ্টের একটা ফল পেলাম।’

দুই শিষ্য শামীম হোসেন ও মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে কোচ শামীম ফারুকী

ফারুকী এমনই এক নেপথ্য নায়ক। কয়েক দিন আগেও যিনি ছিলেন প্রায় অখ্যাত। এখন দুই শিষ্যের কারণে বিখ্যাত। তাঁদের দেখার প্রথম স্মৃতি ফারুকীর স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বলে, ‘খুব অল্প বয়সে ওরা আমার একাডেমিতে আসে। মাহমুদুলের বাবা নিয়ে এসে বলেছিলেন, ছেলেকে বিকেএসপিতে ভর্তি করাব, একটু তৈরি করে দিন। বেশিদিন না, এক-দেড় বছরের মতো ওকে পেয়েছিলাম। শান্ত, হাসি-খুশি একটি ছেলে। ভীষণ পরিশ্রমী। শেখার প্রবল আগ্রহ। তবে সত্যি বলতে কী, প্রথম দেখায় মাহমুদুলকে স্পেশাল প্রতিভা বলে আমার কাছে মনে হয়নি।’

সেটি আবার মনে হয়েছে শামীমকে দেখে, ‘ও সহজাত প্রতিভা। এক আত্মীয় নিয়ে এসেছিল। তবে বেশি ছোট বলে শামীমকে দিয়ে প্রথম বছর খেলাইনি। তখন ওর চেহারা দেখে মনে হয়, ও হয়তো ভাবছিল, গ্রামের ছেলে বলে স্যার আমাকে বাদ দিচ্ছে। আমি কিন্তু বাদ দিইনি। অনূর্ধ্ব-১৪ দলের সঙ্গে রেখেছি। পরের বছর থেকে যখন খেলা শুরু করল, আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।’ নিজে পিছু ফিরে তাকিয়ে শিষ্যের একটি ইনিংস আজও মনের পর্দায় দেখতে পান ফারুকী, ‘অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার বিপক্ষে ম্যাচ, ফেনী মাঠে। ধীরে-সুস্থে ফিফটি করল শামীম। এরপর কী যে হলো, ঝড় ওঠাল ব্যাটে। ফেনীর মাঠটি ছোট। শামীমের ছক্কায় ছয়-ছয়টি বল হারায় সেদিন। সেঞ্চুরি করতে পারেনি; আউট হয়ে যায় ৯০ রানে। তবে ইনিংসটি ছিল স্পেশাল।’

 

দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে ১৮৪ রান মাহমুদুলের; বাংলাদেশের পক্ষে যা সর্বোচ্চ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে করেন সেঞ্চুরি। টুর্নামেন্টজুড়ে শামীমের ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন পড়েনি তেমন। ইনিংসের শেষ দিকে চারবার নামতে হয়; করেন ২০ রান। সঙ্গে অফ স্পিনে পাঁচ উইকেট। শিষ্যরা বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ হলেও তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে চান না ফারুকী, ‘ওরা চাঁদপুরে ফেরার পর সবাই মিলে সংবর্ধনা দিয়েছে। ডিসি অফিসের সে আয়োজনে আমারও কথা বলার সুযোগ হয়। শামীম ও মাহমুদুলের উদ্দেশে আমি বলেছি, এটি তোমাদের কেবল শুরু। আর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছ বলেই আমার কোচিং ক্যারিয়ার সার্থক হয়ে যায়নি, যেদিন জাতীয় দলে খেলবে, সেদিন নিজেকে সার্থক মনে করব।’ এই সংবর্ধনার আয়োজনে গিয়ে নিজের মোবাইল চুরি হয়ে যাওয়ার গল্পও হাসিমুখেই করেন ফারুকী! বিশ্বজয়ী দুই শিষ্যের প্রত্যাবর্তনের দিনে এসব ধরতে আছে নাকি!

 

সুদীপ্ত ছিলেন বলে

‘সবার জন্য ঈদ এলেও দীপুদের জন্য ঈদ আসত না। নতুন জামা কেনার সামর্থ্য ছিল না; সেদিন একটু ভালো রান্না পর্যন্ত করতে পারত না। পুরনো কাপড়ে ঈদের নামাজ পড়ে বাবার কবর জিয়ারত করে গ্রামে মামার বাড়ি চলে যেত। সেই ছেলেটি আজ বিশ্বকাপ জিতেছে। বোর্ড থেকে ওদের মাসে এক লাখ টাকা করে দেবে। এটি যে আমার জন্য কী আনন্দের!’

সুদীপ্ত দেবের আনন্দ অকারণ নয়। বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে ১৩১ রান করা শাহাদাত হোসেন দীপুকে যে ক্রিকেটের পথ চিনিয়ে দেন তিনি! সেটিও কী ভীষণ প্রতিকূল পরিবেশে! চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার ছিলেন শাহাদাতের বাবা। ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যুর পর পুরো পরিবার পড়ে অকূল পাথারে। ক্রিকেট তখন রীতিমতো বিলাসিতা; কিন্তু নিজে ক্রিকেটার হওয়ার কারণে প্রতিভা চিনেছিলেন সুদীপ্ত। শাহাদাতকে তাই থেমে যেতে দেননি, ‘সংসার চালানোর জন্য ওর ভাই গাড়ি চালানো শুরু করে। লাশের গাড়ি। কিছুদিন পর সরকারি ড্রাইভার্স কোয়ার্টার থেকে চলে যেতে হয়। একসময় তো অভাবের কারণে গ্রামে চলে যাবে বলে ঠিক করে। তাহলেই দীপুর ক্যারিয়ার শেষ! ও আমাদের পাড়ার অরুণোদয় ক্রিকেট ক্লাব এবং জয়নগর ক্রিকেট ক্লাবে ভালো খেলত। তখন বললাম, দ্বিতীয় বিভাগের তিনটি ম্যাচ আছে; সেখানে অন্তত খেলে যা।’ 

 

 

সুদীপ্ত দেবের সেলফিতে শাহাদাত

শাহাদাত খেললেন দুর্দান্ত। সুদীপ্তের বিশ্বাসের জোর বাড়ল আরো। নিজে চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে ইস্পাহানিতে খেলেন তখন। বলেকয়ে ক্লাবের একাডেমিতে বিনা মূল্যে ভর্তি করিয়ে দেন শাহাদাতকে। মাসিক বেতন মওকুফের ব্যবস্থাও করেন। এরপর ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া। ‘ব্যাট-বল দিয়ে অথবা যেভাবেই হোক আমি সব সময় দীপুকে সাহায্য করেছি। এ নিয়ে ও বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে। আমার সে বিষয়ে কোনো গর্ব নেই; বরং গর্বিত হই ওকে আজ বিশ্বজয়ী দলে দেখে। দীপুর সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক নেই সত্যি; কিন্তু যা আছে, তা রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি’—ভেজা গলায় কী গৌরব নিয়েই না বলেন সুদীপ্ত! সবার শাহাদাত কিংবা তাঁদের দীপু চট্টগ্রামে ফেরার পর মেডিক্যাল কলেজ মাঠে কেক কেটে শোভাযাত্রা করে সংবর্ধনার গল্পও যেন ফুরোবার নয়।

 

বাবার স্বপ্নপূরণ

মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী ছিলেন না শামীম ফারুকীর মতো কোচ কিংবা সুদীপ্ত দেবের মতো ক্রিকেট অভিভাবক। প্রয়োজনও পড়েনি। কারণ তাঁর স্কুল শিক্ষক বাবা তাহাজ্জদ হোসেন চৌধুরীই যথেষ্ট। ক্রিকেট ভীষণ ভালোবাসেন। পাকিস্তানের বাঁ হাতি ফাস্ট বোলার ওয়াসিম আকরামের পাঁড় ভক্ত। ছেলেকে সেই ছাঁচে গড়ে তোলার চেষ্টা সেই ছোট্টটি থেকে।

তাহাজ্জদ হোসেন চৌধুরী

তা বৃথা যায়নি। ঠিকই বাঁ হাতি পেসার বানিয়েছেন ছেলেকে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের মাঝপথ থেকে ইনজুরির কারণে না হয় ফিরতে হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়কে! কিন্তু বিশ্বজয়ী দলের অংশ ঠিকই। আর তাতেই স্কুল শিক্ষক বাবার স্বপ্ন পায় পূর্ণতা।

‘লেখাসহ সব কাজ ও মূলত ডান হাতে করলেও বাবা ব্যাটিং-বোলিং শেখানো শুরু করেন বাঁ হাতে। ওয়াসিম আকরাম বানানোর জন্য। সাতক্ষীরায় বাসার সামনের ছোট জায়গায় আমি, বাবা ও ছোট ভাইটি কত অনুশীলন করেছি! ও আজ বিশ্বকাপ জিতেছে; বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে’—বলেন, মৃত্যুঞ্জয়ের বড় ভাই ইমরুল হোসেন চৌধুরী। সাতক্ষীরায় বেড়ে ওঠার পর পুরো পরিবারের ঢাকায় চলে আসার পেছনেও বাবার স্বপ্নের ভূমিকা ছিল বলে জানান, বাবা স্কুল শিক্ষক। তিনি বদলি হয়ে আসেন সাভারের হেমায়েতপুরে। সাতক্ষীরায় তখন কোনো ক্রিকেট একাডেমি নেই। নিজের ছোট ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর জন্য পুরো পরিবারকে বাবা ঢাকা নিয়ে আসেন। আমরা মোহাম্মদপুরে চলে আসার পর ও অনুশীলন শুরু করে সিসিএসে। এরপর ধাপে ধাপে আজকের জায়গায়।

শামীম ফারুকী, সুদীপ্ত দেব কিংবা তাহাজ্জদ হোসেনের মতো নেপথ্য নায়কদের আনন্দের আকাশে এখন তাই শত সূর্যের ঝিলিক; হাজার তারার ফুল।

 

মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা