kalerkantho

শনিবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

[ অদম্য মানুষ ]

আমারে সবাই দেখিতে পায় আমি না পাই মোরে

‘নতুনের উত্সবে’ প্রদর্শনীর পর থেকেই আলোচনায় মোস্তাফিজ শাহীনের ‘লটারি’। যাঁদের নিজের ভুবন আলোহীন, এই নাটকের মাধ্যমে মঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন তাঁরা। তাঁদেরই একজন নাজিয়া হাসান মাইশা। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে শুনিয়েছেন মনের আলোয় মঞ্চে ওঠার গল্প

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমারে সবাই দেখিতে পায় আমি না পাই মোরে

নাজিয়া হাসান মাইশা

আমাদের কারোরই অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না। আমাদের মধ্যে অনেকে আছে, যারা খুব কাছ থেকে একটু একটু দেখতে পায়। কিন্তু আমি তাও পাই না। এমনকি ছায়াও না। আমার স্বাভাবিক মুভমেন্ট করতেই তো অসুবিধা হয়। অভিনয় করব কিভাবে? মোস্তাফিজ শাহীন ভাই বললেন, ‘আমার ওপর আস্থা রাখো।’

 

সপ্তাহে পাঁচ দিন রিহার্সাল

জুলাইয়ে রিহার্সাল শুরু হলো শিল্পকলা একাডেমির মহড়াকক্ষে সোম থেকে বুধ, বিকেল ৩টা থেকে ৬টা। শুক্র ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। শুরুতে ১০ জনের মতো ছিলাম। পরে আরো কয়েকজন যুক্ত হয়। প্রথমদিকে আমাকে বলা হলো, ‘তুমি শুধু শোনো এবং অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার চেষ্টা করো, ওরা কিভাবে বলছে।’ পরে আমাকে কিছু লাইন শোনালেন শাহীন ভাই। বললেন, ‘তুমি এখন বলো তো।’ শুরুতে কিছু বলতেই পারছিলাম না। ভাইয়া বললেন, ‘স্বাভাবিকভাবে বলার চেষ্টা করো। আস্তে আস্তে হয়ে যাবে।’ রিহার্সালের শুরুর দিকে আমাদের স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনানো হয়েছিল। কমেডি ঘরানার নাটক। স্ত্রী আর এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে মাহবুব হোসেনের টানাপড়েনের সংসার। একদিন অন্য এক ছেলেকে অপহরণ করতে গিয়ে ভুল করে মাহবুবের ছেলেকে অপহরণ করে ছিঁচকে অপহরণকারীর দল। এ নিয়েই এগিয়ে যায় কাহিনী। এখানে রূপকের আড়ালে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে। নাটকটি রচনা করেছেন সিদ্দিক এবং অনুপ। প্রযোজনায় মঙ্গলদীপ ফাউন্ডেশন। সহযোগিতা দিয়েছে প্রেরণা ও নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়। প্রথম দিন শুধু শুনলাম। এরপর ডায়ালগ প্র্যাকটিস। শাহীন ভাই পড়ে শোনালেন। আমরা রেকর্ড করলাম। এভাবে যার যে দৃশ্য সে সেটা মুখস্থ করে ফেলল।

লটারি নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি : সংগ্রহ

আমি সাংবাদিক

একটি দৃশ্যে সাংবাদিকের চরিত্র ছিল। শাহীন ভাই বললেন, ‘মাইশা, তুমি এই লাইনগুলো আমার সঙ্গে একটু বলো।’ তিনি পড়লেন, সঙ্গে সঙ্গে আমিও বললাম।  লাইনগুলো হাস্যরসাত্মক। একটি দৃশ্য ছিল পুতুলদের সঙ্গে। সেখানে ডায়ালগটি এমন—‘আমার তাজা খবর লাগবে, পারবা তাজা খবর এনে দিতে।’ তখন পুতুলটি বলে, কবর লাগবে? বললাম, ‘কবর না, কবর না; তাজা খবর!’ এটা খুব রেগেমেগে বলতে হবে। কিন্তু যতবার বলতে যাই, হাসি চলে আসে। একসময় আয়ত্তে চলে আসে। নাটকে ১৬টি চরিত্র। আমি সাংবাদিক ও টক শো উপস্থাপকের চরিত্র করেছি।

আমার ছিল সাত নম্বর দৃশ্য। সেখানে সাংবাদিকের সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদক থাকার কথা। তখনো সম্পাদক নির্বাচন করা হয়নি। একেকবার একেকজন দিয়ে করানো হচ্ছিল। তারপর একদিন সম্পাদকও ঠিক হলো। সাংবাদিক হিসেবে আমি সব সময় তাজা খবর খুঁজি। এক জায়গায় একটা স্লোগান আছে, ‘তাজা খবর চাই, তাজা খবর চাই।’ এটাকে গান বানালেন জয়ীতা আপু (মোস্তাফিজ শাহীনের স্ত্রী)। প্রথমে বলা হলো, এই গানটা রেকর্ড প্লেয়ারে বাজবে। পরে বললেন, না। তোমরাই গাইবে। এভাবে গানটি হলো। শিমুল সাইফুল ভাইয়া মিউজিক কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্বে ছিলেন।

 

অনেকে এসেছিল

ডালিয়া নওশীন ম্যাম তো প্রায়ই এসে অভিনয় দেখতেন। উত্সাহ দিতেন। আমাদের উত্সাহ দেওয়ার জন্য শাহীন ভাইয়া রিহার্সালে একেক দিন একেকজনকে নিয়ে আসতেন। এভাবে একে একে আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকের, অপি করিম, নাজনীন চুমকি, রওনক হাসান, ভাবনা, প্রিয়াংকা গোপসহ অনেকে এলেন। তাঁরা আমাদের উত্সাহ দিতেন।

 

খুব ভয় লাগত

অভিনয়ে ভয় লাগত না। কিন্তু মুভমেন্ট ঠিকঠাক হচ্ছিল না। প্রায়ই দেখা যেত একদিকে টার্ন করার কথা, আরেক দিকে ঘুরে যাচ্ছি বা যতখানি আসার কথা তার বেশি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। তখন মনে হতো—যদি এই ভুলগুলো স্টেজে করি! তাকানোয় বা সংলাপ বলার সময় একটু জড়সড় হয়ে থাকতাম। এগুলো আস্তে আস্তে ঠিক করলাম।

 

নাটক শুনতাম

শাহীন ভাই বলতেন, তোমরা নাটক না দেখতে পারলেও অন্তত শুনলে একটা ধারণা হবে। শিল্পকলায় নাটক তো হতোই। ‘খনা’, ‘খোয়াবনামা’সহ কয়েকটি নাটক শুনেছি।

 

শো হবে তো?

একবার বলা হলো, অক্টোবরের লিট ফেস্টে নাটকটি হবে। তারপর নভেম্বরে। এ রকম কয়েকবার পেছানোর পর একটু হতাশই হয়েছিলাম। যা হোক, নভেম্বরের ৫ তারিখে প্রথম টেকনিক্যাল শো হয় মহিলা সমিতি মিলনায়তনে। ৩টার দিকে আমরা গ্রিনরুমে গেলাম। একটু নার্ভাসও লেগেছিল। সবার কস্টিউম এলো। মেকআপ আর্টিস্ট মেকআপ করালেন। এটা ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা! টেকনিক্যালের দিন আমাদের স্টেজে নিয়ে দেখানো হলো। সেখানে আমার মুভমেন্ট করতে অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ মহিলা সমিতির স্টেজ অত বড় ছিল না। মহড়াকক্ষে আমাকে অনেক দূর হেঁটে যেতে হতো। ভাইয়া বললেন, এখানে তুমি জাস্ট তিন-চার পা হেঁটে যাবে। আবার ব্যাক করবে। প্রবেশ এবং প্রস্থানের পথ যখন দেখিয়ে দিচ্ছিলেন তখনো একটা ভয় কাজ করছিল—ও মাই গড, এটা তো স্টেজ। একটু সামনে গেলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রচুর লাইট ছিল। টক শোর দৃশ্যটি ছিল এমন—একটি মিউজিক বাজবে, মিউজিক অফ হলে লাইট জ্বলবে। ঠিক তখনই আমি ডায়ালগ দেব। আমি তো লাইট দেখতে পাচ্ছি না। মিউজিক চলাকালেই আমাদের স্টেজে নিয়ে বসানো হলো। চারজন ব্যাক স্টেজ পারফর্মার ছিল। তারা আমাদের আনা-নেওয়া করত। শুনেছি শো শেষে আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকেরসহ যাঁরা ছিলেন, সবাই দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।

 

এবার দর্শকের সামনে

শিল্পকলা একাডেমির মূল মঞ্চে শো হলো ডিসেম্বরের ৫ তারিখ। নাগরিকের নাট্যসম্প্রদায়ের নতুনের উত্সবে। ওই দিন ক্যাম্পাসের বন্ধু এবং পরিচিতজনদের বলে রেখেছিলাম। লাঞ্চের পর ভাইয়া আমাদের মঞ্চে নিয়ে গেলেন। বুঝলাম, মহিলা সমিতির স্টেজের চেয়ে এটা অনেক বড়। সেখানে মাত্র দুটি উইং। এখানে অনেক এন্ট্রি ও এক্সিটের ডোর। তখন আবার ভয় লাগল। কারণ এখন মুভমেন্ট বেশি হবে। ভাইয়া বললেন, টিকিট সব সেল হয়ে গেছে। প্রায় ৭০০ জন দর্শক। একটা প্রেসার কাজ করছিল।

 

সারাক্ষণই টেনশনের ভেতর ছিলাম

একেকজন মঞ্চে যাচ্ছে আর আমরা সবাই দোয়া পড়ছি, কেউ কোনো ভুল যাতে না করে। হঠাত্ করে আমার দৃশ্য চলে এলো। একেবারে খেয়ালই ছিল না যে এখন আমার দৃশ্য। আমাকে নিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমার পা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল এখনই পড়ে যাব। দর্শক সারি থেকে টুকটাক বন্ধুদের কথা কানে আসছিল। ভীষণ ভয় লেগেছিল। তবু নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করলাম। মিউজিক বাজার পর আমার ডায়ালগ দেওয়ার পালা। তখন সম্পাদক ডায়ালগ দিল। আমিও দিলাম। আমি সপ্তম দৃশ্যে সাংবাদিক আর নবম দৃশ্যে উপস্থাপকের ভূমিকায়। তখন গেটআপ পরিবর্তন করতে হয়। চোখে থাকে চশমা। আট নম্বর সিনটা একটু ছোট। ওটা শেষ হলে আবার মঞ্চে গেলাম। নাটক শেষে আমরা সবাই স্টেজে দাঁড়িয়ে আছি। হাততালি যেন থামছেই না। অনেকেই স্টেজে এসে আমাদের আশীর্বাদ করেছেন, ছবি তুলেছেন। আসাদুজ্জামান নূরসহ অন্যরা যখন এসে বললেন, ভালো হয়েছে। তখন মনে হলো, এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

 শ্রুতলিখন : আব্দুর রাজ্জাক

 

মোস্তাফিজ শাহীন

 

নির্দেশক বললেন

‘কলাকুশলীরা প্রায় সবাই দৃষ্টিশক্তিহীন। তারা বিশ্বাস করে, অন্যরা যা পারে আমিও তা পারব কারো কৃপায় নয়, নিজের যোগ্যতায়। আমি শুধু তাদের পথ দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। নাটকটি বিশেষ ব্যক্তিরা করলেও এটা যেকোনো নিয়মিত থিয়েটারের স্বাদ দেবে দর্শকদের।’

 

যাঁরা অভিনয় করেছেন

বুশরা, পাভেল, আল আমিন, রাহুল, লিপি, রুপম, সাকিব, শওকত, আরিফ, রিয়াদ, মাইশা, তৃষ্ণা, তামান্না, মিতু, আঁখি, শাহদাত। ড্রামাটার্গ ছিলেন সারা যাকের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা