kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

[ মহাপৃথিবী ]

প্রজাপতি মেয়ে

স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু ইউনিভার্সিটির ছাত্রী লুসি বেল লোটে। ইবি নামের এক বিরল রোগে আক্রান্ত তিনি। সামান্যতম স্পর্শে ছিঁড়ে যেতে পারে তাঁর শরীরের ত্বক, পড়তে পারে ফোসকা। বিবিসির রেডিও ওয়ানকে বলেছেন নিজের যন্ত্রণাদায়ক সময়ের কথা

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রজাপতি মেয়ে

‘অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, কখনো আমার মনে হয় কি না আমি বাড়তি পাওয়া জীবন কাটাচ্ছি...। আমি অবশ্যই সেটা মনে করি না। কারণ এটা আমার নিজের জীবন। আর আমি সেটা সাধ্যমতো ভালোভাবে ব্যবহার করে যেতে চাই।’

লুসি বেল লোটের বয়স ২০ বছর। তাঁর এপিডারমোলাইসিস বুলোসা (ইবি) নামের একটি বিরল রোগ রয়েছে। তাঁর শরীরের ত্বক সামান্যতম স্পর্শে ছিঁড়ে যেতে পারে এবং ফোসকা পড়তে পারে। লুসিকে অনেক সময়ই বেদনাদায়ক ক্ষতগুলো বেঁধে রাখতে হয়।

যে তরুণদের ইবি নামের এই বিরল রোগ রয়েছে, অনেক সময় তাদের ডাকা হয় ‘বাটারফ্লাই চিলড্রেন’ বা ‘প্রজাপতি শিশু’। কারণ তাদের শরীরের চামড়া প্রজাপতির ডানার মতো ভঙ্গুর।

‘বেশির ভাগ সময় অনলাইনে আমি যে প্রশ্নের মুখোমুখি হই সেটা হলো, এটা কি কষ্টকর? আর আমি তখন বলি, হ্যাঁ। ক্ষত বের করা বেশ ভালোই কষ্টকর হতে পারে।’ বললেন লুসি।

‘এই মুহূর্তে আমার গোড়ালিতে একটি বড় ক্ষত রয়েছে, আমি সত্যিই সেটির ব্যথা অনুভব করতে পারি।’

এটা লুসিকে ভেতর থেকেও আহত করতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, কিশোরী বয়সে তাঁর গলায় বেশ কয়েকটি অপারেশন করতে হয়েছে। কারণ তাঁর গলার ভেতরেও এ রকম ক্ষত দেখা গিয়েছিল। এ ধরনের রোগে আক্রান্ত মানুষজন অল্প বয়সেই মারা যায়।

ইবি রোগটি বংশগত, যার মানে হলো—লুসি এই রোগ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পেয়েছেন এবং আগে থেকে সেটা ধরারও কোনো উপায় নেই। রোগীরা এ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয় না।

ধারণা করা হয়, বর্তমানে শুধু যুক্তরাজ্যে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের ইবি  রয়েছে। সারা বিশ্বে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখ।

টেক্সাসের অস্টিন থেকে আসা লুসি বর্তমানে স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন।

তিনি বলছেন, তাঁর ইবি প্রথম শনাক্ত হয় তাঁর জন্মের সময়। কারণ জন্মের সময় তাঁর শরীরের বেশ কয়েকটি জায়গায় কোনো চামড়া ছিল না।

‘যখন একজন সেবিকা আমার শরীর থেকে একটি মনিটরের বাটন সরিয়ে নিতে গেলেন আর শরীরের পুরো চামড়াটি উঠে এলো, তখন তাঁরা বুঝতে পারলেন কোনো একটা বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে,’ লুসি বলছিলেন বিবিসির রেডিও ওয়ান নিউজবিটকে।

 

এটা যেন ছায়ার মতো

আমার সঙ্গে যেন আমার ছায়ার মতো বেড়ে উঠতে থাকে ইবি রোগটি। বললেন লুসি।

‘যখন আমি আমার নাম জানলাম, একই সময়ে আমি এটাও জানলাম যে  আমি জীবনসীমায় রয়েছি।’ কিন্তু নিজের অবস্থার কারণে জীবনকে নেতিবাচকভাবে দেখার পরিবর্তে লুসি বরং ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করলেন। এই  রোগে আক্রান্তদের জন্য একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠলেন লুসি। সচেতনতা তৈরিতে কাজ শুরু করলেন। ম্যাগাজিনে সাক্ষাত্কার দেওয়া, সচেতনতা তৈরি করা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি প্রথম উপন্যাস লেখার কাজও শেষ করেছেন লুসি।

রোগটির কারণে ছোটবেলায় তাঁকে স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিতে হয়েছে, যা তাঁকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে।

‘আমি স্কুল ভালোবাসতাম। আমি অদ্ভুত একটা বাচ্চা ছিলাম। এতটাই মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে ভেবেছিলাম, হয়তো কখনোই আর কিছু শিখতে পারব না।’

‘কিন্তু দেখলাম, ইবি আমার শেখার পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।’ নিজের ছবি ইনস্টাগ্রামেও পোস্ট করেন লুসি। তিনি বলেন, এ রোগ নিয়ে টিকে থাকা অন্য মানুষের সঙ্গে সংযোগের জন্য এটা একটা বিশাল মাধ্যম।

‘একজন কিশোরী হওয়া কঠিন একটি সময়। কিন্তু এ ধরনের একটি রোগ থাকা, যা আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়, সেটাকে আরো কঠিন করে তোলে।’ লুসি বললেন।

‘সুতরাং কোনো কিশোর-কিশোরী যদি তাদের মতো সমস্যায় থাকা কাউকে মিডিয়ায় দেখতে পায়, তাহলে সেটি তাদের সাহায্য করে।’ এখন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষজনের বার্তা পান, যাদের তাঁর মতো একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। ‘প্রতিদিন সকালে উঠে মানুষের ধন্যবাদ বার্তা পাই, যা আমার হূদয় পূর্ণ করে তোলে।’

 

তারা সবাই চমত্কার লোক

লুসির এই আচরণ ইবি কমিউনিটিতে একেবারে নতুন নয় বলে জানালেন ক্যারোলিন কলিন্স, ইবি বিষয়ক দাতব্য সংস্থা ডেবরার গবেষণা বিভাগের প্রধান। ‘আমার দেখা সবচেয়ে ইতিবাচক এবং অগ্রসর তরুণ মানুষের মধ্যে তারা অন্যতম।’ তিনি বললেন। ‘যখন দেখি তাদের অনেকে স্কুলে যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, চাকরিবাকরি করছে এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও সাধ্যমতো সেরা জীবন যাপন করছে, আমি অবাক হয়ে যাই। তারা সবাই চমত্কার মানুষ।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইবি আক্রান্তদের জীবন সংক্ষিপ্ত করে দেয়। এখন রোগটির তিনটি ধরন রয়েছে। লুসি এ রোগের যে ধরনটিতে ভুগছেন সেটি হলো, ডিসট্রফিক ইবি, এর লক্ষণগুলো ছোট আকার থেকে অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে চরম হলো জংশনাল ইবি, যা অত্যন্ত বিরল।

সামনের সপ্তাহে বিশ্বের ইবি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছেন ক্যারোলিন, যা এ ধরনের সম্মেলনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। লুসিও যোগ দিচ্ছেন। ক্যারোলিন বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমরা অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। কিন্তু এই খাতে আরো অনেক গবেষণার দরকার। যেহেতু এটা বংশগত বিষয়, তাহলে হয়তো বংশগত কিছু চিকিত্সায় এর সমাধানও আমরা পেতে পারি—যেসব চিকিত্সার জন্য সবাই স্বপ্ন দেখছেন।’

‘ইবির কিছু ধরন কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। অন্য রোগীরা হয়তো ২০, ৩০ বা ৪০ বছর পর্যন্ত জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন।’ কিন্তু লুসির কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেওয়া। ‘তাদের কাছে অনেক কাজের একটি তালিকা আছে। এ বছরই সচেতনতা তৈরিতে আমি আরো অনেক বেশি কাজ করতে চাই। অনেক ইন্টার্নশিপের জন্যই আমাকে আবেদন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে আমার মাস্টার্স ডিগ্রিটাও শেষ করতে চাই। এটা যদি আমার ওপর নির্ভর করত, তাহলে সারা জীবন আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতাম।’

(ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা