kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

[অদম্য মানুষ]

হাফিজুর হারেননি

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাফিজুর হারেননি

এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বসে টি-শার্ট বিক্রি করেন হাফিজুর

জন্মগতভাবেই হাত ও পা বিকল। অন্যের সাহায্য ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারেন না। সেই হাফিজুর রহমান মুখ দিয়ে লিখেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে ডিগ্রিও নিয়েছেন তিনি। অদম্য এই তরুণের সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মাসুদ রানা

১৯৯৩ সালে বগুড়ার ধুনট উপজেলার বেলকুচি গ্রামে জন্ম হাফিজুরের। বাবা মফিজ উদ্দিন কৃষক, মা ফিরোজা বেগম গৃহিণী। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি। জন্মগতভাবেই তাঁর দুই হাত অচল। পা দুটিও খর্বকায়। হাঁটাচলা করতে পারেন না; কিন্তু একসময় পা দিয়ে লিখতেন তিনি। আর ১০টি শিশুর মতো ছয় বছর বয়সেই স্কুলে যাওয়া হয়নি। বাবার কাছে বর্ণমালা শিখেছেন। একসময় তাঁর সাধ জাগে পড়াশোনা করার। হাফিজুরের বয়স তখন প্রায় ১০ বছর। ছেলের পড়ালেখায় আগ্রহ দেখে বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে ভর্তি করে দেন; কিন্তু তাঁর পক্ষে একা স্কুলে যাওয়া-আসা সম্ভব ছিল না। পরে সাইকেলের বিয়ারিং দিয়ে বাবা তাঁকে একটি ছোট্ট গাড়িমতো বানিয়ে দেন। সেটিতে রশি বেঁধে টেনে সহপাঠীরা তাঁকে স্কুলে আনা-নেওয়া করত। একেক দিন একেকজন সহপাঠী হাফিজুরকে যেতে-আসতে সাহায্য করত। মাঝে মাঝে তাঁর বাবাও স্কুলে নিয়ে যেতেন।

স্কুলে আসা-যাওয়ার এই কষ্ট দেখে শিক্ষকরা তাঁকে বাড়িতে লেখাপড়া করার পরামর্শ দেন। এর পর থেকে হাফিজুর বাড়িতে বসে লেখাপড়া করেন। তবে পরীক্ষার সময় স্কুলে যেতেন। এভাবে প্রাথমিকের পাঠ চুকান; কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির আগে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এত দূরে স্কুল, প্রতিদিন যাওয়া-আসা করবেন কিভাবে—এই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসে। তবে স্যারদের আশ্বাসে দুশ্চিন্তা কাটে। ভর্তি হন ধুনট এন ইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতেন। সহপাঠীরা ক্লাস করে এলে তাদের থেকে পড়া বুঝে নিতেন। শুধু পরীক্ষার সময় স্কুলে যেতেন হাফিজুর। একসময় মুখ দিয়ে ছবি আঁকা শিখে ফেলেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নতুন চিন্তা আসে হাফিজুরের মাথায়। একদিন তিনি ভাবলেন, পা দিয়ে লিখতে গেলে খাতায় ময়লা লেগে যায়। মাঝে মাঝে কলমও নষ্ট হয়ে যেত। তা ছাড়া কয়েক শব্দ লেখার পর পা সরাতে গেলেও সমস্যায় পড়তে হতো। তখন ভাবলেন, মুখ দিয়ে লেখা যায় কি না। যেই ভাবা সেই কাজ। দাঁত দিয়ে কলম ধরে লেখার চেষ্টা করলেন। প্রথম প্রথম ভীষণ কষ্ট হতো; কিন্তু হাফিজুর হাল ছাড়ার পাত্র নন। একসময় ঠিকই লেখা আয়ত্তে চলে আসে। এভাবে মুখ দিয়ে কলম ধরে লিখেই ২০০৯ এসএসসিতে জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। তারপর ভর্তি হন ধুনট ডিগ্রি কলেজে। তখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাঁকে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দেয়।

ধুনট ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১১ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৩.৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন হাফিজুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাননি। দুটি গাইড কিনে বাড়িতেই প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে যান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হন। ধারদেনা করে ভর্তির টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল তাঁকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যে আনন্দ ছিল, ভর্তির পর সেটা যেন দুঃখে রূপ নেয়। অচেনা এই ঢাকা শহরে তাঁকে দেখার কেউ নেই। সেখানে তিনি কিভাবে পড়ালেখা করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। কারণ একে তো নিজে একা চলতে পারেন না, অন্যদিকে আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। তিনি তাঁর বিভাগের চেয়ারম্যানকে সব খুলে বলেন। পরে শুধু উদ্বোধনী ক্লাসে উপস্থিত থেকেছেন। তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত আর ক্লাস করা হয়ে ওঠেনি। বাড়ি থেকে এসে শুধু পরীক্ষা দিতেন। পরীক্ষার সময় সহপাঠীদের মেসে থাকতেন।

তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির গবেষণা শাখায় সমন্বয়কারী হিসেবে খণ্ডকালীন চাকরি পান। এ সময় থেকে তাঁকে দেখাশোনা করতেন তাঁরই ভাতিজা মোহাম্মদ ইব্রাহিম। হুইলচেয়ার ঠেলে ইব্রাহিম তাঁকে ক্লাসে আনা-নেওয়া করতেন। তখন তিনি উত্তরায় থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ক্যাম্পাসে আসতেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক এবং ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন হাফিজুর।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে চাকরিটা চলে গেল। তখন বগুড়ায় ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। হাতে ১৫ হাজারের মতো টাকা ছিল। এই পুঁজি দিয়েই ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি ক্যাম্পাসে টি-শার্ট, ব্যাগ বিক্রি শুরু করেন। এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বসে টি-শার্ট বিক্রি করেন। পাশাপাশি চাকরি প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

২০১০ সালে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে তাঁর জাপানে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে একটি প্রগ্রামে সাত দিন ছিলেন। তিনি কম্পিউটার চালাতে পারেন। নিজের মুখে কাঠি নিয়ে টাইপিংও করতে পারেন। হাফিজুরের ইচ্ছা একটি গণপাঠাগার করার। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে একটি সংগঠন করার পরিকল্পনা আছে তাঁর।

ছবি : লেখক ও তানভীর আহমেদ পাটোয়ারী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা