kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

[আরো জীবন]

আজও সুমির কান্না ফুরোয়নি

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আজও সুমির কান্না ফুরোয়নি

প্রতিকী এ ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেয়া

সৌদি আরবে নির্মম নির্যাতনের শিকার সুমির কথা মনে আছে? মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিওতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজেকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছিলেন। গত বছরের ১৫ নভেম্বর সরকারিভাবে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সুমি এখন কেমন আছেন, দেখতে গিয়েছিলেন লুত্ফর রহমান

চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় সুমি আক্তার। বাবা দিনমজুর। মা গৃহিণী। অর্থাভাবে জেএসসির পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি। ২০১৭ সাল। পরিবারের দুঃখের বোঝা কিছুটা হালকা করতে চলে যান ঢাকায়। ঠিকানা গাজীপুরে পোশাক শ্রমিক মামা হাসান আলীর বাড়ি। মামি শরিফা খাতুনের সঙ্গে সেখানকার এক সোয়েটার কারখানায় কাজ শুরু করেন। শুরুতে ভালোই চলছিল। এর মধ্যে সুমির মামি আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার নুরুল ইসলামের (৪২) সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। নুরুল ইসলামের দেওয়া একটি মোবাইল ফোনও সুমিকে দেন শরিফা। ফোনটি যে অন্যের দেওয়া তা জানা ছিল না সুমির। সুমিকে ফোনে বিরক্ত করত নুরুল। একদিন মামাবাড়ির সামনের রাস্তা থেকে তাঁকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায় নুরুল। প্রায় আট দিন আশুলিয়ায় এক বাড়িতে আটকে রেখে সুমিকে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। কারো সঙ্গে যেন যোগাযোগ করতে না পারেন সে জন্য মোবাইল ফোনটিও কেড়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সুমি জানতে পারেন নুরুল আগেই বিয়ে করেছেন। সেই সংসারে দুই সন্তানও রয়েছে। যদিও আগের স্ত্রী মারা গেছেন।

 

জলে ভাসা পদ্ম আমি

নুরুল ইসলাম মাদকচক্রসহ বিভিন্ন অপরাধকর্মে জড়িত ছিলেন। একাধিক মামলাও ছিল তাঁর নামে। বিয়ের কয়েক দিনের মাথায় এক মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। কিছুদিন পর জামিন মেলে। এরই মধ্যে নিয়তির লিখন মেনে নুরুলের সংসার করতে থাকেন সুমি; কিন্তু স্বামী তাঁকে বিদেশ যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। রাজি না হলে মারধর করে প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সুমি রাজি হন। তিনি তখন ১৫ বছরের কিশোরী; কিন্তু তাঁকে ২৫ বছর বয়স দেখিয়ে এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন নুরুল। ২০১৯ সালের ৩০ মে রূপসী বাংলা ওভারসিজের মাধ্যমে তাঁকে সৌদি পাঠানো হয়। কথা ছিল নার্সের ভিসায় সৌদি যাবেন সুমি; কিন্তু তাঁকে পাঠানো হয় গৃহকর্মী হিসেবে। সৌদিতে পৌঁছার কয়েক দিনের মধ্যেই সুমি বুঝতে পারেন, তিনি এক প্রকার বিক্রি হয়ে গেছেন। দিনকয় পার হতেই শুরু হয় নির্যাতন।

 

আমি বন্দি কারাগারে

রিয়াদে এক মালিকের বাড়িতে ঠাঁই হয় সুমির। আলাদা একটি ঘরে রাখা হতো তাঁকে। ওই বাড়িতে মোট ১০ জন থাকত। এর মধ্যে ছয়জন যুবক, দুজন মেয়ে ও বাড়ির মালিক এবং তাঁর স্ত্রী। রান্নাবান্না, ঘরদোর মোছা, বাথরুম পরিষ্কার থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজই করতে হতো; কিন্তু ঠিকমতো খেতে দিত না। খাবার বলতে দিনের মধ্যে শুধু বিকেলে দুটি রুটি। রান্নায় একটু এদিক-সেদিক হলেই চড়-থাপড় তো ছিলই, কখনো হাতে গরম তেল ঢেলে দিত, কখনো আবার ছোট হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হতো। সুমি যে ঘরে থাকতেন সেখানে ওই বাড়ির নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। বাড়ির মালিকসহ বাকি ছয় যুবক দিনের পর দিন সুমির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাত। টুঁ শব্দ করলেই মারধর জুটত কপালে। নির্মম অত্যাচার সইতে না পেরে দেশে ফেরার জন্য কান্নাকাটি শুরু করেন। ফলে তাঁকে ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে রাখা হয়। টানা ১৫ দিন একটা ঘরের মধ্যে বন্দি ছিলেন। সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটিও নিয়ে নিয়েছিলের বাড়ির মালিক। পরে খুব কাকুতিমিনতি করে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলবেন বললে কয়েক মিনিটের জন্য মোবাইল ফোনটি সুমিকে দেন। সেই ফোন নিয়ে বাথরুমে ঢোকেন সুমি। সেখানেই নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে নিজেকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওতে সুমি বলেন, ‘ওরা আমারে মাইরা ফালাইব। আমারে দেশে ফিরাইয়া নিয়া যান। আমি আমার সন্তান ও পরিবারের কাছে ফিরতে চাই। আমাকে আমার পরিবারের কাছে নিয়ে যান। আর কিছুদিন থাকলে আমি মরে যাব।’

রিয়াদের ওই মালিকের অধীনে চার মাস কাজ করেছিলেন সুমি; কিন্তু মোটে এক মাসের ভাতা মেলে। সে টাকাও সুমির হাতে আসেনি। ওই মালিক বাংলাদেশে থাকা তাঁর স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেন।

 

টানা ১৫ দিন বন্দি ছিলেন

এদিকে টানা ১৫ দিন বন্দি থাকার পর রিয়াদের ওই মালিক সুমিকে অন্য এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন ২২ হাজার রিয়ালে। ইয়েমেন সীমান্ত এলাকায় নাজরানের ওই মালিকের বাড়িতেও একই কায়দায় নির্যাতন চলে। নির্যাতনের একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো মালিকই তাঁর চিকিত্সা পর্যন্ত করাননি।

 

ভিডিও ভাইরাল হলো

এর মধ্যেই সুমির ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি গণমাধ্যমে বেশ ফলাও করে প্রকাশ পায়। নজরে আসে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মাধ্যমে গত ১৫ নভেম্বর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ওই দিনই ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রতিনিধিরা বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সুমিকে তাঁর মা-বাবার হাতে তুলে দেন। এখন সুমি তাঁর বাবার বাড়িতেই রয়েছেন।

 

এখন তিনি কেমন আছেন

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের বৈরাতি সেনপাড়া এলাকায় সুমিদের বাড়ি। রাস্তা থেকে নেমে কিছুদূর গেলেই দেখা যায় টিনশেড ঘর, চারপাশে টিনের বেড়া। বাড়িতেই পাওয়া গেল তাঁকে। পরনে কালো বোরকা, চোখেমুখে একরাশ হতাশা। উদাস নয়নে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন। পরে আমাদের বসতে দিলেন।

দেশে ফেরার আগেই ভাইরাল হয়েছিল সুমির কান্না। বাড়ি ফেরার পর থেকেই তাঁকে দেখতে আসতে থাকে উত্সুক লোকজন। একেকজনের বেমক্কা প্রশ্নে টিকে থাকাই দায়। লোকজনের উত্পাতে একসময় বাড়ির দরজা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বাধ্য হন সুমির মা-বাবা। এখন উত্পাত কিছুটা কমেছে। এরই মধ্যে প্রায় মাস দুয়েক পার হয়েছে। শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন সুমি; কিন্তু চোখের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। কর্নিয়ার সমস্যার কারণে দেখতে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া মাঝে মাঝে চোখ ব্যথা করছে, ফুলে যাচ্ছে; কিন্তু টাকার অভাবে চিকিত্সা করাতে পারছেন না।

মানসিক ধকল এখনো কাটেনি। সৌদিতে নির্যাতনের দিনগুলোর ভয়াবহতা তাঁকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। বলতে গেলে সারা দিন ঘরের চার কোণেই কাটছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নিকটাত্মীয়দের বাড়িতেও যান না। মন চাইলে কোথাও ঘুরতে যাবেন সে উপায়ও নেই। বাইরে বের হলেই লোকজন বাঁকা চোখে তাকায়, নানা অযাচিত মন্তব্য করে। দেশে ফেরার পর স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল; কিন্তু পরে কিছুই মেলেনি।

তাঁর মতে, দেশে ভিক্ষা করে খাওয়াও ভালো। তা-ও যেন কেউ সৌদি আরবে না যায়। সুমি বললেন,  খুব কষ্টে দিন কাটছে। মানুষের কটু কথার কারণে বাইরেও বের হতে পারি না। একটা চাকরি পেলে কোনোমতে দিন কেটে যেত। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চাই। সুমির বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, যারা এভাবে গৃহকর্মীদের নির্যাতন করে, তাদের এ দেশীয় দালালদের যেন বিচার করা হয়। বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ হাসান বলেন, ‘সুমির চিকিত্সার জন্য একটি আবেদন আমরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করি তারা চিকিত্সার ব্যবস্থা করবে।’

 

সুমির কান্না নাড়া দিয়েছিল অনেককে। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল মানুষ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা