kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

[উদ্যমী বাংলাদেশ]

রাজার চা

আজহার উদ্দিনকে সবাই রাজা নামে চেনে। বিমানবন্দর রেলস্টেশনের পাশেই রাজা মামার চায়ের দোকান। চায়ের জন্যই তিনি বেশি চেনা। সেই রাজার সঙ্গে কথা বলেছেন বিনয় দত্ত

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজার চা

রাজার জন্ম ১৯৮১ সালে। ময়মনসিংহের ত্রিশালের নওধার গ্রামে। অভাবের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। রাজার বাবা আলীম উদ্দিন জানতেন না কিভাবে অভাব থেকে রেহাই মিলবে? দুই ভাই-চার বোনের বড় সংসার। আলীম উদ্দিনই একমাত্র রোজগেরে। পড়াশোনার চিন্তা করাটাও ছিল বিলাসিতা।

 

প্রথমবার ঢাকায়

রাজার মামা শাহজাহানের ঢাকায় যাতায়াত ছিল নিয়মিত। কিছু লোকের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। একজন যেমন কর্নেল সাহেব। তাঁর বাসায় কাজে লাগেন রাজা। পাশাপাশি পড়াশোনাও করতে থাকেন। আলীম উদ্দিন প্রতি মাসে এসে টাকা নিয়ে যেতেন। রাজার দেখতে ভালো লাগত যে বাবা কিছু টাকা পাচ্ছেন। তবে তাঁর বেশি বেশি আসায় বিরক্ত হন কর্নেল সাহেবের স্ত্রী। রাজাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেন।

 

গরু দেখাশোনার কাজ নিল

এক-দেড় বছর কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজা ঢাকা ছাড়েন। আলীম উদ্দিন পরে আর ছেলেকে কাজে দিতে চাননি। তিনি বলতেন, ঘরের ছেলে ঘরেই থাকবে; কিন্তু রাজার তাতে সায় ছিল না। তিনি জানতেন, এতে বাবার ওপর চাপ পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই রাজা ত্রিশালে কুদ্দুস নামের এক লোকের দুটি গরু দেখাশোনার কাজে লেগে যান। গরু দেখার ফাঁকে ফাঁকে রাজা চাষাবাদের কাজও করতেন। এর মধ্যে কুদ্দুসের দুটি গরু মারা যাওয়ার পর আবার রাজা কর্মহীন হয়ে পড়েন। আবার কাজের খোঁজে লাগেন রাজা; কিন্তু কোনো কাজই মেলাতে না পেরে কাঠ কুড়িয়ে তা বিক্রি করতে থাকেন। সেই টাকা রাজা তাঁর মায়ের হাতে তুলে দেন। ছেলের কষ্ট দেখে কেঁদে ওঠেন মা । কাঠ কুড়াতে কুড়াতেই রাজা নতুন একটা কাজের সন্ধান পান। 

 

ত্রিশালের বাসে বাসে

তখন ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড খুব ব্যস্ত ছিল। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সব বাসই থামত এখানে। আর এই ফাঁকে হকাররা নিজেদের পসরা নিয়ে উঠে পড়ত বাসে বাসে। রাজাও পান, সিগারেট, জিঞ্জার, চকোলেট ইত্যাদি বিক্রি করতেন। ত্রিশালের পানের দোকান থেকে ৫০ পয়সায় পান কিনে তা এক টাকায় বিক্রি করতেন রাজা। পানের সঙ্গে সুপারি, জর্দাও থাকত। এই করে দিনে রাজা ২০-২৫ টাকা আয় করতেন। সেই টাকা বাড়িতেই দিতেন রাজা। সেই সঙ্গে চেষ্টা করতেন রোজগার বাড়াতে। এই করতে করতে রাজা ত্রিশালে একটা চায়ের দোকান দেন। পাশাপাশি বাসে বাসে জিনিসপত্র বিক্রি করাও চালিয়ে যান।

 

গন্তব্য ঢাকার বিমানবন্দর

ভ্রাম্যমাণ হকার পরিষদের একটি বিশেষ পদে ছিলেন বাচ্চু। ঢাকায় এক সমাবেশে দেশের সব ভ্রাম্যমাণ হকার মিলিত হয়। রাজাও আসেন। সেই সমাবেশেই বাচ্চুর সঙ্গে পরিচয়। বাচ্চু রাজাকে ঢাকায় আসতে বলেন। রাজা আবার ঢাকায় আসেন। সেই বিমানবন্দর এলাকায়ই। রাজা বরই বিক্রি করা শুরু করেন। রাজা তখন বিমানবন্দর এলাকার পাবলিক টয়লেটের ছাদে রাত কাটাতেন।

দু-একবার বিমানবন্দর এলাকার রেলস্টেশনে থাকার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু তার জন্য আলাদা টাকা দিতে হতো। তত দিনে কিন্তু সংসারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে। তাই বাড়তি টাকা খরচের কোনো সুযোগই ছিল না রাজার। একসময় বেলায়েত সরকার নামের একজনের সঙ্গে পরিচয় হয় রাজার। রাজাকে তিনি বিদেশে নিয়ে যেতে চান; কিন্তু বিদেশ যেতে যে অনেক টাকার দরকার। বেলায়েত তখন জানান, রাজাকে এখনই কোনো টাকা দিতে হবে না। বিদেশে চাকরি পেয়ে বেতন হলে তার থেকে কেটে নেবেন। রাজা রাজি হন। অভাব থেকে মুক্তি মিলবে—এই আশায় বিদেশের পথে পাড়ি জমান রাজা।

আবার স্বদেশ

আবুধাবিতে নেমেই বুঝতে পারেন রাজা, তিনি গলাকাটা পাসপোর্টে বিদেশে এসেছেন। রাজা একটি হোটেলে কাজ ও থাকার জায়গা পান। বাইরে বেরোনোর কোনো সুযোগ নেই তাঁর। হোটেলের অতিথিকক্ষের বেডশিট, বালিশের কাভার, পর্দা—সব কিছুই রাজাকে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হতো। এই কাজে আরো যারা ছিল, তাদের হাতে ঘা হতে দেখে ভয় পান রাজা। হোটেলের রান্নাঘরে ভারতীয় ও পাকিস্তানি শেফরা কাজ করতেন। তাঁদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন রাজা। তাঁদের দেখে দেখে চা বানানোর কৌশল রপ্ত করেন। এভাবে চার-পাঁচ মাস চলে যায়। একদিন রাজা পালিয়ে হোটেল থেকে বের হন। এক লোকের কাছ থেকে খাবার চেয়ে খান। তারপর ধরা পড়েন আবুধাবি পুলিশের হাতে। পুলিশ তাঁকে দেশে পাঠিয়ে দেয়।

 

বিশ্বাসই হতে চাইছিল না

দেশে পা দিয়ে রাজার প্রথমে বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। বারবার লোকদের জিজ্ঞেস করেছেন এটা কোন জায়গা? শেষে আশ্বস্ত হওয়ার পর প্রাণভরে শ্বাস নিয়েছিলেন। কোনো দিকে না তাকিয়ে রাজা সোজা ত্রিশাল নিজের বাড়ি চলে যান। দেশে আসার কিছুদিন পর থেকেই আবার নতুন করে কিছু করার কথা ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে আবার ফিরে আসেন ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায়। এবার তিনি গাড়ি ধোলাই মানে কার ওয়াশ করার কাজ নেন। এ সময়ই ত্রিশালের মেয়ে জুয়েনা সুলতানাকে বিয়ে করেন।

 

রাজার রাজা হয়ে ওঠা

ছোটবেলা থেকেই মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায় এমন কোনো কাজ করতে চাইতেন রাজা। বুঝতে পারেন, চায়ের দোকান এর উপায় হতে পারে। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি রাজা বিমানবন্দর এলাকায় চায়ের দোকান দেন। প্রথমে রাজা পাঁচ টাকায় চা বিক্রি করতেন। শুরুতে মাল্টা চা, কালিজিরা চা, তেঁতুল চা আর নরমাল দুধ চা বিক্রি করতেন। পাশাপাশি আবুধাবিতে শেখা রেসিপি দিয়ে কিছু স্পেশাল চা বানাতে শুরু করেন। সেসব চা ক্রেতারা সানন্দে গ্রহণ করে, বিশেষ করে তাঁর কাজুবাদামের চা এবং ইন্ডিয়ান মাসালা টি জনপ্রিয় হয়। কাজুবাদামের চায়ের মধ্যে কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, হরলিকস, ম্যাটকফি, ব্ল্যাক কফি, কিশমিশ, চিনি, গুঁড়া দুধ, কনডেনসড মিল্ক দেন। একইভাবে ইন্ডিয়ান মাসালা টিও বানান অনেক উপাদান দিয়ে। ইন্ডিয়ান মাসালা টিতে তেজপাতা, এলাচি, লবঙ্গ, হরলিকস, গুঁড়া দুধ, কনডেনসড মিল্ক ও ম্যাটকফি ছড়িয়ে দেন। এক কাপ চায়ের দাম নেন ১৫ টাকা।

এখন রাজা দিনে চার থেকে সাড়ে চার শ কাপ চা বিক্রি করেন। নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর থেকেও ক্রেতা আসে শুধু রাজা মামার চা খাওয়ার জন্য। রাজার চায়ের বেশির ভাগ ক্রেতাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁদের ভালোবাসায় রাজা এখন সত্যিকারের ভালোবাসার রাজা হয়ে উঠেছেন।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা