kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

[ আরো জীবন ]

সাংবাদিকতার ৫৭ বছর

বিকেল ঠিক ৪টা। শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আহ্সান উল্লাহ হেঁটে রওনা দেন। বাসে উঠে যান ফার্মগেট। ফার্মগেট থেকে বাস পাল্টে পল্টন। এরপর হেঁটে ফকিরাপুল দৈনিক জনতার অফিস। সম্পাদনা শেষে কাগজ প্রেসে দিয়ে রাত ১১টায় বাড়ি ফেরেন। তাঁর গল্প বলছেন ফখরে আলম

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাংবাদিকতার

৫৭ বছর

প্রতিদিন তাঁর একই রুটিন। দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে। আহ্সান উল্লাহ একজন সাংবাদিক।  ১৯৬২ সালে ইত্তেফাক থেকে শুরু। এরপর বাংলার বাণী, ভারত বিচিত্রা, জনতা, বাসস হয়ে ফের দৈনিক জনতা। তিনি ১৯৭১ সালে হানাদারদের পুড়িয়ে দেওয়া ইত্তেফাক অফিসে বসে কাজ করেছেন।

 

যেভাবে বেড়ে ওঠা

মাগুরার শালিখা থানার শরুশুনা নামের সমৃদ্ধ গ্রামে ১৯৪০ সালে আহ্সান উল্লাহ নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। লেখক নিমাই ভট্টাচার্যসহ অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি ওই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন তাঁর মামা। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। বাবা মৌলভি মাহ্বুবুর রহমান বিএবিটির বাড়ি যশোর সদর উপজেলার কৈখালী গ্রামে। তিনি অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা বিভাগের উপপরিদর্শক ছিলেন। ছিলেন মুর্শিদাবাদ নবাব বাহাদুর ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। বাবার চাকরিসূত্রে আহ্সান উল্লাহ ছোটবেলায় কলকাতায় গিয়ে পার্ক সার্কাসে সাহেবদের এক স্কুলে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হন। একদিন টিচার বেত দেখালে তিনি আর স্কুলে যাননি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি যশোর শহরের পুরনো কসবা এলাকায় চলে যান। সেখানে গিয়ে স্থানীয় মুসলিম একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন ক্লাস থ্রিতে। ফাইভ পর্যন্ত পড়ে বাবার চাকরিসূত্রে নড়াইল গিয়ে বড়দিয়া স্কুলে ভর্তি হন। এখানে কিছুদিন পড়ার পর মা আনোয়ারা খাতুন তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যান। ঠাঁই হয় আজাদ পত্রিকার যুগ্ম বার্তা সম্পাদক মামা সিরাজুদ্দীন হোসেনের বাড়ি (১৯৭১ সালে  সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন শহীদ হন)। আহ্সান উল্লাহ ঢাকার গ্র্যাজুয়েট হাই স্কুল ও কেএল জুবলি হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন। ক্লাস নাইনে ওঠার পর আহ্সান উল্লাহ ফের যশোর ফিরে আসেন। ভর্তি হন সম্মিলনী ইনস্টিটিউটে। ১৯৫৯ সালে এখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৬০ সালে ভর্তি হন যশোর এমএম কলেজে। ১৯৬১ সালে আইএ পাস করে আবার ঢাকায় গিয়ে মামাবাড়ি ওঠেন। ১৯৬২ সালে বিএ পড়তে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। বিএ পড়ার সময়ই তিনি সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হন।

 

২৫০ টাকা বেতনে সাংবাদিকতা শুরু

আহ্সান উল্লাহ বললেন, ‘ইত্তেফাকে সাব-এডিটর পদে চাকরি নেই। বেতন ২৫০ টাকা। তখন ইত্তেফাকে ‘হ্যান্ড কম্পোজ’ ছিল। সিসার অক্ষর সাজিয়ে কম্পোজিটররা বাক্য তৈরি করতেন। আমি প্রুফ দেখতাম। অনুবাদ করতাম। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দেয়; এমনকি কামানের গোলাও ছোড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ইত্তেফাক। আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোড়া অফিস দেখতাম। এরপর হানাদারদের চাপে আবার ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আমি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।’ এরপর আহ্সান উল্লাহ ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফজলুল হক মনির ডাকে ‘বাংলার বাণীতে’ যোগ দেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ওই পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। ওই বছর তিনি ‘ভারত বিচিত্রা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনিই প্রথম এই পত্রিকার বাংলাদেশি সম্পাদক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮০-৮১ সালে তিনি ওই বিভাগ থেকে এমএ পাস করেন। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ভারত বিচিত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই বছরই তিনি দৈনিক জনতায় সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে দৈনিক জনতা বন্ধ হয়ে যায়। আহ্সান উল্লাহ পরে বাসসে চাকরি করেছেন। ২০০৪ সালে আবার দৈনিক জনতায় যোগ দেন বার্তা সম্পাদক হিসেবে। এখন তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক। সন্ধ্যা থেকে তিনি পত্রিকাটির সম্পাদনার কাজ করেন।

 

মালিককে ছাঁটাই করেছিলেন!

আহ্সান উল্লাহর শখ হচ্ছে বই পড়া। তাঁর সংগ্রহে পাঁচ হাজারেরও বেশি বই আছে। প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই লেখকের ১০ খণ্ডের রচনাবলি, রবীন্দ্রনাথের ২২ খণ্ডের রচনাবলি এবং শরত্চন্দ্রের রচনাবলিসহ খ্যাতিমান লেখকদের বই তিনি পাঁচটি আলমারিসহ ঘরের মধ্যে স্তূপ করে রেখেছেন। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বইয়ের পাতা ওল্টান। রাত ৩টার দিকে ঘুমাতে যান। বাসায় গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি দিনের বেলায়ও তিনি বই পড়েন। আহ্সান উল্লাহ বললেন, ‘একবার মালিক কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেন। আমাকেও ছাঁটাই করার গুঞ্জন শুনতে পেলাম। আমি রাগে মালিককে ফোন করে বলি, আপনাকে ছাঁটাই করলাম। এই বলে এক মিনিটের মধ্যে অফিস ছেড়ে চলে আসি।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমি সংবাদসংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো দিন কারো কাছ থেকে পাঁচ টাকাও নিইনি। এক কাপ চা-ও খাইনি। মিথ্যা কথা বলিনি। সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ যখন কোথাও বিচার না পায়, তখন সাংবাদিকের দ্বারস্থ হয়। তিনি তাকে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ দেখান।’ আহ্সান উল্লাহর দীর্ঘ জীবনের সাথি স্ত্রী নাজমা আরা। ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। বললেন, ‘মানুষের মধ্যে হানাহানি, মারামারি, ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার, দুর্ঘটনা তাঁকে ভাবায়।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা