kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

সরেজমিন

কার্তিকপুরের মৃৎশল্প

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম কার্তিকপুর। এ গ্রামের পাল বংশের লোকদের আদি পেশা মাটি দিয়ে কলস, টালি, মটকা, হাঁড়ি, পাতিল, বদনাসহ নানা তৈজসপত্র তৈরি করা। কুমার বা পালরা বংশপরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। আব্দুল আজিজ শিশির দেখে এসেছেন

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কার্তিকপুরের মৃৎশল্প

সিলভার, প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যে সয়লাব এখন বাজার। বেকার হয়ে পড়ছে মৃিশল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলো। কর্মহীন হয়ে অনেকেই চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাবে পড়েছেন মৃিশল্পীরা। এ ছাড়া অন্য কাজ তাঁরা জানেনও না। খেয়ে-না খেয়েই দিন কাটে তাঁদের। মাটির কলস, বাসন আর মটকার চাহিদা নেই বললেই চলে এখন। ‘তখন আমার বয়স ১৩ বা ১৪ বছর হবে। অভাব পিছু ছাড়ছিল না আমাদের। বাবা শান্তিরঞ্জন পালের সঙ্গে ছোটবেলায় টালি তৈরির কাজ করে মৃিশল্পে আমার হাতেখড়ি হয়’, বলছিলেন কার্তিকপুরের রঙ্গদীপ পাল।

রঙ্গদীপের পরিবার

মা-বাবা আর পাঁচ ভাই, এক বোনসহ আট সদস্যের পরিবার ছিল রঙ্গদীপ পালের। ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। পরিবারের সব সদস্য মিলে তখন মাটির টালি তৈরির কাজ শুরু করেন। তবে টালির চাহিদাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। কোনোমতে খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটছিল তাঁদের। এটা আশির দশকের কথা। এর মধ্যে দিদি অনুরাধা পালের বিয়ে হয়ে যায়। তখনো অভাব লেগেই ছিল। আশির দশকের শেষ দিকে দিদি অনুরাধা পালের ভাশুর মরণ চাঁদ আসেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি ঢাকায় চারুকলার শিক্ষক। তাঁর পরামর্শে মাটির টেরাকোটা, টাইলস, মোমদানি, ফুলদানি, ফুলের টব, নাইট ক্যান্ডেল, কয়েন বক্স, ক্যাকটাস টব, ওয়াল প্লাস্টার, ওয়াল টব, কলমদানি, ভিজিটিং কার্ড বক্স,  মা মেরির মূর্তি, ক্রিসমাস হ্যাংগিং রিংসহ ৩০০ ধরনের শোপিস তৈরি করে রঙ্গদীপ পালের পরিবার। পণ্যগুলো প্রথমে দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে পরে দেশের গণ্ডি ছাড়ায়। রঙ্গদীপ পালের দেখাদেখি আরো দুটি মৃিশল্পের কারখানা গড়ে উঠেছে কার্তিকপুরে। একটি মথুরা মোহন পালের পুত্র জওহরলাল পালের, অন্যটি কালাচান পালের পুত্র উত্তম পালের। রঙ্গদীপ পালের ভাই সমীর পাল, সন্দ্বীপ পাল আর গোবিন্দ পালও নিয়মিত কাজ করছেন। কার্তিকপুরের শিল্পসম্ভার এখন ইউরোপ, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ায়ও আদর পাচ্ছে।  উল্লেখ্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) কারিতাসের CORR The Jute work প্রকল্প, হিড বাংলাদেশ, উষা হ্যান্ডিক্রাফটস, ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফটস এবং আড়ং কার্তিকপুরের মৃিশল্প পল্লীতে এসে পছন্দমাফিক পণ্য তৈরির কথা বলে। কার্তিকপুরের শিল্পীরা সেগুলো তৈরি করে দেন। তারাই দেশের বাইরে ছড়িয়ে দেয় পণ্যগুলো।

নিজের বানানো শিল্পকর্ম হাতে রঙ্গদীপ পাল

 

যেভাবে তৈরি হয়

প্রথমে দো-আঁশ মাটি সংগ্রহ করা হয়। এই মাটি পানির সঙ্গে মিশিয়ে তরল করা হয়। পরে জার্মানি থেকে আমদানি করা বিশেষ ধরনের জালি বা নেট দিয়ে ছাঁকা হয়। এরপর ২০ দিন পর্যন্ত বিশেষ পাত্রে ঝুলিয়ে রেখে পানি ঝড়ানো হয়। পানি ঝড়া শেষ হলে তৈরি হয় মণ্ড। এই মণ্ড রোদে শুকিয়ে তা আবার পানি মিশিয়ে নরম করে নকশা অনুযায়ী মূল পণ্য তৈরি করা হয়। তৈরি কাঁচা পণ্য সরাসরি রোদে বা আগুনে শুকানো যায় না। এগুলোকে মাচা করে ঘরের ভেতরে ১০-১২ দিন পর্যন্ত রেখে শুকাতে হয়। শুকানো পণ্যের গায়ে স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা রং মেখে বিক্রির উপযোগী করে তোলা হয়। মৃিশল্পী সন্দ্বীপ কুমার পাল জানান,  বংশপরম্পরায় তাঁরা মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য নির্মাণ ও বিক্রি করেন। ১৯৭৬ সালে প্রথম তাঁরা মাটির তৈরি নিত্যনতুন পণ্য তৈরি করেন। বিক্রি শুরু করেন ঢাকা ও চট্টগ্রামে। পাশাপাশি মেলাগুলোতেও অংশ নিতেন। এর পর থেকে তাঁদের নির্মিত পণ্যের মান দেখে ক্রমেই তাঁদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় কয়েকটি সংস্থা। তাঁদের তৈরি পণ্যগুলো ওই সব সংস্থা দেশের বড় বড় প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করে এবং বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

সন্দ্বীপ কুমার পাল বলেন, ‘বড় ভাই সমীর কুমার পাল ভারতে থাকেন। সেখান থেকে বিভিন্ন বিদেশি ডিজাইন সংগ্রহ করে পাঠালে সে অনুযায়ী আমরা পণ্য তৈরি করি। ঢাকার যেসব প্রতিষ্ঠান আমাদের থেকে পণ্য বানিয়ে নেয় তারা বছরে প্রায় ২০-৩০ লাখ টাকার আদেশপত্র দেয়। আরো দুটি ফ্যাক্টরিসহ এই পল্লী থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকার মৃত্পণ্য তৈরি করে সরবরাহ করা হয়।’

রঙ্গদীপ পাল বলেন, ‘আমাদের চার ভাইয়ের যৌথ পরিবার; মৃিশল্প বানিয়ে মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় করি। ৪০ বছর যাবত্ এ কাজ করে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সুনাম অর্জন করেছি। অনেকবার ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সনদও পেয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, এ ব্যবসা করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। এ জন্য ঢাকায় অফিস বা শোরুম থাকতে হয়। বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারলে আরো বেশি পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। আর এ জন্য সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা