kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

বাঙালির বিশ্বদর্শন

গুইলিনে পাহাড় নদীর হাতছানি

ফাতিমা জাহান    

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুইলিনে পাহাড় নদীর হাতছানি

চীনের গোয়াংজি রাজ্যের গুইলিন শহরে ট্রেন যখন থামল, তখন বাজে রাত ৩টা। হোটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল। ট্রেনে সহযাত্রীরা জানালেন, এত রাতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই ট্যাক্সি নিয়ে যাওয়াই ভালো। ট্রেন থেকে নেমেই দেখলাম স্টেশনে একদল পুরুষ ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে একজন নারীও মাঝরাতে কাজ করছেন। ট্যাক্সি ধরে চললাম হোটেলের উদ্দেশে। ট্যাক্সির জানালা দিয়ে দেখলাম সুনসান রাস্তায় একটি কুড়ি-বাইশ বছরের মেয়ে ফুটপাত ধরে চলতে চলতে নিজ মুঠোফোনে কাকে যেন টেক্সট করছেন। তাঁর হাঁটার গতি ছিল ধীর আর চোখেমুখে ছিল না কোনো উদ্বেগের ছাপ। শহরটা যে নিরাপদ তার প্রমাণ পেতে দেরি হলো না। 

গুইলিন বিখ্যাত এর অপরূপ সারিবদ্ধ পর্বতমালার জন্য। মাঝরাতে পৌঁছেছি বলে আমার অ্যাপার্টমেন্টের হোস্টকে ফোন করে ডেকে ওঠাতে হলো। এ দেশে অ্যাপার্টমেন্টের একটা রুম অনেকেই ভাড়া দেন। কম খরচ আর চীনা পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারব ভেবে অ্যাপার্টমেন্টের রুম ভাড়া করলাম, যাকে বলে হোম স্টে। অ্যাপার্টমেন্টের হোস্ট নিচে নেমে এলেন আমাকে ওপরে নিয়ে যেতে। যে পদ্ধতিতে ওপরে গেলাম সেটায় আধো ঘুমে কিছুই মনে থাকবে না বলে লিখে নিলাম। নিচের প্রধান ফটকে নম্বর লক। টুকে নিলাম। তারপর ২৪তলা অ্যাপার্টমেন্টের মূল ফটকের নম্বর কম্বিনেশন এবং শেষে নিজের রুমের দরজার নম্বর। অ্যাপার্টমেন্টের হোস্ট এক বর্ণ ইংরেজি জানেন না। তিনি ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্টের নিচের অংশে থাকেন, আমাকে দিলেন ওপরের অংশে থাকতে। সব কথাই হচ্ছিল ইশারা-ইঙ্গিতে। আমি যে দু-চার শব্দ ম্যান্ডারিন জানি, তা প্রয়োগ করি চীন ভ্রমণের সব জায়গায়। তেমন অসুবিধা হয় না। এ দেশের মানুষ ভীষণ সত্ আর বন্ধুবত্সল। পরদিন শহর ভ্রমণে বের হলাম। প্রথম গন্তব্য জিয়াজিং প্রিন্সেস প্যালেস। ট্যাক্সি ধরে চললাম প্যালেসের দিকে মুগ্ধ হয়ে শহর দেখতে দেখতে। ১৩৯২ সালে মিং রাজবংশের রাজপুত্রের জন্য বিশালাকৃতির প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়। প্রাসাদটি নির্মাণে সময় লেগেছিল ২০ বছর। ১৪ জন রাজা এ প্রাসাদে অবস্থান করেছিলেন বংশানুক্রমে। বর্তমানে প্রাসাদটি চীনের প্রাচীন এবং সুসংরক্ষিত প্রাসাদগুলোর অন্যতম। এটি এখন গোয়াংজি নরমাল ইউনিভার্সিটিকে দেওয়া হয়েছে পাঠদান করার জন্য। ২০ হেক্টর আয়তনের প্রাসাদ প্রাঙ্গণে তখনকার আমলের সব সুযোগ-সুবিধা ছিল। পাহাড়ের গা বেয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে হয় মূল প্রাসাদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য। মূল প্রাঙ্গণের চারটি হলঘর, চারটি প্যাভিলিয়ন এবং প্রায় ৪০টি ভবন এখন মুখরিত গোয়াংজি নরমাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের কলকাকলিতে।

এলিফ্যান্ট ট্রাংক হিল। দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন একটি হাতি নিচু হয়ে নদীর জল পান করছে

 

ওপর থেকে গুইলিন শহরের কিয়দংশ দেখা যায়, পাশেই লি নদী প্রবাহিত হচ্ছে আপন মনে। পরবর্তী গন্তব্য রিড ফ্লুট কেইভ। এখানকার গুহাগুলো লাখো বছরের পাললিক শিলা জমে নির্মিত। প্রবাল, জীবাশ্ম, চুনাপাথর ইত্যাদি জমে গুহায় অসাধারণ ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। কোনোটা ওপর থেকে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে, কোনোটা বা নিচ থেকে ওপরে। কত ধরনের আকার! কোনোটা পদ্মফুল, তো কোনোটা মেঘমঞ্জরি। কোনোটা হাতি বা কোনোটা উটের মতো। কিছু গুহার ভেতরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। পর্যটকদের সুবিধার জন্য গুহার ভেতরে হালকা আলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেখানেও প্রকৃতির উদারতায় ভাস্কর্য ফুটে উঠেছে। এখানে প্রতি ঘণ্টায় মনোরম লাইট শো হয়। গুহা ভ্রমণ শেষ করে রেস্টুরেন্টে গেলাম স্থানীয় খাবার খেতে। তারকা হোটেলে সাধারণ মানুষের রন্ধনপ্রণালীর স্বাদ মেলে না। তাই যেকোনো শহর বা গ্রামে সেখানকার স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবার খুঁজে বেড়াই। বুফে সিস্টেমের খাবার, তাই ভিন্ন আইটেমের স্বাদও নেওয়া যায়। বেশির ভাগ খাবারই সিদ্ধ বা স্যুপজাতীয়। অসাধারণ। এরপর গেলাম এলিফ্যান্ট ট্রাংক হিল। তাওহুয়া ও লিজিয়াং নদীর মোহনায় অবস্থিত এ পাহাড়টি দেখলে মনে হবে যেন একটি হাতি নিচু হয়ে নদীর জল পান করছে। এলিফ্যান্ট ট্রাংক হিল গুইলিনের ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিত। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম শহরের পথে পথে। গুইলিন শহর এক বিশাল পর্যটনকেন্দ্র। সব কিছুই আধুনিক, সুউচ্চ দালান আর রাস্তায় সুশৃঙ্খল গাড়িবহর সভ্যতা আর উন্নয়নের ইশারা দেয়। অ্যাপার্টমেন্টের হোস্টকে আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম, আমি স্যুপজাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করি। রাতে হোস্ট, তাঁর স্ত্রী আর তাঁদের সাত বছর বয়সী কন্যার সঙ্গে ভালোই সময় কাটল। দ্বিতীয় দিন গেলাম লংশেং রাইস টেরেস দেখতে। এটি গুইলিন থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। বাসে করে গেলে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টার মতো। বাস যাত্রাটিও ছিল খুব আনন্দদায়ক। একে তো চীনা নই, তারপর আবার ম্যান্ডারিনও জানি না। বাসের লোকজন এক এক করে আমার সঙ্গে ছবি তুলল। বাসে একজন ভদ্রলোক ম্যান্ডারিনে সমানে আমার সঙ্গে কথা বলে যেতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর এক বর্ণও বুঝলাম না। ভদ্রলোক বাসের কোনো এক কোনা থেকে একটি মেয়েকে খুঁজে পেলেন, যে ইংরেজি জানে। মেয়েটিকে মাঝখানে বসিয়ে শুরু হলো আলাপ। মোটামুটি ছোটখাটো জটলা হয়ে গেল আমাদের চারপাশে। ভদ্রলোক যা-ই বলেন না কেন উপস্থিত জনতা হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছে। আমিও হাসি থামাতে পারছিলাম না। বাস মাঝে এক জায়গায় থামলে ভদ্রলোক অনেকটা জোর করেই জুস আর কেক ধরিয়ে দিলেন। বাসেরই যাত্রী ছোট এক বাচ্চা একগুচ্ছ ফুল দিয়ে গেল। লংশেং পৌঁছার কিছু আগে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি আমার বাড়ি চলো, কিছুদিন থাকবে, তারপর আবার ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ো।’ যাহোক, লংশেং নেমে দেখি বেশ একটা শান্ত গ্রাম গ্রাম ভাব, তবে খুব পরিচ্ছন্ন। অটোরিকশা চেপে চললাম পাহাড়ের পাদদেশে। পাহাড়ের গা কেটে ধান চাষ করা হয়েছে। এত দিন এই ধানক্ষেত শুধু ছবিতেই দেখেছিলাম। সেদিন নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না! ধীরে ধীরে পাহাড়ে ট্রেক করে একেবারে ওপরে উঠে গেলাম। পাহাড়ের সিঁড়ি যেন সবুজের কার্পেটে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। সারা দিন লংশেং গ্রামে কাটালাম। মানুষজনের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম। বাইরে থেকে এসেছি বলে তারা ফল, কেক, খাবার ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়িত করল। সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে এলাম গুইলিন শহরে। 

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা