kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

[ মহাপৃথিবী ]

আঙুল যুদ্ধ

অন্যান্য খেলার মতো কড়া নিয়ম-কানুন তো আছেই। তা ছাড়া শারীরিক শক্তি, দৃঢ় মনোবল, প্রতিপক্ষকে কাবু করার কৌশল—সবই জানতে হয়। তবে জার্মান ফিঙ্গার রেসলিংয়ে লড়াইটা হয় মূলত আঙুলে আঙুলে! ভিন্নধর্মী এই খেলার খোঁজ নিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আঙুল যুদ্ধ

আঙুলে আঙুলে কুস্তি করতে দেখেছেন কখনো? জার্মানির স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ব্যাভারিয়ায় আয়োজন করা হয় এ রকম কুস্তি প্রতিযোগিতার। নাম জার্মান ফিঙ্গার রেসলিং, যেটি ফিঙ্গারহ্যাকেন প্রতিযোগিতা নামেও পরিচিত; যেখানে খেলোয়াড়রা লড়াই করেন তাঁদের একটি আঙুল দিয়ে। ভিন্নধর্মী এই খেলা দেখতে সেখানে ভিড় করে অসংখ্য মানুষ। জার্মানির ব্যাভারিয়ায় খেলাটির উত্পত্তি হলেও এখন এটি অস্ট্রিয়ায়ও ব্যাপক প্রচলিত।

প্রতিবছর দক্ষিণ জার্মানির গার্মিশ পাটেনকিরখিনে এই বার্ষিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। খেলাটির উত্পত্তি কোথায় এবং কিভাবে হয়েছে সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য মেলেনি। ধারণা করা হয়, দুই পক্ষের বিবাদ মেটাতে আগেকার যুগে এই খেলা হতো। ১৯৫৯ সাল থেকে এটা ব্যাভারিয়ান সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। এখন রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে খেলাটির আয়োজন করা হয়।

শক্তিমত্তার এই লড়াইয়ে ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী লোকজনও অংশ নিয়ে থাকেন। সাধারণ রেসলিংয়ের মতো এই খেলায়ও বয়স এবং ওজনের ওপর ভিত্তি করে হালকা, মাঝারি, ভারী ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে লড়ে থাকেন প্রতিযোগীরা।

অন্যান্য খেলার মতো এ খেলার নিয়ম-কানুনও বেশ কড়া। ফিঙ্গার রেসলিং ক্লাব কিংবা সংস্থার সদস্যরাই শুধু এতে অংশ নিতে পারেন। নির্দিষ্ট পরিমাপের টেবিল (দৈর্ঘ্য ১০৪ সেন্টিমিটার, প্রস্থ ৭৪ সেন্টিমিটার, উচ্চতা ৭৯ সেন্টিমিটার) এবং বসার জন্য টুল (দৈর্ঘ্য ৪০ সেন্টিমিটার, প্রস্থ ৪০ সেন্টিমিটার, উচ্চতা ৪৮ সেন্টিমিটার) ব্যবহার করা হয় খেলায়। চামড়ার গিঁট সাধারণত ১০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৬-৮ মিলিমিটার প্রশস্ত হয়।

ঐতিহ্যবাহী ব্যাভারিয়ান পোশাক পরে ভিন্নতর এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন খেলোয়াড়রা। যেসব প্রতিযোগীর ওজন ও বয়স একই রকম বা কাছাকাছি, তাঁরা একটি কাঠের টেবিল মাঝে রেখে একে অপরের বিপরীতে বসেন। শুধু একটি আঙুল ব্যবহার করে চামড়ার গিঁট নিজের দিকে সজোরে টানতে হয়। যিনি তাঁর প্রতিপক্ষের আঙুল টেনে টেবিলের এ পারে আনতে পারবেন, তাঁকেই বিজয়ী বিবেচনা করা হয়। উভয় প্রতিযোগীর পেছনে তাঁদের মাটিতে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে একজন করে থাকেন। একজন রেফারি খেলাটি পরিচালনা করেন। তিনিই মূলত বিজয়ী ঘোষণা করেন।

অন্যান্য রেসলিংয়ের মতো, এখানেও অংশগ্রহণকারীদের প্রচুর প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এক আঙুল দিয়ে টেনিস বল চেপে ধরা এবং মাত্র একটি আঙুল দিয়ে ভারী ওজন তোলার অনুশীলন নিয়মিত করতে হয়। অনুশীলনের ফলে কোনো কোনো প্রতিযোগী এক আঙুল দিয়ে ৫০ কেজি ওজনের বস্তুও উত্তোলন করতে পারেন। জিততে হলে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি খেলার কৌশল জানতে হবে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে, যন্ত্রণা সয়ে থাকার শক্তি। এটি মানুষের শক্তি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ কৌশল প্রয়োগের খেলা, যেখানে শুধু শক্ত গ্রিপ নয়, দৃঢ় মনোবল ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে বোঝার মতো সক্ষমতার দরকার হয়। ‘আপনাকে সত্যিই আপনার প্রতিপক্ষকে পড়তে সক্ষম হতে হবে। খেলাটি যতটা শারীরিক শক্তির, ঠিক ততটায় মানসিক শক্তির। আপনাকে ব্যথা সয়ে এবং মুখাবয়ব স্বাভাবিক রেখেই প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে হবে’—বলছিলেন ফ্রাংকফুর্টের রিম্বাচ ফিঙ্গার রেসলিং অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং খেলোয়াড় রেইথমেইয়ার।

প্রতিযোগিতার দিন খেলোয়াড়রা তাঁদের আঙুলগুলো উষ্ণ রাখার জন্য বিশেষ ধরনের পাউডার ব্যবহার করেন। এরপর তাঁরা হাত শুকনো রাখতে হাতে ম্যাগনেশিয়াম পাউডার মাখেন। প্রতিযোগীরা পরস্পরের বিপরীতে নির্দিষ্ট আসনে বসে রেফারির সংকেতের অপেক্ষায় থাকেন। একবার আঙুলে চামড়ার কিট পরার পর খেলা শেষের আগে খেলোয়াড়রা আর দাঁড়ানোর সুযোগ পান না। ‘উভয় কুস্তিগীর প্রস্তুত, টানুন’ রেফারির এমন নিদের্শনার পরই খেলা শুরু হয়ে যায়। প্রতিযোগীরা পরস্পর পরস্পরকে নিজেদের দিকে টানতে থাকেন। তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ খেলাটির স্থায়িত্ব সাধারণত ৬০ সেকেন্ডের বেশি হয় না।

জার্মানজুড়ে বিশেষজ্ঞ আঙুল কুস্তিগীররা প্রতিবছর একে অন্যের সঙ্গে লড়েন ব্যাভারিয়ান, জার্মান কিংবা আন্তর্জাতিক আলপাইন কান্ট্রি চ্যাম্পিয়ন খেতাব জেতার জন্য। ইন্টারন্যাশনাল আলপাইন চ্যাম্পিয়নশিপ ফিঙ্গার রেসলিংয়ের আরেকটি সংস্করণ, যেটি ব্যাভারিয়ান শহরের নিকটে ওলস্টেড নামক স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রতিযোগিতার শিরোনামে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দ থাকা সত্ত্বেও শুধু অস্ট্রিয়ানরাই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। আঞ্চলিক ফিঙ্গার রেসলিং ক্লাবের উদ্যোগে মোটাদাগে বছরে পাঁচটি বড় চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো হলো দ্য জার্মান চ্যাম্পিয়নশিপস, দ্য ব্যাভারিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপস, দ্য ইন্টারন্যাশনাল আলপাইন চ্যাম্পিয়নশিপস, দ্য জার্মান স্টুডেন্ট চ্যাম্পিয়নশিপস এবং দ্য আলপাইন স্টুডেন্ট চ্যাম্পিয়নশিপস। এই খেলায় ইনজুরি অস্বাভাবিক নয়। অংশগ্রহণকারীদের অনেক শারীরিক ধকল পোহাতে হয়। কেননা খেলতে গিয়ে আঙুল কেটে যাওয়া, চামড়া ছিলে যাওয়া, জ্বালাপোড়া হওয়া, এমনকি আঙুলের হাড় সরে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া মতো ঘটনাও ঘটে থাকে।

সূত্র : দ্য ডেইলি মেইল, বিবিসি, বারবেন্ড ডটকম ও টপেন্ড স্পোর্টস ডটকম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা