kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

তিনি কৃষিযন্ত্র বানান

চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ বাজারের ওলি উল্লাহ জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী। বীজ বপন, ফসল তোলা ও ফসল মাড়াইয়ের যন্ত্র তিনি তৈরি করছেন। সারা দেশে সেগুলো বিক্রিও হচ্ছে। স্বশিক্ষিত এই মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন মানিক আকবর

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তিনি কৃষিযন্ত্র বানান

ফসল তোলা বা মাড়াইয়ের যন্ত্র বিদেশি সিনেমায়ই দেখা গেছে আগে। আমাদের দেশে যেগুলো ব্যবহূত হতো, সেগুলোও বিদেশ থেকেই আসত। দেশে যে এসব যন্ত্র তৈরি করা যেতে পারে, তা ভাবেনি বেশি লোক। তবে ওলি উল্লাহ ভেবেছিলেন। তিনি আগে লোহালক্কড় কারখানার শ্রমিক ছিলেন। পরে নিজেই কৃষিযন্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেন।

 

যেভাবে শুরু

বিদেশ থেকে আনা কৃষিযন্ত্রগুলো উচ্চমূল্যে কিনতে হয় কৃষককে। একই যন্ত্র দেশে তৈরি করা সম্ভব হলে দাম পড়বে অনেক কম। এতে কৃষকের তো বটেই, দেশেরও লাভ। এসব চিন্তাভাবনা থেকেই কৃষিযন্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেন ওলি উল্লাহ। বিদেশি যন্ত্রের অনুকরণে দেশীয় পদ্ধতিতে কৃষিযন্ত্র তৈরির কাজ ছোট পরিসরে শুরু করেন ২০১০ সালে। গুটিকয়েক যন্ত্র তৈরি করে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে বিক্রিও করছিলেন। তবে ২০১৫ সাল থেকে বড় পরিসরে কাজ করতে শুরু করেন। চুয়াডাঙ্গার গণ্ডি পেরিয়ে খুলনা ও বরিশাল বিভাগেও বিক্রি করতে থাকেন। এখন ওলি উল্লাহর কৃষিযন্ত্র বিক্রি হয় সারা দেশে।

 

একজন ওলি উল্লাহ

তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় কম মানুষই বুঝতে পারবেন, তিনি বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ঝরে পড়েছিলেন। পরে আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। আদি নিবাস কুমিল্লা জেলায়। ১৯৮৮ সালে নদীভাঙনে সব হারিয়ে চলে আসেন চুয়াডাঙ্গায়। বাবাও মারা যান ওই বছরই। তখন তাঁর বয়স ২৪ বছর। চুয়াডাঙ্গায় এসে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। একসময় সরোজগঞ্জ বাজারে ইসলাম মেকানিকে কাজ শুরু করেন। সেখানে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেন টানা চার বছর। এরপর সিদ্ধান্ত নেন, নিজেই একটি কারখানা করবেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশি সময় নেননি। কারখানা তৈরি করেন সরোজগঞ্জ বাজারেই। নাম দেন জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং। দিন দিন এর সুনাম বেড়েছে। বেড়েছে কাজের পরিধিও। এখন সরোজগঞ্জ বাজারেই দুই জায়গায় দুটি কারখানা। তবে তিনি চাইছেন দুটি মিলিয়ে বড়সড় একটি কারখানা করতে। সেই পরিকল্পনায় কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন। ওলি উল্লাহ বলছিলেন, ‘আমি নাটবল্টু-লোহালক্কড় বুঝি। নাটবল্টুরাও আমাকে বোঝে। সফল হতে গেলে প্রয়োজন সততা। আমি কথা দিয়ে কথা রাখি। কারো সঙ্গেই প্রতারণা করি না।’

 

বাজারে ওলি উল্লাহর যন্ত্র

২০১০ সালে ওলি উল্লাহ ধান থেকে তুষ আলাদা করে চাল বের করার যন্ত্র তৈরি শুরু করেন। ২০১৫ সাল থেকে জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৈরি করা হচ্ছে বীজ বপন যন্ত্র, খড় ও ঘাস কাটার যন্ত্র, মুরগির খাবার তৈরির যন্ত্র, ভুট্টার খোসা ছাড়ানোর যন্ত্র ইত্যাদি। ১৮ ধরনের যন্ত্র তৈরি করেন ওলি উল্লাহ। বিদেশি যন্ত্রের চেয়ে অনেক কম মূল্যে কৃষকরা এগুলো কিনতে পারছেন। কৃষিকাজে যন্ত্র ব্যবহারের সুবিধা হলো, এতে শ্রমিক খরচ কমে। বীজ বপন, ফসল কাটা বা ঝাড়া ইত্যাদি কাজ স্বল্প সময়ে ও কম খরচে শেষ করা সম্ভব। এখন সারা দেশেই পাওয়া যায় ওলি উল্লাহর তৈরি কৃষিযন্ত্র। সারা দেশে আছে ৫০ জন ডিলার। বিক্রয়োত্তর সেবাও দেওয়া হয়। যন্ত্র কেনার সময় ব্যবহারপদ্ধতি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইউটিউবে ‘জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং’ লিখে অনুসন্ধান করলেই ওলি উল্লাহর তৈরি যন্ত্রপাতির ব্যবহার পদ্ধতির ভিডিও দেখে কৃষক সহজেই তা ব্যবহার করতে পারেন।

 

কাজের স্বীকৃতি

দেশের অর্থ দেশে রাখছেন ওলি উল্লাহ। কাজ দিয়েই অর্জন করেছেন কৃষকদের আস্থা। গেল মার্চ মাসে তাঁকে এসএমই ফাউন্ডেশন বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া বছরে একাধিকবার তিনি জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পান। তিনি তাঁর কাজ এবং কাজের পদ্ধতি কুক্ষিগত করে রাখতে চান না। বরং আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। এর মধ্যে ৪৫ জন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ব্যবসা করে সফলও হয়েছেন।

 

তাঁর পাশে আছে

ওলি উল্লাহর সুনাম ছড়িয়ে পড়ার পর এগিয়ে এসেছে ইউএসএইড। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। 

 

ক্রেতারা বলেন

দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলায় বাড়ি কিরণচন্দ্র রায়ের। তিনি একটি ভালো মানের খড়-বিচালি কাটার মেশিন খুঁজছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, বিদেশ থেকে আনা মেশিনের দাম বেশি। স্থানীয়ভাবে তৈরি মেশিন বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু তার ব্লেড ভালো নয়। কাজ ভালো হয় না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি ছয় মাস আগে চুয়াডাঙ্গা থেকে ওলি উল্লাহর তৈরি একটি মেশিন কিনে নিয়ে যান। কাজ ভালো হচ্ছে দেখে পরিচিত অনেকেই আগ্রহী হয়েছেন। তাঁরা আরো কিছু যন্ত্রের অর্ডার দিয়েছেন।

হবিগঞ্জ জেলায় বাড়ি নজির মিয়ার। তিনি একটি মুরগির খাবার তৈরির মেশিন কিনতে চান। ঢাকায় গিয়ে জেনেছিলেন, চীন থেকে আমদানি করা মেশিনের দাম ৯৫ হাজার টাকা। দাম নাগালের বাইরে হওয়ায় তাঁর মেশিন কেনা হলো না। তিনি খবর পেলেন, চুয়াডাঙ্গার একজন মুরগির খাবার তৈরির মেশিন তৈরি করেন। চুয়াডাঙ্গার জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসে মেশিনটি দেখলেন এবং কিনেও ফেললেন। দাম পড়ল ৬৫ হাজার টাকা। নাজির মিয়া জানান, দুই মাস হলো মেশিনটি ব্যবহার করছি। খুবই ভালো কাজ দিচ্ছে।

আলমগীর হোসেনের বাড়ি সুনামগঞ্জে। নজির মিয়ার মতো করে তিনিও একটি মুরগির খাবার তৈরির মেশিন কিনেছেন চুয়াডাঙ্গা থেকে। তিনিও সন্তুষ্ট মেশিনটি ব্যবহার করে।

 

ওলি উল্লাহ বলেন

বিদেশি বীজ বপন যন্ত্র আমাদের দেশের জন্য উপযোগী নয়। তার দাম ৭০ হাজার টাকা। সেই যন্ত্রে একাধিক ফসলের বীজ বপনে অসুবিধা আছে। আমাদের তৈরি বীজ বপন যন্ত্র বিক্রি হয় ৫৫ হাজার টাকায় আর একটি মেশিনেই প্রায় সব ফসলের বীজ বপন করা যায়। বিদেশি ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্রের দাম ২০ লাখ টাকা। আমরা এখনো ওই মেশিন বাজারজাত করিনি। এখনো গবেষণা পর্যায়ে আছে। আমরা তৈরি করার পর মাত্র সাত লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারব। কোরিয়ার তৈরি খড় ও ঘাস কাটার যন্ত্রের দাম এক লাখ টাকা। আমরা তৈরি করে বিক্রি করছি ৪৫ হাজার টাকায়। আমাদের তৈরি মুরগির খাবার তৈরির যন্ত্রের দাম ৬০ হাজার টাকা। আমাদের ভুট্টার খোসা ছাড়ানোর মেশিন বেশ জনপ্রিয়। আমরা ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করি। আলু লাগানো আর আলু ওঠানোর  মেশিনও আমরা তৈরি করছি। আলু লাগানোর মেশিনের দাম ৬৫ হাজার আর ওঠানোর মেশিন ৪৫ হাজার টাকা।

 

কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষি প্রকৌশলী ড. মো. এছরাইল হোসেন বলেন, দেশে হাতে গোনা কয়েকজন কৃষিযন্ত্র তৈরি করেন। তার মধ্যে চুয়াডাঙ্গার ওলি উল্লাহ অন্যতম। তাঁর তৈরি কৃষিযন্ত্রপাতির গুণগত মান খুব ভালো। কৃষকদের মধ্যে তিনি সাড়া জাগাতে পেরেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা