kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

যেভাবে ফারহানা সেরা শিক্ষিকা

বাবা ছিলেন শিক্ষক। বাবার সঙ্গেই প্রথম ফারহানা জামান স্কুলে পড়াতে গিয়েছিলেন। তারপর একদিন হয়ে উঠলেন উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। মোস্তাফিজ নোমান বলছেন বিস্তারিত

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যেভাবে ফারহানা সেরা শিক্ষিকা

পড়ালেখার পাশাপাশি নানা আনন্দ আয়োজনেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গী ফারহানা

২০০৪ সাল। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ফারহানা জামান এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করছেন। হঠাত্ একদিন স্কুলশিক্ষক বাবা বললেন, ‘তৈরি হও, তোমাকে আমাদের স্কুলে নিয়ে যাব। তুমি ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাবে। দেখবে, তোমার ভালো লাগবে।’

বাবা কামরুজ্জামান মাস্টার তখন ছিলেন ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার রায়মনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন। তার মধ্যে দুজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতা ছিল। তাই বাবার কথা না রেখে উপায়ও ছিল না ফারহানার। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে স্কুলে গিয়ে ক্লাস নিতেন। মা মাঝেমধ্যে বাধ সাধতেন; কিন্তু ফারহানা তত দিনে মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন। শিশুদের আবেগ-ভালোবাসার টানে ছুটে যান স্কুলে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন প্রিয় শিক্ষিকা হয়ে ওঠেন। তবে এইচএসসির পর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে আর ওই স্কুলে যাওয়া হয়নি ফারহানার। কিন্তু কোমলমতি শিশুদের টান তিনি ছাড়তে পারেননি। একপর্যায়ে ঠিক করলেন, শিক্ষকই হবেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষক।

তাই ২০০৮ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চলাকালেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে আবেদন করলেন। ২০০৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে এলংজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার তাঁকে ব্যথিত করল। তার ওপর শিক্ষার্থীরা নিয়মানুবর্তীও নয়। তিনি এ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চাইলেন। গাঁয়ের সব শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসার কথা ভাবলেন, প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসতে চাইলেন। শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে চাইলেন একটি নিয়মের মধ্যে।

এলংজানি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। বলা চলে, ত্রিশালের প্রত্যন্ত এলাকায়ই বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানার পাশে দাঁড়ালেন, উত্সাহ দিলেন। বললেন, ‘তুমি খুব ভালো পাঠদান করো।’

ফারহানা স্কুল ছুটি হওয়ার পরের সময়টা বাড়ি বাড়ি ঘুরতে লাগলেন। কোন বাড়ির শিক্ষার্থীকে স্কুলগামী করতে হবে, কোন শিক্ষার্থীর অভিভাবককে সচেতন করতে হবে, কাকে আলাদাভাবে বাড়ি গিয়ে পড়াশোনা দেখিয়ে দিতে হবে ইত্যাদি সব কিছুরই দায়িত্ব নিলেন তিনি। পাঁচ বছরে গোটা এলাকার চিত্র বদলে দিলেন। এখন এলাকার সব শিশুকে তাদের অভিভাবকরা নিয়মিত স্কুলে নিয়ে আসেন। কে পড়াশোনা করছে আর কে করছে না সেটা দেখভাল করছেন অভিভাবকরা। এ যেন অসাধ্য সাধন করলেন ফারহানা। এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়ে গেল। মুরব্বিরা বলাবলি করতে লাগলেন, ‘খুব ভালা একখান মাস্টারনি আইছে।’ আমাগর পোলাপান এখন স্কুলে যাইতেছে। সন্ধ্যার পরই বাড়িতে পড়তে বসে। আল্লাহ এই মাস্টারনিকে বাঁচাইয়া রাখেন। এলংজানি গ্রামের সবার ভালোবাসা পেছনে ফেলে বদলিজনিত কারণে ২০১৪ সালে চলে যেতে হয় আংরারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নতুন বিদ্যালয়, নতুন এলাকা। এখানে শিক্ষার আলো সেভাবে পৌঁছেনি। নতুন এলাকায় নতুন উদ্যমে কাজ করতে হবে। আগের নিয়মেই এখানেও কাজ শুরু করলেন। এরই মধ্যে আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অভিজ্ঞতা ও স্কুল পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সিইনএড কোর্সের ডাক আসে। পিটিআই পরীক্ষণ বিদ্যালয়েও ছয় মাস প্র্যাকটিস টিচিং করান। সেখানেও পেয়েছেন সাফল্য। উত্তীর্ণ হন প্রথম বিভাগে। কাজের আগ্রহ দেখে কর্তৃপক্ষ তাঁকে যুক্ত করেন ‘কাব’ কার্যক্রম ও ‘হলদে পাখি’ কার্যক্রমে। সেখানেও শারীরিক শিক্ষার টিম লিডার হিসেবে কাজ করেছেন এক বছর। পিটিআই শেষ করে আসার পর তিনি ত্রিশালেরই বইলর কানহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। এখানে এসেও তিনি শিক্ষার্থীদের মাতৃমমতায় গড়ে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়া, ট্রাফিক আইন থেকে শুরু করে সব ধরনের নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার জন্য ছুটে বেড়ান স্কুলের সর্বত্র। এ বছর ফারহানা হয়েছেন উপজেলার সেরা শিক্ষিকা। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার ইলিয়াস কাঞ্চন এ ধরনের শিক্ষিকা পেয়ে খুবই গর্ববোধ করেন। তিনি বলেন, ফারহানার মতো দায়িত্বশীল শিক্ষিকা প্রতিটি বিদ্যালয়ে থাকলে শিশুদের বিকাশ ত্বরান্বিত হতো। আমি কখনো তাঁকে স্কুলে অনুপস্থিত পাইনি, তিনি কখনো তাঁর দায়িত্বে অবহেলা করে অলস সময় কাটাননি। বরং বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার পড়াশোনার কী অবস্থা তার খবর নিচ্ছেন। কখনো শিক্ষার্থীদের নিয়ে আনন্দ করছেন, কখনো শেখাচ্ছেন গান, খেলাধুলায়ও সঙ্গী থাকছেন। ফারহানা জামান বললেন, ‘অনেকের ধারণা, গ্রামের শিশুরা দুস্থ ও অসচ্ছল পরিবারে জন্মেছে, ওদের শিক্ষা দিয়ে কোনো লাভ নেই। আমি কিন্তু তা মনে করি না। ওরা অনেক চৌকস, দ্রুত শেখে। একটি ছোট্ট শিক্ষার্থী মায়ের হাত ধরে ভর্তি হতে আসে, তারপর অক্ষরগুলো শেখে, শব্দ তৈরি করে, শব্দ থেকে বাক্য—তখন আমার চোখে পানি চলে আসে। এটা শিক্ষক হিসেবে আমার বড় প্রাপ্তি মনে হয়। মনে হয় আমি সৃষ্টিশীল মানুষ। পাঠদানের সময় বেছে বেছে দুর্বল শিক্ষার্থীদের খাতায় ‘ভেরি গুড’ লিখে দিই। তারা খুব খুশি হয়। একসময় এই ‘ভেরি গুড’ পাওয়ার আশায়ই ভালো ছাত্র হয়ে ওঠে। চারুকারু ক্লাসে আমিই বরং তাদের কাছে শিখি। প্রতিদিন আমার টেবিল ভরে যায় শিক্ষার্থীদের দেওয়া বিভিন্ন রকম ফুলে। তাদের নিয়ে আমি মাঠে দৌড়াই, খেলাধুলায় অংশ নিই। বিদ্যালয় আঙিনায় কৃষ্ণচূড়া-শিউলি ফুলের গাছ রোপণ করি, নৌকা বানাই, কাগজের ফুল তৈরি করি। তারা প্রবল উত্সাহে আমাকে সঙ্গ দেয়। প্রাপ্তিতে আমার মন ভরে যায়। আমি সব কাজে সব সময় আমার সহকর্মীদের সহযোগিতা পেয়েছি। আমি সব প্রাথমিক শিক্ষককে বলব, ‘আসুন, আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করি। শিক্ষার্থীদের অপরিচ্ছন্ন ও মেধাহীন বলে গালি না দিয়ে বরং কাছে টেনে নিই। জামার খোলা বোতামটা লাগিয়ে দিয়ে পাশে বসিয়ে হাতে ধরে অক্ষরজ্ঞান শেখাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা