kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

মহাপৃথিবী

অ্যাডামের মা

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অ্যাডামের মা

আইএস জিহাদি আবু মুহাজিরের হাতে বন্দি ছিল জোভান। যুদ্ধে আবু মুহাজির মারা গেলে তাঁর নবজাতককে নিয়ে নিজের সংসারে ফিরতে চাইলেন জোভান; কিন্তু পারলেন না। পরিবার ও সমাজের চাপে অ্যাডামকে হারালেন। হারালেন তাঁর আগের সংসার। বিবিসিতে নাফিসেহ কোহনাভার্ড লিখেছেন জোভানের নতুন যুদ্ধের কাহিনি

জোভান তাঁর স্বামী খেদরের সঙ্গে একটি গ্রামে বসবাস করতেন। এ গ্রামেই তিনি বড় হয়েছেন। তাঁর স্বামী ও সংসার নিয়ে তিনি খুব সুখেই ছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছর আগে হঠাত্ করেই তাঁর জীবন আমূল বদলে যায়। সময়টা ছিল ২০১৪ সালের আগস্ট মাস। কালো পতাকা উড়িয়ে দুটি গাড়ি সেদিন তাঁদের গ্রামে এসে পৌঁছল। জোভান ও খেদর বুঝতে পারছিলেন না গ্রামে কী হচ্ছে; কিন্তু ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল যে তাঁদের সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। গাড়িতে করে যে লোকগুলো এসেছিল, তারা ইসলামিক স্টেটের জিহাদি। একপর্যায়ে জোভানদের নিয়ে যাওয়া হয় আইএস খেলাফতের তথাকথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা শহরে। পরের চার বছর জোভানের সঙ্গে তাঁর স্বামী খেদরের আর দেখা হয়নি।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, সে সময় সিঞ্জারে (উত্তর ইরাকের একটি পাহাড়ি এলাকা) চার লাখ ইয়াজিদি বসবাস করত। তাদের মধ্যে কয়েক হাজারকে হত্যা করা হয় এবং সাড়ে ছয় হাজারের মতো ইয়াজিদিকে দাস বানিয়ে তাদের ধর্ষণ করা হয়, নির্যাতন চালানো হয় এবং তাদের অনেককে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

 

নতুন জীবন

একপর্যায়ে জোভানকে বলা হলো, কোনো আইএস যোদ্ধার কাছে তাঁকে তুলে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেওয়া হলো আবু মুহাজির আল তিউনিশি নামের এক যোদ্ধাকে, যে তিউনিশিয়ার নাগরিক ছিল। সে ছিল শীর্ষস্থানীয় একজন কমান্ডার। জোভানকে তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করতে বলা হয়। এরপর জোভান সারা দিন ধরে শুধু কাঁদতেন। তিন-তিনবার পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হন। প্রতিবারই তিনি আবু মুহাজিরের হাতে ধরা পড়েন।

‘একসময় আমার আত্মহত্যা করার কথাও মনে হয়েছিল; কিন্তু সন্তানদের কথা ভেবে সেটা করতে পারিনি।’ আবু মুহাজির তখন জোভান ও তাঁর সন্তানদের নিয়ে রাকার একটি বাড়িতে গিয়ে ওঠে। 

 

অ্যাডামের জন্ম

এর মধ্যেই গর্ভবতী হয়ে পড়লেন জোভান। ‘কোনো ওষুধ ছিল না। আমি জানতাম না যে আমি কী করব।’ বলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বাহিনী সেখানে প্রতিদিন বোমা ফেলত। ইরাকি ও কুর্দি যোদ্ধারা যুদ্ধ করত সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন এলাকায়। ঠিক তখনই আবু মুহাজির জোভানকে অন্য কোনো আইএস যোদ্ধার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন দেখল যে জোভানের পেটে তার সন্তান বড় হচ্ছে, তখন সে তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। গর্ভধারণের সাত মাসের মাথায় জোভান খবর পেলেন যে আবু মুহাজির এক যুদ্ধে মারা গেছে।

অ্যাডামের যখন জন্ম হয়, তখন রাকায় প্রতিদিন বোমা পড়ত। জোভানের বড় দুই সন্তান হাওয়া ও হাইথাম তাঁর নতুন সন্তানের জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। ‘বাচ্চারা অ্যাডামকে খুব ভালোবাসত। তারা তাঁর যত্ন নিত, বিশেষ করে হাওয়া। সে শুধু আমার কন্যাই ছিল না, ছিল বন্ধুও। অ্যাডামকে সে-ই খাওয়াত, ঘুম পাড়াত।’

ঘন ঘন বোমা পড়ার কারণে জোভান তাঁর সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। সব সময় বিদ্যুত্ও থাকত না। খাবার জোগাড় করাও ছিল খুব কঠিন। বাচ্চাদের যাতে খাবারের অভাব না হয়, সে জন্য নিজে খুব কম খেতেন জোভান।

পলায়ন

খেদর ইরাকে তাঁর পরিবার ও বাচ্চাদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। জানতেন না নতুন এই বাচ্চার কথাও। এর মধ্যে ১৪ মাস পার হয়ে গেছে। এবং খেদর প্রতিদিনই তাদের হন্যে হয়ে খুঁজেছেন।

একপর্যায়ে তিনি তাঁর পরিবারের খোঁজ পেলেন। আইএসের কাছ থেকে পাচারকারী যে দলটি ইয়াজিদি নারী ও পুরুষদের কিনে নিচ্ছিল, তাদের কাছ থেকেই জোভানের খোঁজ পেলেন তিনি। কিন্তু একেকটি বাচ্চার জন্য তাঁকে ছয় হাজার ডলার করে পরিশোধ করতে হতো। হাইতাম, হাওয়া ও আজাদ তাদের পিতার সঙ্গে একত্রিত হলো। কিন্তু জোভানকে আরো দুই বছর রাকায় থেকে যেতে হয়। তাঁর নতুন সন্তান অ্যাডামকে খেদর গ্রহণ করবেন কি না সে বিষয়ে তিনি খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না।

খেদরও কয়েক মাস ধরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। কারণ এসব বিষয়ে ইয়াজিদি সম্প্রদায় খুবই কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে থাকে। ইয়াজিদি ধর্মে শুধু জন্মগ্রহণের মাধ্যমেই এই ধর্মের অনুসারী হওয়া যায়। কেউ এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে না। ফলে কোনো সন্তানের পিতা ও মাতা  দুজনই যদি ইয়াজিদি হন, তবেই শুধু তাকে ইয়াজিদি হিসেবে গ্রহণ করা হবে।

জোভান তখন এমন ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে বসবাস করতেন, যাদের আইএস যোদ্ধারা একসময় বন্দি করে রেখেছিল এবং ওই জিহাদিরা যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে। তাঁদের সবাই সামাজিক কারণে সিঞ্জার গ্রামে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ তাঁদের কারো কারো গর্ভে দু-তিনজন শিশুরও জন্ম হয়েছিল। খেদর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন যে বাচ্চাদের তাদের মাকে প্রয়োজন। তখনই তিনি জোভান ও অ্যাডামকে নিতে রাজি হয়ে গেলেন।

 

গ্রামে ফেরা

চার বছর পর জোভান সিঞ্জার গ্রামে ফিরে গেলেন। সঙ্গে ছিল গ্রামের নতুন অতিথি অ্যাডামও। কিন্তু কয়েক দিন পরই পরিবারের চেহারা বদলে গেল। তারা বলতে লাগল অ্যাডামকে ফেলে দিতে। ‘তারা আমাকে ধর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, আইএস যোদ্ধার ঘরে জন্ম নেওয়া মুসলিম কোনো বাচ্চাকে সমাজ কখনোই গ্রহণ করবে না।’ বলেন জোভান। খেদর তখন জোভানকে নিয়ে গেলেন মসুলের একটি এতিমখানার ম্যানেজার সাকিনে মোহাম্মদ আলী ইউনুসের কাছে। তিনি ভেবেছিলেন, ওই ম্যানেজার হয়তো তাঁর স্ত্রীকে রাজি করাতে পারবেন বাচ্চাটিকে এতিমখানায় রেখে আসার ব্যাপারে। কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালানোর পরও রাজি হচ্ছিলেন না জোভান। খেদর তখন কাঁদতে শুরু করেন। ‘একজন মায়ের কাছ থেকে তাঁর বাচ্চাকে সরিয়ে নেওয়ার মতো কষ্টের আর কিছুই হতে পারে না। এটা হচ্ছে আমার হূিপণ্ডের একটা অংশ কেটে নেওয়ার মতো।’ ম্যানেজার তখন মিথ্যা কথা বলেন। তিনি বলেন, বাচ্চাটি অসুস্থ। তাকে ভালোমতো দেখাশোনা করা দরকার। কয়েক সপ্তাহ পরেই তাকে আবার জোভানের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

এ আশ্বাস নিয়েই গ্রামে ফিরে গেলেন জোভান। কয়েক দিন পরই তিনি সব কিছু মেনে নিতে শুরু করলেন। ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাঁর বাকি তিন সন্তানের লালন-পালনে। কিন্তু একপর্যায়ে অ্যাডামকে ভুলে থাকা তাঁর জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ল। ‘প্রতি রাতে আমি তাকে স্বপ্নে দেখতে লাগলাম। কিভাবে তাকে ভুলে যাব আমি? সে আমার শিশু। আমি তাকে দুধ খাইয়েছি!’ এর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি তাঁর বাচ্চাদের বললেন, থেরাপি চিকিত্সা নিতে তিনি ডহুক শহরে যাচ্ছেন। কিন্তু আসলে তিনি যাচ্ছিলেন অ্যাডামকে যে এতিমখানায় রেখে এসেছিলেন সেখানে।

 

অ্যাডামের জন্য কষ্ট

‘আমার মনে হয়েছিল যে আমি অ্যাডামের সঙ্গে প্রতারণা করছি। আমার অন্য বাচ্চাদের তো পিতা আছে; কিন্তু অ্যাডামের তো কেউ নেই।’ জোভান যখন এতিমখানায় গিয়ে পৌঁছলেন, তাঁকে বলা হলো—অ্যাডাম অসুস্থ এবং তার সঙ্গে তিনি দেখা করতে পারবেন না। কিন্তু দু-তিন দিনের চাপাচাপির পর ম্যানেজার স্বীকার করলেন যে কিছু বাচ্চাকে স্থানীয় একজন বিচারকের মাধ্যমে দত্তক দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অ্যাডামও ছিল। কান্নায় ভেঙে পড়লেন জোভান। তিনি আর বাড়ি ফিরে যাননি। বরং আশ্রয় নিলেন উত্তর ইরাকে নারীদের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে।

এর কয়েক মাস পর খেদর তাঁকে তালাক দিলেন এবং বললেন, বাকি বাচ্চাদের দেখতে জোভান যেন আর কখনো গ্রামে ফিরে না যায়।

 

একই চিত্র

জোভানের মতো আরো অনেক ইয়াজিদি নারীকেই এ ধরনের পরিণতি মেনে নিতে হয়েছে। এ রকম আরো প্রায় ২০ জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, যাঁদের গর্ভেও আইএস যোদ্ধার সন্তানের জন্ম হয়েছে। তাঁদের কেউ-ই ওই সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেননি। অনেককে ইরাকে ফিরে আসার আগে ওই সন্তান সিরিয়ায় ফেলে আসতে হয়েছে।

জোভান এখন মনে করেন, আইএসের অধীনেই তাঁর জীবন ভালো ছিল। ‘আমরা অবরুদ্ধ ছিলাম। জীবন কঠিন ছিল। কিন্তু বাচ্চারা তো আমার সঙ্গে ছিল।’ এতিমখানার ম্যানেজার সাকিনে বলেছেন, জোভান তাঁর বাচ্চাকে দত্তক থেকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন যদি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি দেখাতে পারেন যে তিনিই অ্যাডামের মা। তবে এই প্রক্রিয়া এতটা সহজ না-ও হতে পারে। কারণ জোভান একজন ইয়াজিদি নারী, অ্যাডাম একজন মুসলিম। এ রকম পরিস্থিতিতে জোভান নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন যে অ্যাডাম এখন যেখানে আছে সেখানে সে ভালোই আছে। ‘আমি প্রতিদিনই তাকে ভাবি। আশা করি, হয়তো একদিন  আমরা আবার একত্রিত হতে পারব, যদি সৃষ্টিকর্তা সেটা চান।’

     (ঈষত্ সংক্ষেপিত ও অভিযোজিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা