kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

ফলগাছে প্রেম তাঁর

সন্তোষপুর রাবার অফিসের সামনে থেকে ইট বাঁধানো পথ ধরে কিছুদূর গেলেই বড়সড় একটি মাল্টা ফলের বাগান। বাগানের পশ্চিম পাশের সড়কের একটি আমগাছ পরিচর্যা করতে দেখা গেল এক যুবককে। আইয়ুব আলী তাঁর নাম। পেশায় একজন কৃষক। নিজ উদ্যোগে বালুঘাট বাজার থেকে মধুপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত চার কিলোমিটার সড়কে ফলগাছের চারা লাগিয়েছেন। মো. আব্দুল হালিম দেখে এসেছেন

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফলগাছে প্রেম তাঁর

নিজ হাতে লাগানো ফলগাছের পরিচর্যা করছেন আইয়ুব আলী

যেদিন সময় পান, সেদিন সড়কের পাশে লাগানো ফলগাছের চারাগুলো নিজ হাতেই পরিচর্যা করেন আইয়ুব আলী। ২০১৫ সাল থেকে চারা লাগানো শুরু। পথের দুই ধার মিলিয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার সড়কে সাড়ে তিন হাজার চারা লাগিয়েছেন। গোড়ার দিকে লাগানো ফলগাছগুলো এর মধ্যেই অনেকটা বড় হয়ে গেছে। কোনো কোনো গাছে ফলও আসতে শুরু করেছে।

 

শুরুর দিক

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের মানুষ আইয়ুব আলী। ১৯৯২ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর তাঁকে সংসারের হাল ধরতে হয়। সে কারণে লেখাপড়া আর এগোয়নি। কৃষিকাজে মন দেন সেই থেকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দেশি-বিদেশি ফলগাছের চারা সংগ্রহ শুরু করেন ২০০৫ সালের মাঝামাঝি। বাড়ির পাশে ৪০ শতাংশ জমিতে তা রোপণ করেন। সেখান থেকে কলম করে চারা বিক্রি শুরু করেন। নিজেও প্রায় পাঁচ একর জমিতে ফলের বাগান গড়ে তোলেন। গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজের হাতে ফলগাছের চারা লাগিয়ে দেন। গাঁয়ের অন্যদেরও বাড়ির আঙিনায় ফলগাছের বাগান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ২০১৫ সালের প্রথম দিকে ভাবেন সড়কের দুই ধারে ফলগাছ লাগাবেন। গাঁয়ের মুরব্বিদের সঙ্গে পরামর্শও করেন। কিছুদিনের মধ্যেই সন্তোষপুর কান্দুর বাজারের একটু পশ্চিম পাশ থেকে সড়কের এক পাশে ফলগাছের চারা লাগানো শুরু করেন। সন্তোষপুর রাবার বাগান পর্যন্ত যাওয়ার পরই প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বাধা দেয়। বন্ধ হয়ে যায় গাছের চারা লাগানো। অনেকটা স্বপ্ন ভঙ্গের মতো। কয়েক মাস বন্ধ থাকলেও আইয়ুব আলী থেমে যাননি। বালুঘাট বাজার থেকে মধুপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ফলগাছের চারা লাগানোর অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলী বরাবর। অনুমোদন পেয়ে যান চারা লাগানোর। এরপর আবারও চারা লাগানো শুরু করেন তিনি।

 

যেসব ফলের গাছ রয়েছে

বালুঘাট বাজার থেকে বাগানবাড়ি চৌরাস্তা পর্যন্ত পাকা সড়কের দুই পাশে ঝোপ-জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে বেড়ে উঠছে আম, আমড়া, পেয়ারা, জাম্বুরা, করমচা, বেল, আতা, অরবরই, চালতা, বকুল, চাম্বল, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। কিছু কিছু গাছ বেশ বড় হয়ে গেছে। দু-একটি আমগাছে মুকুলও দেখা যায়। প্রতিটি গাছের দূরত্ব প্রায় ১০ থেকে ১২ হাত। দুই পাশের আট কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ছয় কিলোমিটারের বেশি সড়কে সাড়ে তিন হাজার ফলের গাছ লাগানো হয়েছে।

 

বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা

আইয়ুব আলীর রয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। সড়কের পাশে দুটি কংক্রিটের পিলারে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ বড় হরফে লেখা বঙ্গবন্ধু মিশ্র ফল বাগান। বালুঘাট বাজার থেকে বাগানবাড়ি চৌরাস্তা পর্যন্ত পাকা সড়কের দুই পাশে ফলদ গাছের বাগান। রাবার বাগানের মাঝখান দিয়ে মধুপুর বাগানবাড়ি চৌরাস্তা যাওয়ার পথে সাইনবোর্ডটি সবার চোখে পড়ে।

 

ভালোবাসেন ফলগাছ

ফলগাছের প্রতি আইয়ুব আলীর বিশেষ ভালোবাসা রয়েছে। বাড়ির আঙিনায় চায়না-৩ লিচু, থাই বাউকুল, থাই বেদানা, ড্রাগন ফল, মাল্টা, কমলা, ইরাকি লেবু, থাই জামরুল, আঙুর, মিষ্টি কামরাঙা, মিষ্টি তেঁতুল, সবেদা, থাই করমচা, পেঁপে, বিদেশি বেল, আমড়া, কাঁঠাল, হিমসাগর, বিভিন্ন জাতের আমগাছ, বারোমাসি কলম করা কাঁঠালগাছ, পেয়ারাসহ রয়েছে দেশি-বিদেশি অনেক ফলের গাছ। যে কেউ তাঁর বাড়িতে বেড়াতে গেলে গাছ থেকে সদ্য পেড়ে আনা ফল দিয়ে আপ্যায়ন করেন। সফল ফলচাষি হিসেবে এলাকায় তাঁর বেশ পরিচিতি রয়েছে।

 

আইয়ুব আলীর কথা

ফলগাছ লাগানো তাঁর নেশা। সড়কের পাশে গাছ লাগানোর বড় কারণ হলো, মানুষ চলাচল করার সময় ক্লান্ত হলে গাছের ছায়ায় বসে একটু আরাম করবে। গাছে ফল থাকলে খেয়ে ক্লান্তি দূর করবে। গ্রামে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বাজার থেকে ফল কিনে খেতে পারেন না, তাঁরা এখান থেকে উপকৃত হবে। আইয়ুব আলী গাছগুলোর দেখাশোনা ও পরিচর্যার জন্য মাসিক বেতনভিত্তিক দুজন শ্রমিক রেখেছেন। তাঁর ইচ্ছা সড়কের দুই পাশে ৫০০০ ফলগাছের চারা রোপণ করবেন। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে।

     ছবি : লেখক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা