kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বিপুল বিশ্বাস

ক্যান্সার রোগীদের দুর্দশা সইতে পারছিলেন না ডাক্তার প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস। পরে গড়ে তুলেছেন একটি হাসপাতাল। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নারীদের ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন করেন। বিনা পয়সায় জরায়ু ক্যান্সার ও হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধক টিকাও দেন। রেদওয়ানুল হক জানাচ্ছেন তাঁর কথা

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বিপুল বিশ্বাস

ডাক্তার প্যাট্রিকের হাসপাতালের সামনে লেখা ‘উই আর হিয়ার নট টু বি সার্ভড বাট টু সার্ভ’। এই ব্রত নিয়েই এ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি নারীকে জরায়ু ক্যান্সার প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) দিয়েছেন ডা. প্যাট্রিক ও তাঁর ভ্রাম্যমাণ দল।

ক্যান্সার রোগীদের পাশে

ডাক্তার প্যাট্রিকের জন্ম বরিশালের উজিরপুর উপজেলায়। বরিশালের বিএম স্কুল থেকে এসএসসি এবং বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৬৯ সালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন তিনি। ১৯৭৩ সালে চিকিত্সাবিদ্যায় ডিগ্রি লাভের পর বগুড়ার খ্রিস্টান মিশন হাসপাতালে চিকিত্সক হিসেবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন ডাক্তার প্যাট্রিক। পরে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য চলে যান জাপানে। ১৯৮১ সালে সেখান থেকে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির ডিগ্রি নিয়ে দেশে আসেন। যোগ দেন রাজশাহীর খ্রিস্টান মিশন হাসপাতালে সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে। কিন্তু ক্যান্সার রোগীদের দুর্দশার চিত্র তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল। তাই ১৯৯০ সালে সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে ক্যান্সার রোগীদের নিয়ে কাজ করতে উদ্যোগ নিলেন। সঙ্গে নিলেন কয়েকজন বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীকে।

ক্যান্সার শেল্টার নাম দিয়ে শুরু

কাজ শুরু করতে চেয়ে উত্তরবঙ্গে ক্যান্সার চিকিত্সা পরিস্থিতি বিষয়ে জানা জরুরি হয়ে পড়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পি সি সরকারের মাধ্যমে এক জরিপ পরিচালনা করেন বিপুল বিশ্বাস। দেখলেন, এ অঞ্চলে ক্যান্সার চিকিত্সার সে রকম ব্যবস্থা নেই। তাই কয়েকজন মিলে একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি বিভিন্নজনের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে রাজশাহীতে একটি বাড়ি ভাড়া নেয়। তারা বাড়িটির নাম দেয় ক্যান্সার শেল্টার। যেসব রোগী রাজশাহীতে চিকিত্সা করাতে এসে অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা নিতে সমর্থ হয় না, তাদেরই এখান থেকে সাধ্যমতো চিকিত্সা দেওয়া হতো। রাজশাহীর আরো কয়েকজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এসব রোগীকে চিকিত্সা দিতেন। কিন্তু ছোট্ট এই শেল্টারটি ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও চিকিত্সাদানে যথেষ্ট ছিল না। তাই আরো বড় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ল।

 

রাজশাহী ক্যান্সার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ট্রাস্ট

২০০২ সাল থেকে রাজশাহীর কাটাখালীতে হাসপাতালের নিজস্ব ভবনে চিকিত্সা কার্যক্রম পরিচালনা শুরু হয়। এর আগে হাসপাতালের জন্য এক বিঘা জমি কেনা হয়। হাসপাতালের ভবনটি নির্মাণ করে দেয় নরওয়ের খ্রিস্টানস্যান্ড শহরের সিটি করপোরেশন। রোটারি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের যাবতীয় চিকিত্সা সরঞ্জাম ও অ্যাম্বুল্যান্স সরবরাহ করে। ফলে হাসপাতালটির চিকিত্সাসেবার মান বৃদ্ধি পায়। হাসপাতালটির নামকরণ হয় রাজশাহী ক্যান্সার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ট্রাস্ট।

মোবাইল ক্লিনিকের সামনে সহকর্মীদের সঙ্গে ডাক্তার প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস। ছবি : সালাহ্ উদ্দিন

 

যেসব চিকিত্সাসেবা পাচ্ছে রোগীরা

হাসপাতালটিতে কেমোথেরাপি দেওয়ার ও অপারেশন করানোর সুযোগ আছে, তবে রেডিওথেরাপি দেওয়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। বিপুল বিশ্বাস বলেন, কেমোথেরাপির জন্য রোগীদের প্রথমবার মাত্র ১০০ টাকা এবং পরের প্রতিবারের জন্য মাত্র ৫০ টাকা করে ফি দিতে হয় রোগীদের। মেহেরচণ্ডী গ্রামের পিয়ারা বেগমের যেমন লাং ক্যান্সার ধরা পড়ে মার্চ মাসে। প্রথম দিকে বুকে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া অনুভব করতেন। কিছুতেই কমছিল না, উল্টো জ্বালাপোড়া বেড়েই যাচ্ছিল। তারপর ডাক্তার প্যাট্রিকের কাছে চিকিত্সা নেওয়া শুরু করেন। নিয়ম করে কেমোথেরাপি নেন। এখন অনেকটাই কমেছে।

 

গ্রামে গ্রামে ঘুরেও চিকিত্সা দেন

ডাক্তার বিপুল বিশ্বাস গ্রামে গ্রামে ঘুরে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন ২০১৪ সাল থেকে। বললেন, ‘আমাদের দেশের বেশির ভাগ লোকই গরিব। তার ওপর গ্রামের মানুষের সচেতনতা কম। তাই অসুখ হলে তারা দিশা হারায়। শহরে এলেও উপযুক্ত চিকিত্সা কোথায় পাবে তা বুঝতে পারে না। ছোটাছুটি করেই তাদের যা পয়সা-কড়ি থাকে, খরচ হয়ে যায়। আমাদের দেশের মুসলমান পরিবারের মেয়েরা বেশি লজ্জাশীল। ব্রেস্ট টিউমার কিংবা জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পরও বেশির ভাগই লজ্জায় কাউকে কিছু বলে না। তাই গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রচারণা চালাতে লাগলাম।’

এ কাজের জন্য প্রথমে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা কোনো মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে এসে দুই মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে মেয়েটি গ্রামে গিয়ে নারীদের সঙ্গে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলে। এরপর একটি নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে ডাক্তার প্যাট্রিক ও তাঁর ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম হাজির হন ওই গ্রামে। অংশগ্রহণকারী নারীদের শেখানো হয় অসুখ হলে যেন তারা গোপন না করে। এ ছাড়া নারীদের ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার, হেপাটাইটিস ‘বি’ (এজি) বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করা হয়। প্রয়োজনে তাদের বিনা মূল্যে ভ্যাকসিনও প্রদান করা হয়। ডাক্তার প্যাট্রিক বললেন, ‘এসব রোগের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্রাম পর্যায়ের মানুষের অনেকের পক্ষেই খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। তাই তাদের একেবারে বিনা মূল্যেই চিকিত্সা দেওয়ার জন্য কয়েক বছর যাবত্ চেষ্টা করছি।’ অ্যাম্বুল্যান্সটিতে ক্যান্সার শনাক্ত করার জন্য আলট্রাসনোগ্রাম, মেমোগ্রাম সুবিধা রয়েছে। যদি রোগ জটিল হয় তাহলে রোগীকে হাসপাতালে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়।

একদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা এলাকায় ক্যাম্পেইনে গিয়ে সাবিনা ইয়াসমিন (৪৮) নামের এক নারীর সন্ধান পান ডাক্তার প্যাট্রিক ও তাঁর ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর চিকিত্সকদল নিশ্চিত হয় তিনি ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত। পরে গত বছরের শুরুর দিকে সাবিনা ইয়াসমিন চিকিত্সা নিতে শুরু করেন এবং ডাক্তার প্যাট্রিকের হাসপাতালেই অপারেশন করান। সাবিনা ইয়াসমিন বললেন, ‘এখন আমি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করছি।’

পর্যাপ্ত ফান্ড, লোকবল এবং অন্যান্য সুবিধার অভাবে সীমিত পরিসরে ডাক্তার প্যাট্রিক ও তাঁর ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্যাট্রিক চান এই কর্মসূচি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে।

 

সহজ ছিল না ক্যাম্পেইনের কাজটিও

শুরুর দিকে ক্যাম্পেইনের কাজটি সহজ ছিল না। ক্যাম্পেইনের জন্য মহিলাদের একত্র করতে ভালোই বেগ পোহাতে হয়েছে। প্রাণপণ চেষ্টা করে একপর্যায়ে তারা নারীদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় একত্র করতে পেরেছে। ক্যাম্পেইন শুরুর পর বাধে আরেক বিপত্তি। যখন প্রজেক্টরের মাধ্যমে নারীদের ব্রেস্ট ও জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত অঙ্গের ছবি বা ভিডিও দেখানো হয়, তখন নারীরা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিত। অনেকে ক্যাম্পেইন থেকে চলেও যেত। আবার যখন ভ্যাকসিন নেওয়ার কথা বলা হলে তখনো বেশির ভাগ নারী ভ্যাকসিন নিতে চাইত না। এই ভ্যাকসিন ও ক্যাম্পেইন যে নারী স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি এ বিষয়টি ধীরে ধীরে তাদের বোঝাতে সক্ষম হয় তারা।

দিন গড়িয়েছে, এখন কাজও অনেক সহজ হয়েছে—এমনটাই জানালেন ডাক্তার প্যাট্রিক। বললেন, ‘প্রথমে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন আমরা হয়েছি, তা আর এখন নেই। নারীরা এখন অনেক সচেতন। এখন কোনো গ্রামে গেলে নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও আমাদের কাছে এসে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চায়।  

 

দিন দিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন রোগী হাসপাতালটিতে চিকিত্সা নিতে আসে। বেশির ভাগ আসে কুষ্টিয়া, খুলনা, পাবনা, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ তথা দেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে। হাসপাতালটিতে ৪৫টি বেড, দুটি অপারেশন থিয়েটার এবং ক্যান্সার শনাক্ত করা বা চিকিত্সার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অধিকাংশই রয়েছে। খুব অল্প খরচে এখানে রোগীদের চিকিত্সাসেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস ও তাঁর স্ত্রী ডা. শিখা বিশ্বাসসহ আটজন চিকিত্সক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নিয়মিত রোগী দেখেন। আর কোনো রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হলে বাকি দুজন ডাক্তারকে ডাকা হয়। হাসপাতালটিতে ২৭ জন কর্মী, ৭০ জন ট্রাস্টি মেম্বার ও ২৫৩ জন আজীবন সদস্য রয়েছেন।

 

ডাক্তার প্যাট্রিকের স্বপ্ন

প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই জনগণের আর্থিক অনুদান, খ্রিস্টানস্যান্ড সিটি করপোরেশন ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় হাসপাতালটির কার্যক্রম চলছে। যদি কেউ হাসপাতালটিকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেয়, তাহলে তাকে হাসপাতালের আজীবন সদস্য এবং এক লাখ টাকা অনুদান দিলে আজীবন ট্রাস্টি মেম্বার হিসেবে গণ্য করা হয়। চার বছর পর পর ট্রাস্টি মেম্বারদের মধ্য থেকে ছয়জনকে নির্বাচন করে ট্রাস্টি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিই হাসপাতালের যাবতীয় কার্যক্রম দেখভাল করে থাকে।

ক্যান্সারের মতো জটিল রোগটি ধ্রুত নির্ণয়ের মাধ্যমে রোগীর কষ্ট লাঘব করা এবং একজন রোগী যত দরিদ্রই হোক না কেন, সে যেন চিকিত্সার অভাবে মারা না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্যই কাজ শুরু করেছিলেন ডাক্তার প্যাট্রিক। ভবিষ্যতে চিকিত্সাসেবার মান আরো বৃদ্ধি করে এবং এখানে ক্যান্সার চিকিত্সার আরো সরঞ্জাম যুক্ত করে হাসপাতালটিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্যান্সার হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন—এমন স্বপ্নই দেখছেন ডাক্তার প্যাট্রিক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা