kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

মনোভূমি

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রত্যাবর্তন

নড়াইলের রয়েল স্ট্রিটের ৫৫ নম্বর বাসায় উঠেছে নিতু। আমেরিকা থেকে এসেছে, মাত্র কয়েক দিন হলো। আমার জন্মদিনে গুনে গুনে ২২টি গোলাপ কুরিয়ার করে পাঠিয়েছে। সঙ্গে একটি চিঠি। সেখান থেকেই তার দেশে আসার খবর পেলাম। আমার জন্মদিনের মাত্র কয়েক দিন পরই নিতুর জন্মদিন। কুরিয়ার থেকে পাওয়া ঠিকানায় আমিও একটি গিফট পাঠিয়ে দিলাম। ঠিক দুই দিন পর নিতু কল দিল। নতুন নম্বর। তবু মনে হচ্ছিল এটা নিতুই।

—এত বড় একটি প্যাকেট পাঠিয়েছ। ভেতরে তো কিছুই নেই। সারা জীবন শুধু এভাবেই ধোঁকা দিয়ে যাবে আমাকে?

—‘তোমার চারপাশে এত এত ভালোবাসা, তাই তুমি গোলাপ পাঠালে। আমার চারপাশে তো শুধু শূন্যতা। প্যাকেটভর্তি করে না হয় তোমায় শূন্যতাই দিলাম।’

নিতু চুপ হয়ে গেল। জানি ফিরে আসার দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেছে সে। আমিও অপেক্ষায় রইলাম দ্বিধা কেটে ওর প্রত্যাবর্তনের জন্য।

আল সানি

ডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

শার্ট কে ইস্ত্রি করে দিয়েছে?

প্রতিবার ঢাকা যাওয়ার দিন একটা মহা হুলুস্থুল বেধে যায়! একেবারে বের হওয়ার সময় দেখা যায়, রাফসান আয়েশ করে নখ কাটতে বসে গেছে। ট্রেন ছাড়ার মিনিট বিশেক বাকি, সে দোকানে ঝিম ধরে বসে আছে। আসার কোনো নাম-গন্ধ নেই। এমন রাগ হয় তখন! বেড়াতে যাওয়ার আগে আমি কোনো কেলেঙ্কারি করতে চাই না। তা-ও সে এমন একটা কাহিনি করবে যে উচ্চবাচ্য করতে আমি বাধ্য হই!

আজকে যেমন তার আগে আগে বাসায় আসার কথা। মরিচগাছের টবগুলো বাইরে এনে দেবে। আমরা যে কয় দিন থাকব না, সে কয় দিন পাশের বাসার মাসুদ গাছে পানি দেবে। কবুতরের খাবার ফুরিয়ে গেছে। অথচ দোকানের কর্মচারীর টিকিটাও দেখা যাচ্ছে না!

এদিকে রান্নাঘরের জানালা দুটি প্রচণ্ড শক্ত। বন্ধ হয় না সহজে। রাফসান আসলে ওকে দিয়ে মনে করে অবশ্যই জানালাগুলো বন্ধ করাতে হবে। টুকটাক আরো কত কাজ! সব কি আমার একলার? তার কি কোনো দায়িত্ব নেই? সকাল গড়িয়েছে। দুপুরের মহানগর ট্রেনে আমরা ঢাকামুখী হব। গোছগাছ মোটামুটি সেরে ফেলেছি। ব্যাগ গোছানো হয়েছে। দুটি কেকও বানিয়েছি। একটা খালামণির, আরেকটা তনমনার জন্য। পেপারে মুড়িয়ে ব্যাগে নিয়েছি। রাফসান এসে রেডি হলেই আমরা বের হব।

দাদুভাই আসবেন একটু পরে। উনি আনবেন কোড়ানো নারকেল-চালের গুঁড়া। দাদু ফুপিদের জন্য এসব করেছেন। খুব একটা তো আর যাওয়া হয় না, তাই। কিন্তু ভয়ের বিষয় হচ্ছে এত ব্যাগ-পোটলা দেখলে রাফসান সাংঘাতিক ত্যাক্ত হবে! বলবে ব্যাগের কাপড় কমাতে, না হয় পোটলা-পাটলি না নিতে। তবে শেষমেশ সেসব নেবে ঠিকই কিন্তু আমাকে সারা রাস্তা হুমকি-ধমকির ওপর রাখবে।

দরজায় ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। অতি পরিচিত শব্দ। হাতের লাঠির মাথা দিয়ে দাদুভাই দরজা ধাক্কাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম।

‘আসো দাদুভাই।’ দাদুভাই হাতের ব্যাগটা মাটিতে রাখল। আমাদের বাসার যে বড় স্টিলের চেয়ারটা, ওইটা বাইরে নিয়ে এলাম। দাদুভাই ওখানটায় বসল। ‘তুমি এখানে বসো। রাফসান আসলে আজকে তোমার হাতের লাঠিটা দিয়ে ওকে একটা কঠিন বাড়ি দেবে। বুঝেছ?’

দাদুভাই মিটিমিটি হাসে।

আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, ফ্রিজের মেইন সুইচটা বন্ধ করিনি। প্লাস্টিকের স্যান্ডেল দিয়ে সাবধানে বন্ধ করলাম। আমার ভয় করে! শকটক দিলে স্পট ডেড! রাফসানের খাবারটুকু রেখে বাকিটুকু বক্সে ভরে দাদুভাইকে দিয়ে দেব। ভালোই হয়েছে। দাদুভাইকে কবুতরের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা যাবে। কখন কতটুকু খাবার দিতে হবে, সব গুছিয়ে বলতে হবে।

‘তুমি রেডি? আমার বেশিক্ষণ লাগবে না। ১০ মিনিটের মধ্যে খেয়ে রেডি হয়ে যাব।’

তিনি এসেছেন। এখন আমি মুখ খুললে একটা কঠিন ঝগড়া হয়ে যাবে। রাফসান ঠিকই বুঝেছে। বুদ্ধিমান লোক। উত্তরের অপেক্ষা না করে তাই দ্রুত গোসলে করতে গেছে।

আসলে ঘটনা হচ্ছে বললেই তো হুট করে ঢাকা যেতে পারি না। প্রথমত রাফসানের সময় হয় না। সে আমাকে নিয়ে দূরে যেতে চায় না। আমি নাকি "touch me not" জাতীয় গুল্মবিশেষ! বাসে উঠতে পারি না; চট করে ট্রেনে চড়তে জানি না। আমি নাকি নরসিংদীর বালিকা। ঢাকা আমার জায়গা না! তা ছাড়া আমার গাছপালা আছে। কোনো গাছ রোদের তো কোনো গাছ ছায়ার। কোনো গাছ কম পানি চায় তো কোনো গাছ বেশি পানি খায়। আরো আছে পাঁচ-ছয় জোড়া কবুতর। এরা নিয়মিত ডিম পাড়ে। বিড়ালমহল থেকে এদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়! সব মিলিয়ে এদের রেখে কোথাও যাওয়ার চিন্তা করাও মানা। রাফসানও খুব একটা ঢাকা যেতে চায় না। বাসায় ফেরার আগে দোকান দুইটার হিসাব নিজের হাতে না কষলে তার শান্তি হয় না। খুব বড় কাজ থাকলে সে ঢাকা যায়, আবার দিনে দিনে ফিরে আসে। এবার অনেক অনুনয়-বিনয় আর রাগ-অভিমানের পর আমার এ সৌভাগ্য হচ্ছে! ‘খেতে দাও। এক্ষুনি না খেলে অজ্ঞান হয়ে যাব!’ লোকটা ইহজীবনে কোনো দিন গোসল করে চুল মোছে কি না সন্দেহ! পানিতে শার্টের অনেকটা ভিজে গেছে। ঠাণ্ডা লাগিয়ে খুসখুস কাশবে সারা দিন! ভাতের প্লেট নিয়ে রাফসান বারান্দায় চলে গেল। দাদুভাই একা বসে আছে। এত দ্রুত খাচ্ছে যে ভয়ই হচ্ছে—কখন না আবার গলায় আটকে যায়! এরই মধ্যে খবর এসেছে ট্রেন নরসিংদী স্টেশনে এসে পৌঁছতে আর ১৫-২০ মিনিট। দোকানের ছেলেটা টবগুলো বারান্দার বাইরে নিয়ে এলো। তালা আটকে চাবি দাদুভাইকে দিলাম। কবুতরের ঘরের দিকে একবার তাকালাম। রাফসান রিকশায় সব ব্যাগ তুলে আমাকে ডাকছে। বেরিয়ে এলাম।

এক রিকশায় যাবতীয় ব্যাগসমেত দোকানের ছেলেটা। আরেক রিকশায় আমি আর রাফসান। দাদুভাই আমাদের যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।

রিকশা চলছে স্টেশন অভিমুখে। রাফসান রিকশাওয়ালাকে তাড়া দিচ্ছে। তাই রিকশাওয়ালাও চেষ্টা করছেন। পড়ে যাওয়ার ভয়ে আমি রাফসানের শার্ট মুঠ করে ধরে আছি।

রাফসান বলল, ‘ট্রেনে ওঠার আগেই তো তুমি শার্টের ইস্ত্রি নষ্ট করে ফেলছ!’

—‘হুহ! এসেছেন আমার শার্টওয়ালা! এই শার্ট কে ইস্ত্রি করে দিয়েছে?’

জুয়াইরিয়া জাহরা হক

পূর্ব ব্রাহ্মদী, নরসিংদী।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা