kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিশাল বাংলা

আয়েশা এক ধাত্রী মা

রহমত গাজীর স্ত্রী আয়েশা খাতুন ধাত্রী মা নামেই বেশি পরিচিত। যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কদমবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। ৪০ বছর ধরে সাড়ে চার হাজার শিশুর জন্মদানে সহায়তা দিয়েছেন। ঝড়-বৃষ্টি, অন্ধকার রাত—কোনো কিছুতেই বাধা মানেননি। তাঁর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মোহাম্মদ বাবুল আকতার

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আয়েশা এক ধাত্রী মা

সেদিন ছিল সোমবার। বিকেলও গড়িয়ে গিয়েছিল। মণিরামপুর পৌরসভা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পশ্চিম দিকে গেলে গ্রাম কদমবাড়িয়া। জিজ্ঞেস করতেই একজন দেখিয়ে দিল আয়েশা খাতুনের বাড়ি। মাটির ঘরের ওপর টিনের ছাউনি। বারান্দায় মাদুর পাতা। আয়েশা খাতুনের স্বামী রহমত গাজী বললেন, ‘উনি তো (আয়েশা খাতুন) একটু আগেই বাড়ি ফিরেছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন।’ আয়েশা খাতুন এলে কুশল বিনিময় করলাম। তিনি মাদুরের ওপর নকশিকাঁথা বিছিয়ে দিয়ে বসতে বললেন। তারপর ফিরে গেলেন অতীতে।

 

আয়েশা খাতুন বলতে লাগলেন

জন্ম তারিখ সঠিক বলতে পারব না। ভোটার কার্ডের হিসাবে বয়স ৭২ পার হয়ে গেছে। বাবা জাহাজে ছোট চাকরি করতেন। শুনেছি, জাহাজ থেকে পড়ে বাবা মারা গেছেন। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে ফেলায় লেখাপড়া শিখতে পারিনি। বিয়েও হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছর কয় আগে বড় ছেলে শহীদুলের জন্ম হয়। ছেলের জন্মের সময় (প্রসবের) খুব কষ্ট হয়েছে। আমার দূরসম্পর্কের এক চাচি শাশুড়ি সন্তান জন্মদানের সময় গর্ভবতী মায়েদের সেবা-সহযোগিতা করতেন। আমারও ইচ্ছা হয় গর্ভবতীদের সহযোগিতা দিতে। সেই থেকে চাচি শাশুড়ির সঙ্গে থাকা শুরু করলাম। আমাদের কোনো ট্রেনিং ছিল না। ছিল না কোনো ডাক্তারিবিদ্যা। নিজেদের মতো করেই শিশুবাচ্চা ধরতে থাকি। একের পর এক নরমাল ডেলিভারি (স্বাভাবিক প্রসব) করাতে থাকি। একেবারে না পারলেই শুধু হাসপাতালে নিয়ে যাই। দিন দিন ধাত্রী হিসেবে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। দূর থেকে লোক এসে আমার খোঁজ করতে থাকে। ১০ বছর আগের কথা। সদর উপজেলার হাতেরহাট সিঙ্গিয়া গ্রামের এক গর্ভবতীকে মণিরামপুর হাসপাতাল থেকে ফেরত দেওয়া হয়। পরে আমি তাঁর নরমাল ডেলিভারি করাই। এ ঘটনা আশপাশের এলাকায়ও সাড়া ফেলে দেয়। খবর পেয়ে মণিরামপুর সরকারি হাসপাতালের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অফিসাররা আমাকে ধাত্রীমাতা হিসেবে প্রশিক্ষণ দেন। কখনোই বিনিময়ে কারো কাছ থেকে কিছু চাইনি। মনে হয়, মাসে ১৫-২০টি শিশুর জন্ম হয় আমার হাত ধরে। সবই নরমাল ডেলিভারি। ১৫ বছর ধরে হিসাব রাখতেছি। তার আগে হিসাব ছিল না। সম্ভবত পাঁচ হাজার নবজাতকের জন্ম হয়েছে আমার হাতে।

আয়েশা খাতুন মনে করেন

কাজটিকে মহত্ ও পুণ্যের কাজ বলে মনে করেন আয়েশা খাতুন। তিনি এ কাজে আনন্দ পান। যত দিন চলতে-ফিরতে পারবেন, তত দিনই এ কাজ করে যাবেন। পরিবারের লোকজন কিছু না বললেও সামাজিকভাবে তাঁকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বছর পনেরো আগের ঘটনা। তিনি ঋষিপাড়ার এক বাড়িতে সন্তান জন্মদানে সেবার হাত বাড়িয়ে দেন। বাড়ি ফেরার পর নানাজনের কটু কথা শুনতে হয়েছে। একজন বলল, আয়েশার হাতে কিছু খাওয়া যাবে না, সে ঋষিবাড়িতে ধাত্রীর কাজ করেছে। একপর্যায়ে পাড়া-প্রতিবেশীরা আয়েশার পরিবারকে একঘরে করে রাখল; এমনকি নিকটাত্মীয়রা পর্যন্ত বাড়িতে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিল। পরে ফরিদ মাওলানা নামের একজনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়। আয়েশা তাঁর এ জীবন নিয়ে খুশি। স্বামী, তিন ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-পুতি নিয়ে মোটা কাপড়-মোটা ভাতে চলে যাচ্ছে জীবন।

 

আয়েশাকে নিয়ে তাঁরা বললেন

আয়েশা খাতুনের ছেলে মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মা খবর পেলেই ছুটে যান। প্রতিকূল আবহাওয়াও তাঁকে আটকাতে পারেনি। একসময় আমাদেরও কষ্ট হয়েছে। এ কাজের জন্য বাবাও কোনো দিন মাকে নিরুত্সাহ করেননি। আমার মায়ের জন্য আমাদের গর্ব হয়।’ কদমবাড়িয়া দাখিল মাদরাসার মাওলানা মো. জাকারিয়া বলেন, ‘এ অঞ্চলে ধাত্রী মা হিসেবে তিনি সবার পরিচিত। দূর-দূরান্তে তিনি ধাত্রী মায়ের কাজ করতে যান। এলাকায় কোনো মহিলা মারা গেলে তিনি গোসলও করিয়ে থাকেন।’ মণিরামপুর মুন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল হাই বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের অনেক গর্ভবতী মাকে আয়েশা খাতুন নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন। তিনি কোনো লক্ষণ দেখে বলতে পারেন, কোনটি নরমাল ডেলিভারি হবে।’

মণিরামপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমার জানা মতে, আয়েশা একজন নামকরা ও বিজ্ঞ ধাত্রী মা। আমাদের দপ্তর থেকে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’

     ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা