kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

তোমায় সালাম

খালিদের যন্ত্রপাতি

গেল ৪ থেকে ১৩ নভেম্বর জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত হলো সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের শিল্পকর্ম ও স্মৃতি নিদর্শন প্রদর্শনী। এতে তাঁর গড়া ভাস্কর্য, পেইন্টিং আর ব্যবহার্য নানা উপকরণ স্থান পেয়েছে। তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুমের কাছে উপকরণগুলো নিয়ে গল্প শুনে এসেছেন মোহাম্মদ আসাদ

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খালিদের যন্ত্রপাতি

প্রদর্শনীতে সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের শিল্পকর্ম দেখছেন তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুম

আমি যখন আর্ট কলেজে ভর্তি হই, তখন সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের গড়া কুমিরের ভাস্কর্যটি দেখি। সেটি সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আমি এটার মুখের ভেতর হাত দিয়ে দেখি। ভেতরে জিবটাতেও ডিটেইল কাজ করেছেন। বাইরে-ভেতরে এত সুন্দর কাজ দেখে খুব ভালো লাগে। তখন তিনি (আব্দুল্লাহ খালিদ) ফাইনাল ইয়ারে। কাজটা দেখার পরই তাঁর প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। এরপর তা ভালোবাসায় গড়ায়। তার পর ১৯৭০ সাল থেকে আমাদের একসঙ্গে পথচলা।

খালিদকে সবাই মনে করত আলুথালু, পোশাক-আশাক নিয়ে বেখেয়ালি। আসলে খুব শৌখিন ছিলেন। নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতেন। টাই পরতে পছন্দ করতেন। তাঁর অনেক টাই ছিল। রঙিন শার্ট পরতে পছন্দ করতেন। পাঞ্জাবিও পছন্দ করতেন।

প্রদর্শনীর মানিব্যাগটা দিয়েছিল তাঁর ভাগ্নি। মোবাইলটা প্রথম দিককার। এটা দিয়েছিল তাঁর এক বন্ধু। খালিদ সব সময় শার্টের হাতায় কাফলিঙ্ক পরতেন। নানা আকার ও গড়নের চশমা ছিল তাঁর। একেক সময় একেকটি পরতেন। ঘড়ি তাঁর খুব পছন্দ ছিল। প্রবালের একটি আংটি পরতেন সব সময়। আংটিটি দিয়েছিলেন শিল্পী রশিদ চৌধুরী। তাঁর সংগ্রহ করা ঘড়ি আছে অনেক। তার থেকে শখানেক এখানে দিয়েছি। ঘরে আরো অনেক আছে। নানা রকম ঘড়ি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। এগুলো একটা বাক্সে রেখে দিতেন। মাঝে মাঝে নামিয়ে দেখে আবার রেখে দিতেন। আমার শাশুড়ি মুদ্রা সংগ্রহ করতেন। সেগুলো খালিদের কাছেই ছিল। জায়গার অভাবে প্রদর্শন করতে পারিনি।

কিছু ব্রাশ ও রং প্রদর্শনীতে দিয়েছিলাম। কেনার পর তিনি ব্রাশ কোনাকুনি করে কেটে নিতেন। নানা রকম ব্রাশ ব্যবহার করতেন। অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য গড়ার টুলগুলো আলাদা রাখা আছে।

আমরা থাকতাম চট্টগ্রামে। অপরাজেয় বাংলা তৈরি করার সময় অনেকবার ঢাকায় আসতে হয়েছে। কাজ চলার সময় আমি আসতাম, কাজ বন্ধ হলেই আবার চট্টগ্রামে চলে যেতাম। অপরাজেয় বাংলা গড়ার বেশির ভাগ সময়ই আমি কাছে ছিলাম। প্রদর্শনীতে চাঁদপুরে নির্মিত ভাস্কর্য অঙ্গীকারের মডেলটি ছিল। এটি আনতে গিয়ে ভেঙে যায়। অপরাজেয় বাংলার মডেলটি পুরোই ভেঙে গিয়েছে। এটা আনা সম্ভব হয়নি। শুরুতে অনেকের ভাস্কর্য করেছেন তিনি। বড় কাজের সময় সরাসরি মানুষ সামনে রেখে মডেল তৈরি করে সেই মডেল দেখে মূল কাজটি করেছেন। আবক্ষ ভাস্কর্যগুলোর কোনোটাই দুই-তিন ফুটের বেশি নয়। এর মধ্যে আছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মা ও স্ত্রীর সুন্দর মুহূর্তের ভাস্কর্য। আছে কাজী মোতাহার হোসেনের আবক্ষ ভাস্কর্য। জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের আবক্ষ ভাস্কর্য শুরু করেছিলেন। সে দুটি কাজ শেষ করা হয়নি। প্রদর্শনীতে ১৮টি ভাস্কর্য ছিল। তার মধ্যে আমরা পরিবার থেকে দিয়েছি ১৬টি আর দুটি জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহ।

প্রদর্শনীতে পেইন্টিং ছিল ৯৭টি। আর ড্রইং ৩০টি। বেশির ভাগ পেইন্টিংয়েরই বিষয় ফুল। তাঁর অ্যাজমা হয়ে গিয়েছিল। মাটির কাজ করতে পারছিলেন না। কিন্তু সংসার তো চালাতে হবে। ঢাকায় এসে এলিফ্যান্ট রোডে বাসা নেওয়ার পর ফুলের ছবি আঁকা শুরু করলেন। শাহবাগে পাইকারি ফুলের দোকান থেকে অনেক ফুল কিনে আনতেন। কোকের বোতলে নানা রকমে সাজিয়ে রেখে দেখতেন। সেখান থেকে মনের রং মিলিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতেন। ফুলের কাজের দুটি প্রদর্শনী হয়েছিল। সেই প্রদর্শনীতে প্রচুর ছবি বিক্রি হয়েছে। ফুল ছাড়াও জেনোসাইডের ওপর একটা সিরিজ পেইন্টিং করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে থেকে একটা কাজ এখানে দিয়েছেন।

তাঁকে দেখলে সবাই মনে করত তিনি সংসারী নন। আসলে সংসারের চিন্তা সব সময় মাথায় থাকত। বাজার করতে পছন্দ করতেন। আমি বলব, তিনি ছিলেন সফল শিল্পী ও সফল মানুষ।

ছবি : লেখক

 

একজন আব্দুল্লাহ খালিদ

সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী। সিলেটে জন্ম ১৯৪২ সালে। ১৯৬৯ সালে ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট (এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে পেইন্টিংয়ে স্নাতক হন। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে পেইন্টিং ও ভাস্কর্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। চাঁদপুরের অঙ্গীকারও তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য। শিল্পকলা ও ভাস্কর্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৪ সালে পেয়েছেন শিল্পকলা পদক। একুশে পদক লাভ করেন ২০১৭ সালে। ওই বছরেরই ২০ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা