kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

সরেজমিন

তেজগাঁও কলার হাট

তখন সকাল ৮টা। কার্তিকের সূর্য সতেজে মাথার ওপর চড়েছে। মানুষের হাঁকডাক আর গাড়ির সাইরেনে সরব সব কিছু। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা করে তেজগাঁও রেলস্টেশনে পৌঁছলেন রায়হান রাশেদ

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তেজগাঁও কলার হাট

ঝনঝন শব্দ তুলে ট্রেন ছুটছে রেলপথ ধরে। চা স্টলে দাঁড়াই। চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখি নানা রকম মানুষ। চোখে পড়ে কলার হাট। স্টেশনপাড়ায় কলার মেলা। তেজগাঁও বড় মসজিদ মার্কেটের সামনে থেকে শুরু করে দক্ষিণ দিকে ১০-১২টি কলার আড়ত। রোডেও বসেছে কয়েকটি দোকান। স্টেশন প্ল্যাটফর্মের প্রধান ফটকের আশপাশেও আছে কলার সাজানো ঝুড়ি। কলা নিয়ে বসেছেন চার-পাঁচজন নারীও। কয়েকজনকে দেখলাম ছুরি দিয়ে কাঁদি (কান্দা) আলাদা করার কাজ করছেন। একটু দূরে দুটি ট্রাকে কলা ওঠানো হচ্ছে। আড়তের ভেতর মহাজনরা হিসাব কষছেন। রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল, মধুপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা ও নরসিংদীর ঝিনারদী থেকে কলা আসে এখানে। রাতের বেলায়ই বেশি আসে। আসে ট্রেনে চড়ে। মাঝেমধ্যে আসে ট্রাকে করে। বিভিন্ন এলাকার কলার ব্যাপারীরা স্থানীয় বাগান থেকে কিনে এনে আড়তে বিক্রি করেন। অনেক আড়তদার নরসিংদীর কলাবাগান কেনেন। প্রতিদিন এক থেকে দুই শ টন কলা বিক্রি হয়। ঢাকার বিভিন্ন সবজি বাজার ও ফলের আড়তে কলা যায়। শহরের দোকানগুলোতে ভ্যানে করে লোকেরা কলা দিয়ে আসে। পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর জমে ওঠে এই কলার হাট। প্রথমে জায়গা ছোট ছিল; এখন এটি দেশখ্যাত কলার হাট। ট্রেনে যাতায়াতের সুবিধা বেচাবিক্রি বেগবান করেছে।

 

কলা পাকানোর উপায়

গাছ পাকা কলা খুব স্বাদের হয়। কলা পাকানোর বিভিন্ন প্রক্রিয়া আছে। কামাল মিয়া বললেন, ‘একটি ইট নির্মিত ঘরে, যার এক পাশে খোলা মুখ থাকে, ঘরটাকে তন্দুল বলি আমরা, সেখানে কলা সাজিয়ে রাখা হয়, তারপর পাত্রে করে খোলা মুখে আগুনের তাপ দিই। খেয়াল রাখি তাপ যেন ভালোমতো ভেতরে পৌঁছায় আর সেখান থেকে হাওয়া-বাতাস যেন বের হতে না পারে। এ প্রক্রিয়ায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। অনেকে আবার তুঁতের সাহায্যে পাকায়। সে ক্ষেত্রে কলার ঘাড়ে তুঁত দিতে হয়। আরেকটা উপায়—কলাগুলো একটা পলিথিনের ভেতর রেখে, সেটাকে আবার পাটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখলে দু-তিন দিনে কলা পেকে যায়। এভাবে পাকানো কলা বেশি স্বাদের হয়। কলাতে কোনো ফরমালিন মেশানো হয় না।’

মসজিদের ডান দিক থেকে কলার আড়তের ঘর শুরু হয়েছে। প্রথম দোকানের নামের সাইনবোর্ড নেই। দোকানের ক্যাশিয়ার বললেন, ‘প্রতিদিন ২০-২২ লাখ টাকার কলা বিক্রি হয়। সপ্তাহের সাত দিনই বাজার থাকে। কলায় কোনো ফরমালিন দিই না। কেউ প্রমাণ করতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।’

 

কামাল মিয়ার ২৫ বছর

অঞ্চলভেদে কলার স্বাদের পার্থক্য হয়। রাজশাহী ও কুষ্টিয়ার সবরিকলার বেশ নাম আছে। নরসিংদী থেকে বেশি আসে চাঁপা ও সাগর কলা। কামাল মিয়ার বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার সায়দাবাদে। তেজগাঁওয়ে কলার ব্যবসা করছেন আজ ২৫ বছর। ১৫ বছর বয়সে এখানে এসেছেন। এখান থেকে ভ্যানে করে কলা নিয়ে যান বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়। দোকানে দোকানে ফেরি করবেন। দিনের একটা বড় অংশ কলা বেচে তাঁর সময় কাটে। এ ব্যবসা করে ছোট ভাইদের মানুষ করেছেন। দুজনকে প্রবাসে পাঠিয়েছেন। সন্তানরা পড়ছে। বলছিলেন, ‘আড়ত থেকে কলা কিনে নিই। দোকানে দিই। ব্যবসা ভালো লাগে। আমিও ভালো আছি। শহর ঘুরছি। টাকা পাচ্ছি। বাসার খরচ লাগছে। অল্প লাভেই কলা বেচি।’

 

পিয়ার আলীর সঙ্গে দেখা

খোলা আকাশের নিচে চেয়ারে বসে হিসাব করছেন পিয়ার আলী। এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে। ৩৫ বছর ধরে এখানে আছেন। পরিবার নিয়ে থাকেন। বললেন, ‘প্রতিদিন ২০-২২ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়। কলার ব্যবসা করে সুখেই আছি। মানুষকে ভালোটা খাওয়াচ্ছি। কোনো ভেজাল নেই। আমাদের এখানে সাইনবোর্ডে পর্যন্ত লেখা আছে, ফরমালিন প্রমাণ করতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।’ কলার গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে টাকা গুনছেন এক বৃদ্ধ। ঝিনারদী বাড়ি। কলার ব্যাপারী। তেজগাঁওয়ের বহু পুরনো লোক। তাঁকে অনেকেই চেনেন। তিনি বলেন, ‘ঝিনারদী থেকে পাইকারি কিনে এনে এখানে বেচি। সপ্তাহে তিন দিন আসি। আমি ভালো টাকা রোজগার করি।’

হেঁটে চলে আসি প্ল্যাটফর্মে। দুজন নারী কলা নিয়ে পাশাপাশি বসে আছেন। তাঁদের একজন আছিয়া বেগম। বললেন, ‘এই কলাগুলো আড়তদাররা ফেলে দিতে চান। আমরা বলে-কয়ে নিয়ে আসি। তারপর কম দামে বিক্রি করে দিই।’

     ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা