kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

মহাপৃথিবী

গৃহকর্মীদের কণ্ঠস্বর

ব্রিটেনে বাসাবাড়িতে নিয়োগকর্তাদের দ্বারা নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হন অনেক অভিবাসী গৃহকর্মী। এ থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়ও ছিল না। কারণ নিয়োগকর্তার মর্জির ওপর তাঁদের ভিসার মেয়াদ নির্ভর করত। মারিসা বেগনিয়া দাঁড়ালেন নির্যাতিতের পক্ষে। তিনিও ফিলিপাইন থেকে যাওয়া একজন গৃহকর্মী। লড়াই করলেন আইন বদলের জন্য। একপর্যায়ে সফলও হলেন।

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গৃহকর্মীদের কণ্ঠস্বর

যুক্তরাজ্যে আপনি তাঁদের খুঁজে পাবেন ধনী ব্যক্তিদের রান্নাঘর কিংবা ফুলের বাগান পরিচর্যায়। তাঁরা যুক্তরাজ্যে আসেন চুক্তিবদ্ধ হয়ে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। স্বপ্ন  দেখেন পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানোর। তবে তাঁদের বেশির ভাগের জন্য বাস্তবতা ভয়ংকর রকম আলাদা। যেমন—চার সন্তানের জননী গ্রেস। বয়স ৪৫ বছর। এক কুয়েতি পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। প্রতি মাসে এক হাজার ২০০ পাউন্ড করে দেওয়ার কথা। কিন্তু তাঁকে মাত্র ২২০ পাউন্ড দেওয়া হতো। সপ্তাহে সাত দিনই কাজ করতে হতো। সাপ্তাহিক ছুটি ছিল না। একা বের হওয়ার অনুমতি ছিল না। যুক্তরাজ্যে আসার দুই মাস পর একবার তাঁর হোস্ট ফ্যামিলি ছুটিতে ফ্রান্স গিয়েছিল। গ্রেসকে এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে একা তালা দিয়ে রেখে গিয়েছিল। তাঁর কান্নার শব্দ শুনে পাশের বাড়ির একজন ক্লিনার পেছনের ব্যালকনি দিয়ে উঠে এসেছিল। আর ছোট্ট একটা থলেতে গ্রেস নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পালালেন। গ্রেস এখন অনিবন্ধিত ও স্বদেশিদের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করেই টিকে আছেন।

৪৬ বছর বয়সী লুসি তাঁর তিন সন্তানের কথা মনে করে প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়েন। যাদের তিনি সাত বছর ধরে দেখেননি। নিয়োগকর্তা তাঁর ভিসা নবায়নের ব্যাপারে মোটেও উদ্যোগী নন। ফিলিপাইনে থাকা স্বামী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। লুসিকে দেশে ফেরার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাঁর মামলাটি উচ্চ আদালতে যাচ্ছিল, তাই আশা নিয়ে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে স্বামী মারা গেলেন। শেষ পর্যন্ত লুসির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। লুসির ভাষায়, ‘আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম, আত্মহত্যার কথা ভাবছিলাম।’ লুসি এখন গোপনে এমন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করেন, যিনি তাঁর সার্বিক অবস্থা জানেন এবং সেভাবেই পারিশ্রমিক দিচ্ছেন।

গ্রেস কিংবা লুসির মতো গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়ছেন মারিসা বেগনিয়া। শুরুতে সিঙ্গাপুরে এক বাসায় কাজ করেছেন। বেতন কম বলে সেখান থেকে চলে যান হংকংয়ে। শেষে হংকংয়ের সেই গৃহকর্তার মাধ্যমে ভাগ্যবদলের আশায় পাড়ি জমান লন্ডনে। মারিসাকে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বললেন, ‘অবস্থা এমন ছিল যে আমাকে গৃহপরিচারিকা অথবা পতিতাবৃত্তি—এ দুটির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হতো। আমার এক, দুই ও তিন বছর বয়সী বাচ্চাদের রেখে আসা ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত। আমার শুধু একটিই স্বপ্ন ছিল যে আমরা একদিন আবার একসঙ্গে থাকতে পারব। কিন্তু আমার সামনে পরিষ্কার কোনো উপায় জানা ছিল না। এটা শুধু স্বপ্ন, একটা সুন্দর দিনের স্বপ্ন।’ মারিসা আরো বললেন, ‘শুরুতে আমি আমার অধিকার সম্পর্কে জানতাম না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অন্য গৃহকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানলাম, গৃহকর্তা বদলানোর অধিকার আমার আছে।’

১৯৯৮ সাল থেকে বিদেশি গৃহকর্মী ভিসা চালু হয় যুক্তরাজ্যে। এটিতে গৃহকর্মীদের নিয়োগকর্তা বদলানোর নিশ্চয়তা ছিল। এক বছর পর নিয়োগকর্তার মাধ্যমে ভিসা নবায়ন করা যেত; কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার ২০১২ সালে আইনটি পরিবর্তন করে, যাতে অভিবাসী গৃহকর্মীরা যুক্তরাজ্যে আসতে পারবে শুধু অনবায়নযোগ্য ছয় মাসের ভিসায়। অর্থাত্ একজন কর্মী একজন সুনির্দিষ্ট চাকরিদাতার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে আসতে পারবেন। এর অর্থ হলো যদি তাঁদের নিয়োগকর্তা শোষক বা নিপীড়কও হন, তবু তাঁদের চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ফলে গৃহকর্মীরা নিয়োগকর্তাদের কাছে দাসের মতো। এতে যাঁরা চাকরি পরিবর্তন করতে চান, তাঁদের পালানো ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না।  ২০১২ সালের আগে অভিবাসী গৃহকর্মীরা চাকরির পাঁচ বছর পর অনির্দিষ্টকালের ছুটি এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারতেন। যেমনটা মারিসা বেগনিয়া করেছিলেন। মারিসা গৃহকর্মী ভিসায় আগের শর্তগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচারণা শুরু করেন। মারিসাকে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ব্রিটেনে অভিবাসী গৃহকর্মীদের অধিকার আদায়ে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে ‘জাস্টিস ফর ডমিস্টিক ওয়ার্কার’। এটা অভিবাসী গৃহকর্মীদের দাতব্য সংগঠন। তারা গৃহকর্মীদের অধিকার আদায়ে প্রচার-প্রচারণা চালায়। গৃহকর্মীদের দক্ষ করে তুলতে ভাষা শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়। সংগঠনটির সদস্যরা সবাই অভিবাসী গৃহকর্মী। মারিসা সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সমন্বয়ক। তিনি বললেন, ‘আমার মতো গৃহপরিচারিকাদের দেখে তাঁদের সাহায্য করা শুরু করলাম। এঁদের অনেকেই লিখতে-পড়তে জানেন না। অনেকে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। মাঝেমধ্যে এমনও অনেককে পেতাম, যাঁরা বেদম মারধরের শিকার হয়েছেন। ফিলিপাইনের ৩৬ বছর বয়সী গৃহকর্মী মেলের কথা বলি। এক সৌদি পরিবারের মাধ্যমে লন্ডনে এসেছেন ২০০৯ সালে। তাঁকে মাসিক এক হাজার ৫০০ পাউন্ড দেওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে কিছুই দেওয়া হয়নি। সকাল ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। ঘুমাতে হতো লন্ড্রি ঘরে। চার বছর পর পালাতে সক্ষম হন। সেই থেকে তিনি সরকারের খাতায় অনিবন্ধিত হয়ে পড়েন। পালানোর পাঁচ বছর পরে ধরা পড়েন। তাঁকে স্বেচ্ছায় ফিলিপাইনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে মেল ও তাঁর মতো মহিলাদের জন্য ঘরে ফিরে যাওয়া সমাধান নয়। কারণ সেখানে তিনি সন্তানদের নিয়ে সংসার চালানোর মতো অবস্থায় থাকবেন না। অবশ্যই আমরা বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। কারণ আমরা চাই না কেউ চাকরি হারাক। চাই না কারো ভিসা বাতিল হয়ে যাক, যেটা আসলে অনেকাংশেই নিয়োগকর্তার মর্জির ওপর নির্ভর করে।’

একপর্যায়ে যুক্তরাজ্যে সংসদীয় বৈঠকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পান মারিসা। জাতিসংঘেও বক্তব্য রেখেছেন তিনি। এর ফলে সরকার ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের গৃহকর্ম ভিসা নীতিমালা সম্পর্কে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা কমিশন গঠন করে। তবে কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না করে সরকার ২০১২ সালে প্রবর্তিত কঠোর বিধি-নিষেধকে ২০১৬ সালে কিছুটা সংশোধন করে মাত্র। গৃহকর্মীরা এখন তাঁদের নিয়োগকর্তা বদলাতে পারেন। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক মানবপাচারকারী বা পাচারের শিকার প্রমাণিত না হলে গৃহকর্মীরা এখন তাঁদের ভিসার মেয়াদও বাড়াতে পারেন। মারিসা এখনো অভিবাসী গৃহকর্মীদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আর জাস্টিস ফর ডমিস্টিক ওয়ার্কার পরিচিতি পেয়েছেন গৃহকর্মীদের কণ্ঠস্বর হিসেবে।

সূত্র : আলজাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য আইটিইউসি, জে৪ডিডাব্লিউ।

গ্রন্থনা :  সৈয়দ আশফাকুল হাসান ও পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা